চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা লেবু ও আনারসের জন্য দেশজুড়ে সমাদৃত। পাহাড়, বনাঞ্চল ও বিস্তীর্ণ চা-বাগানে ঘেরা এই অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ লেবু উৎপাদিত হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এখানকার কাগজি, জারা ও চায়না জাতের লেবু রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পাইকারি আড়তে সরবরাহ করা হয়। উৎপাদিত এসব লেবুর কদর দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) সকালে শ্রীমঙ্গলে বাজার ও কয়েকটি আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে বড় আকৃতির লেবু ২২০ টাকা, মাঝারি ১২০-১৫০ টাকা এবং ছোট আকৃতির লেবু ৬০-৮০ টাকা হালি বিক্রি হচ্ছে।
মৌসুমে রমজানের শুরুতে হঠাৎ লেবুর দাম আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ ক্রেতারা পড়েছেন চরম বিপাকে।
খুচরা বিক্রেতারা জানান, আড়তেই লেবুর সংকট। প্রতিটি লেবু পাইকারি কিনতে হচ্ছে ১৮ থেকে ৪৫ টাকায়। পরিবহন, শ্রমিক ও বাজার খরচ যোগ করে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
লেবুর বাজার সুত্রে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গলে রয়েছে শতাধিক লেবুর আড়ত। এসব আড়তে প্রতিদিন কয়েক লাখ লেবু পাইকারি বাজারে বিক্রি হয়। পবিত্র রমজানে বাজারে লেবুর চাহিদা বেশি থাকায় ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় গত রমজানের একদিন আগ থেকেই রে লেবুর দাম আকাশছোঁয়া। হালি প্রতি বিক্রি হচ্ছে আকারভেদে ৬০-২২০ টাকা দরে। পাইকারি হালি ৪০ টাকা থাকলেও খুচরা বাজারে তা ৬০ টাকা ছুঁয়েছে।
রমজানের ইফতারে লেবুর শরবতের চাহিদা বেশি থাকায় ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও অনেকে প্রয়োজনের তুলনায় কম কিনছেন।
বাজারে লেবু কিনতে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েক দিন আগে আমার বোনের সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে। ডাক্তার বলছেন বেশি বেশি লেবু খাওয়াতে। কিন্তু বাজারে লেবুর দাম শুনে আর কেনা হলো না। এক সপ্তাহ আগে বাজার থেকে ১৫ টাকা করে হালি যে লেবু কিনেছিলাম এখন সেই লেবুর দাম ৬০ টাকা। অবাক লাগে কী করে এমন দাম হঠাৎ করে বাড়ল।’
লেবু কিনতে আসা শারমিন আক্তার বলেন, ‘রমজানে ইফতারের সময় আমার আম্মু লেবুর শরবত খুব পছন্দ করেন। রমজানে লেবু ছাড়া আমাদের পরিবার চলে না। কিন্তু বড় লেবুর হালি ২০০ টাকা। অনেক ঘুরে ১৯০ টাকায় দুই হালি কিনেছি। এই দাম থাকলে লেবু খাওয়া বাদ দিতে হবে।’
আড়তদাররা বলেন, এ বছর লেবুর সরবরাহ কম থাকা এবং রমজান উপলক্ষে লেবুর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় দাম বেড়েছে।
বাজারের খুচরা বিক্রেতা শান্ত দাশ বলেন, ‘পাইকারিতে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। গতকাল যে দামে কিনেছি, আজ কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আড়তে লেবু পাওয়া যায় না।’
লেবু ব্যবসায়ী আলাল মিয়া বলেন, ‘দাম বাড়ায় ক্রেতারা কম কিনছেন। ভরা মৌসুমে দাম পাওয়া যায় না। এখন সিজন না থাকায় দাম বেশি।’
লেবু চাষী, আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লেবুর মৌসুম হচ্ছে বর্ষাকাল। এ সময় প্রচুর লেবু উৎপাদিত হয়। তখন দামও থাকে কম। শুকনো মৌসুমে লেবুর উৎপাদন প্রাকৃতিক কারণেই কমে যায়। যারা গাছের বাড়তি যত্ন করেন, তাদের বাগানে সবসময় লেবু থাকে। তবে সেটা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এমন পরিস্থিতিতে রমজানে লেবুর চাহিদা বাড়ায় দামও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে লেবু বাগান ঘুরে দেখা গেছে, গাছে নতুন করে ফুল ফুটলেও পানির অভাবে অনেক ফুল ঝরে যাচ্ছে। যেসব বাগান মালিক সেচ ও সারের ব্যবস্থা করছেন, তারা সীমিত ফলন পাচ্ছেন।
লেবুর বাগান মালিক অনিরুদ্ধ সেনগুপ্ত বলেন, ‘এ বছর বৃষ্টি না হওয়ায় ফলন খুব কম। পানির অভাবে ফুল ঝরে গেছে। স্বাভাবিক ফলনের চার ভাগের এক ভাগও হয়নি। মোটর চালিয়ে সেচ দিতে হচ্ছে, সারের দামও দ্বিগুণ। ভরা মৌসুমে আমরা ন্যায্য দাম পাই না, আর এখন সিজন নেই। তাই বাজারে দাম বেশি হলেও বাগানে লেবু নেই।’
আরেক বাগান মালিক শিপন মিয়া বলেন, ‘ভরা মৌসুমে প্রতিটি গাছে ২৫০-৩০০টি লেবু ধরলেও এখন অনেক গাছে ৩-৫টির বেশি নেই। ১০০ লেবু বাজারে পাঠাতে আমাদের পুরো বাগান ঘুরতে হচ্ছে।’
ক্রেতাদের দিক থেকেও বাজার পরিস্থিতি কম উদ্বেগজনক নয়। রমজান মাসে ইফতারের টেবিলে লেবুর শরবত বা লেবু ছাড়া অনেক খাবার অসম্পূর্ণ মনে হয়। ফলে এই সময় লেবুর চাহিদা সাধারণত বাড়ে। কিন্তু বর্তমান দামে অনেক পরিবার লেবু কিনতে পারছেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা মাসুম আহমদ বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল লেবুর জন্য বিখ্যাত, অথচ এখানকার মানুষই এখন প্রয়োজন অনুযায়ী লেবু কিনতে পারছেন না।’
স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারাও এই পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘উপজেলায় ১ হাজার ২৩৫ হেক্টর জমিতে লেবু চাষ হয়। দীর্ঘদিনের খরায় ফলন কমেছে। লেবুর বাগান মালিকদের সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে পানি দেওয়া ও গাছের গোড়ায় সার প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়ার স্বাভাবিকতা ফিরে এলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে।’
মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনও সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের উদ্যোগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, পুলিশ এবং উপজেলা ও পৌর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে বাজার মনিটরিং করা হয়েছে। খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের সতর্ক করা হয়েছে যাতে তারা অযৌক্তিকভাবে দাম না বাড়ান। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত নজরদারি চালানো হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষিপণ্যের বাজারে সরবরাহ কমে গেলে দাম বাড়া স্বাভাবিক একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। তবে সমস্যা হয় যখন সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করে। তাই প্রশাসনিক নজরদারির পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে, যার ফলে ভবিষ্যতে এমন মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা আরও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্যে, কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করা গেলে সরবরাহ সংকট অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবন করা গেলে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা সহজ হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি একদিকে যেমন ক্রেতাদের জন্য চাপ তৈরি করেছে, অন্যদিকে কৃষকদের জন্যও এটি একটি মিশ্র বাস্তবতা তৈরি করেছে। ফলন কম হওয়ায় অনেক কৃষক প্রত্যাশিত লাভ পাচ্ছেন না, আবার যারা কিছুটা ফলন পেয়েছেন তারা বেশি দামে বিক্রি করে সাময়িক সুবিধা পাচ্ছেন। তবে সামগ্রিকভাবে বাজারের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় সবাই এক ধরণের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
সব মিলিয়ে মৌলভীবাজারে লেবুর বাজারে চলমান অস্থিরতা স্থানীয় অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া, সরবরাহ বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক নজরদারি জোরদার হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেকে/এসএ