কক্সবাজার চকরিয়ায় অবস্থিত ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক এখন দুর্নীতির অভয়ারণ্যতে পরিণত হয়েছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা লোপাটের অভিযোগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়ার পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন মূল অভিযুক্ত কর্মকর্তা মো. মঞ্জুরুল আলম। তাকে দৃশ্যমান কোনো শাস্তির বদলে রহস্যজনকভাবে ফরেস্টার থেকে ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দিয়েছে বন অধিদপ্তর।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পার্কে আধুনিকায়নে ১১টি উন্নয়ন প্রকল্পের বিপরীতে ৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ ওঠেছে পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মঞ্জুরুল আলম ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সিন্ডিকেট মিলেমিশে কাজ শেষ হওয়ার আগেই প্রায় পুরো টাকা তুলে নেওয়ার পাঁয়তারা করেন।
গত বছরের ১০ জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি এনফোর্সমেন্ট টিম পার্কে অভিযান চালিয়ে দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পায়। দুদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাঘের বেষ্টনি, ফুড স্টোরেজ ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ মাত্র ২০-৩০ শতাংশ সম্পন্ন হলেও নথিপত্রে শতভাগ কাজ দেখিয়ে বিল ছাড়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। অভিযানের সময় মো. মঞ্জুরুল আলমের কার্যালয় থেকে গুরুত্বপূর্ণ মেজারমেন্ট বুক ও ভাউচার পাওয়া যায়নি। সাধারণত কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত বা বিভাগীয় মামলা চলমান থাকলে তাকে সাময়িক বরখাস্ত বা মাঠপর্যায় থেকে প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু মো. মঞ্জুরুল আলমের ক্ষেত্রে ঘটেছে তার উল্টো। বন অধিদপ্তরের একটি প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদে তাকে শাস্তির মুখোমুখি না করে সম্প্রতি ‘ডেপুটি রেঞ্জার’ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পার্কের একাধিক কর্মচারী জানান, পার্কের নীলগাইসহ বিরল প্রজাতির প্রাণীদের খাবার ও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ রয়েছে মো. মঞ্জুরুল আলমের বিরুদ্ধে। তাকে পদোন্নতি দিয়ে মূলত দুর্নীতিবাজদের উৎসাহিত করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ধামাচাপা দিতে এত দুর্নীতির পরেও তাকে পার্ক থেকে প্রত্যাহার করা হয়নি। উল্টো তাকে সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে কেবল আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের তা নয়। পার্কে প্রাণীদের নিম্ন মানের খাদ্য সরবরাহের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে নিম্নমানের খাবার সরবরাহের ফলে অনেক প্রাণী অপুষ্টিতে ভুগছে। নীলগাইসহ বেশ কিছু প্রাণীর মৃত্যু সঠিক তদারকির অভাবে হয়েছে বলেও কর্মচারীরা জানান।
পার্কে ঘুরতে আসা পরিবেশকর্মী বিএম রায়হান জানান, অধিকাংশ বন্যপ্রাণী অপুষ্টিতে ভুগছে সেটি প্রাথমিক দেখাতে বোঝা যায়। যেসব খাবার দেওয়া হচ্ছে সেসব খাবার কতটা বন্যপ্রাণীর জন্য পুষ্টিকর এবং পর্যাপ্ত সেটি তদারকি করা প্রয়োজন। এভাবে চলতে থাকলে সাফারি পার্ক ও চিড়িয়াখানার মধ্যে ব্যবধান বোঝা মুশকিল হয়ে পড়বে।
এসব অভিযোগের ব্যাপাকে জানতে চাইলে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মঞ্জুরুল আলম বলেন, তিনি স্থানীয় সাংবাদিক ছাড়া বাইরের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন না। তিনি সাংবাদিকদের টাকা দেন না। তাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। পার্কে বন্যপ্রাণীর জন্য নিম্নমানের খাবার সরবরাহ হচ্ছে এটা সঠিক নয়। পার্কে কিছু উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চলমান আছে যেগুলো চলতি অর্থবছরে শেষ হবে বলে তিনি জানান।
এসব অভিযোগের ব্যাপারে চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
কেকে/এজে