অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে বাংলাদেশ। গোপনীয়তার কারণে এ চুক্তির বিষয়গুলো প্রকাশ করা হয়নি। সম্প্রতি চুক্তির কিছু বিষয় প্রকাশ্যে এসেছে। এতেই নড়েচড়ে বসেছেন দেশের ব্যবসায়ী মহল। তারা চুক্তি পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছেন। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরাও এ চুক্তির সমালোচনা করে বলছেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রেরই স্বার্থ বেশি রক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশ কিছু সুবিধা পেলেও এ চুক্তির ফলে ভবিষ্যতে বড় সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।
এদিকে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা পাঠান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানেও তিনি বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ তোলেন এবং চুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে তাগাদা দেন। এরপর বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল ৯ মাস ধরে। কিন্তু গোপনীয়তার শর্তের কারণে তখন এর বিস্তারিত প্রকাশ করেনি কোনো পক্ষ। এখন চুক্তি প্রকাশ হওয়ার পর বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদদের অনেকেই বলছেন, এ চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন হওয়া দরকার। চুক্তির খুঁটিনাটি বিষয়ের দিকে নজর দিয়ে এটাও বলা হচ্ছে যে, চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি, বরং প্রধান্য পেয়েছে আমেরিকার ইচ্ছা। ফলে অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের উচিত চুক্তি পরীক্ষা করে দেখা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে অন্তর্বর্তী সরকার এত অস্থির ছিল কেন—এ প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘তারা (অন্তর্বর্তী সরকার) এই যে চুক্তিগুলো এভাবে করল, বাংলাদেশকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফেলল। ইচ্ছা করলেই বলতে পারত, নির্বাচিত সরকার আসছে, আপনারা নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন।’ এ প্রসঙ্গে আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘তাদের (অন্তর্বর্তী সরকার) উৎসাহ, সেই বাজেটের সময় থেকে তাদের উৎসাহ অতিমাত্রায় বেশি ছিল।’
নতুন সরকারের প্রতি বাণিজ্য চুক্তি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, এ চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে বড় ধরনের সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে খোলামেলা আলোচনা এবং প্রয়োজনে চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। বিএনপির সরকারের প্রতি আনু মুহাম্মদের আহ্বান, ‘সবার আগে বাংলাদেশ—তারেক রহমানের এই স্লোগান যদি সত্যি হয়, তারেক রহমান যদি এটা সিরিয়াসলি মিন করে থাকেন, তাহলে প্রথম কাজ হলো, এ চুক্তিগুলো থেকে বাংলাদেশ কীভাবে মুক্তি পাবে, তার রাস্তা পরিষ্কার করা। এ চুক্তিগুলো যারা সম্পাদন করেছেন, তাদের জবাবদিহি ও বিচারের আওতায় আনা।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তিকে ‘ভয়াবহ’ ও ‘বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী’ বলে মন্তব্য করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘নির্বাচনের কয়েক দিন আগে রবিবার (৯ ফেব্রুয়ারি) চুক্তি স্বাক্ষরের কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ এখনো এমন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। যেসব দেশ করেছে, তাদের চুক্তির শর্ত বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ভালো।’
চুক্তির শর্তের কথা উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘সরকার দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করলে তৈরি পোশাক খাত শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, সেখানে এত শর্ত আর অনিশ্চয়তা রয়েছে যে, বাস্তবে কোনো সুবিধা মিলবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তুলার দাম বেশি হবে। রপ্তানির পরিমাণও নির্দিষ্ট করা নেই।’
চুক্তি বাতিল বা পুনর্বিবেচনার দাবি—আলোচনা সভায় দেওয়া বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তিকে ‘অসম ও ক্ষতিকর’ বলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের একেবারে শেষ সময়ে স্বাক্ষরিত এ চুক্তি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পনীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।’ তার মতে, চুক্তিতে এমন কিছু বাধ্যতামূলক শর্ত রাখা হয়েছে, যা বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতা দুর্বল করে দিয়েছে।
চুক্তিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও কৃষিশিল্প খাতে ভর্তুকি সীমিত করার শর্ত থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করে মোশাহিদা সুলতানা বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের শিল্পকে দাঁড় করাতে ভর্তুকি প্রয়োজন।’
চুক্তি বাতিল অথবা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদে আলোচনা করা এবং জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল।
সামগ্রিকভাবে চুক্তিতে বাংলাদেশের চেয়ে আমেরিকা বেশি লাভবান হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘চুক্তিতে অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তারা কী করবে, আমরা কী করব—এ বিষয়গুলোতে যে চারগুণ বেশি আমাদের বাধ্যতামূলকভাবে করার ক্লজ আছে, সেখান থেকেও বোঝা যায় (আমেরিকার প্রাধান্য)। আর সাধারণভাবেও এটার যে সাবস্ট্যান্স, সেখান থেকেও বোঝা যায় যে, এটা তাদের পক্ষে গেছে।’
চুক্তির যে বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন : চুক্তির শেষ দিকে সেকশন ছয়ে কমার্শিয়াল কনসিডারেশন নামে মূলত কিছু কেনাকাটার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ যে আমেরিকা থেকে কম আমদানি করছে, সেটা পুষিয়ে নিতে বাংলাদেশ কী কী কেনাকাটা ভবিষ্যতে বাড়াবে, সেটা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আমেরিকা থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে ১৪টি, ১৫ বছরে জ্বালানি কিনবে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের এবং বছরে কৃষিপণ্য আমদানি করবে সাড়ে তিনশ কোটি ডলারের। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এতসব কেনাকাটা শুধু ক্রয় বাড়ানোর জন্যই করা হচ্ছে, নাকি এগুলোর চাহিদা আছে? আবার চাহিদা যাচাই না করেই এসব কেনা হলে সেটার অর্থনৈতিক ক্ষতিটা হবে বাংলাদেশেরই।
সংখ্যা বা অঙ্ক ধরে কেনার কথা বলায় ঝুঁকি দেখতে পান সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এগুলো একবারেই কংক্রিট নাম্বার দিয়ে বলা হয়েছে। আবার পরে কোনো সময় যদি প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন এসব ক্রয় পেছানো দুষ্কর হয়ে যাবে। তখন পেছাতে গেলেই বলবে যে, তাহলে আবার পাল্টা শুল্ক, যেটা প্রথমে দেওয়া হয়েছিল ৩৭ শতাংশ, সেখানে নিয়ে যাব।’
ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কেও টানাপড়েন হতে পারে : অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড নামের এ চুক্তিতে উভয় দেশই বহু পণ্যে শুল্ক ছাড় পাবে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ছয় হাজার ৭১০টি পণ্য এবং বাংলাদেশের এক হাজার ৬৩৮টি পণ্য থাকছে। কোনো কোনো পণ্য শুরু থেকেই, আবার অনেক পণ্য ধাপে ধাপে শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় আসবে। তবে এতে করে বাংলাদেশের রাজস্ব আয় কমবে।
এ ছাড়া সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির বাইরেও আরও কিছু বিষয় আছে, যেখানে চীন-রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে। যেমন, চুক্তির শেষে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর চেষ্টা করবে। বিপরীতে নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে কেনাকাটা সীমিত করার চেষ্টা করবে। যদিও কোন দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা কমাতে হবে, সেটা নির্দিষ্ট করা হয়নি। বাংলাদেশ এখন বেশি কেনে মূলত চীন থেকে।
এ ছাড়া চুক্তির চতুর্থ সেকশনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত আছে এমন দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, ফুয়েল রড অথবা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনা যাবে না।
এ ধারাগুলোর ফলে চীন-রাশিয়া, যাদের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক কেনাকাটা কিংবা জ্বালানি আমদানির সম্পর্ক আছে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক চাপে পড়তে পারে। কারণ এ চুক্তি বাংলাদেশকে ধাপে ধাপে চীন-রাশিয়া থেকে আমেরিকামুখী করবে। যেখানে চীন-রাশিয়া তাদের বাংলাদেশের বাজার হারানোর শঙ্কায় থাকবে।
ফলে শুধু এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক চাপে পড়তে পারে তা নয়, বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দুর্বল হবে।
কেকে/এলএ