কক্সবাজারের রামু উপজেলা এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে হত্যা, ডাকাতি, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার অভিযানের একাধিক ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হলেও থানা পুলিশ বলছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
গত এক মাসে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার এবং একাধিক আসামি গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। তবে সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় মাদক ও চোরাচালান তৎপরতা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের।
রামুতে মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার অভিযান :
গত এক মাসে রামু থানা এলাকায় মাদক পাচার ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। পুলিশ ও বিজিবির ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে যেভাবে অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে তাতে আইনশৃংখলা ভাল আছে বলে মনে হয় না।
এদিকে রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়ন বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিক থেকে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত এক মাসে এই ইউনিয়নে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড এবং মাদক ও পণ্য চোরাচালানের আধিক্য দেখা গেছে। গর্জনিয়া বাজারের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী মায়ানমার নিত্যপন্য পাচার করছে বলে খবর রয়েছে আর এতে অঘোষিতভাবে সমর্থন রয়েছে পুলিশ প্রশাসনের সাধারণ মানুষ এমনটা মনে করছে। তারা মনে করছে যদি পুলিশ সজাগ থাকলে বাংলাদেশি পণ্য মায়ানমারে যাওয়া সম্ভব নয়।
রামুর সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন গর্জনিয়া এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে গত ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ঘটে যাওয়া একটি হত্যাকাণ্ড পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
যুবককে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা :
গর্জনিয়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝিরকাটা বেলতলী এলাকায় শফিউল আলম (৩৮) ওরফে লেদা পুতু নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গত ২৩ জানুয়ারি দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে মসজিদের সামনে গুলি করা হয়। নিহত ব্যক্তি ওই এলাকার আলোচিত ডাকাত শাহীনের সহযোগী বা 'সেকেন্ড ইন কমান্ড' হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সীমান্ত চোরাচালান:
গর্জনিয়া সীমান্ত দিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার থেকে গরু, মাদক এবং বিভিন্ন চোরাই পণ্য আসার হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এসব চোরাচালান চলছে, যা এলাকার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে।
এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং চোরাচালানের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাড়ছে। মাঝিরকাটা ও থোয়াইঙ্গাকাটা এলাকায় রাতে অপরিচিত ব্যক্তিদের আনাগোনা বাড়ায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। গর্জনিয়া পুলিশ ফাঁড়ির টহল জোরদার করা হলেও ভৌগোলিক কারণে (দুর্গম পাহাড় ও সীমান্ত এলাকা) অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। পুলিশ লেদা পুতু হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের শনাক্ত করতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে ।
এদিকে গত এক মাসে রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নে বেশ কিছু আলোচিত অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন হওয়ায় এই ইউনিয়নে অপরাধের ধরণ কিছুটা ভিন্ন। রামুর খুনিয়াপালং ইউনিয়ন বর্তমানে অপহরণ, মাদক পাচার এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক অপরাধের কারণে উত্তপ্ত। গত ১০ জানুয়ারি খুনিয়াপালং ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে অপহৃত ৩ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেছে রামু থানা পুলিশ। অপহরণকারীরা মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে তাদের আটকে রেখেছিল বলে জানা গিয়েছিল। এ সময় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
খুনিয়াপালংয়ের স্থানীয় বাসিন্দারাও প্রায়ই এই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় অপহরণকারীদের কবলে পড়ার অভিযোগ করছেন।
উখিয়া ও টেকনাফ থেকে কক্সবাজার শহরে প্রবেশের অন্যতম রুট হওয়ায় খুনিয়াপালং এলাকায় মাদক পাচারকারীদের তৎপরতা বেড়েছে। সম্প্রতি মরিচ্যা চেকপোস্ট ও তৎসংলগ্ন এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে বেশ কিছু মাদকের চালান জব্দ করেছে বিজিবি ও পুলিশ।
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি:
উখিয়া ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে বের হয়ে খুনিয়াপালংয়ের বিভিন্ন লোকালয়ে মিশে যাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এতে স্থানীয় শ্রমবাজার ও সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। এ কারণে যৌথ বাহিনীর টহল ও নজরদারি এই ইউনিয়নে কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে ।
খুনিয়াপালংয়ের পাহাড়ি এলাকায় এক শ্রেণির প্রভাবশালী মহল কর্তৃক অবৈধভাবে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রির অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে, যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। খুনিয়াপালং ইউনিয়নটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ইউনিয়নটি ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ নজরদারি বৃদ্ধি করেছে।
অন্যদিকে রামুর কাউয়ারখোপ ইউনিয়ন গত এক মাসে কয়েকটি ভিন্নধর্মী ঘটনার কারণে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় অপরাধী চক্রের তৎপরতা এবং দীর্ঘদিনের একটি বোমা উদ্ধারের ঘটনা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
পাহাড়িয়া পাড়ায় ডাকাতি ও লুটপাট:
গত জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় একটি দুর্র্ধষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে । ডাকাত দল দেশীয় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ১০ ভরি স্বর্ণ এবং নগদ ১ লাখ টাকা লুট করে নেয়। এ ঘটনায় পুলিশ একজনকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে। কাউয়ারখোপের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ভিলিজার পাড়া এলাকায় একটি সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। দেড় বছরের এক শিশু অন্যের তামাক ক্ষেতে ঢুকে পড়ায় শিশুর নানার ওপর দেশীয় অস্ত্র ও কুড়াল দিয়ে হামলা চালায় প্রতিপক্ষ। এতে ওই ব্যক্তি গুরুতর আহত হন।
২৫ জানুয়ারি কাউয়ারখোপের লট উখিয়ারঘোনা তচ্ছাখালী এলাকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি বড় অবিস্ফোরিত বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, স্থানীয়রা প্রায় ১৫ বছর ধরে এই বোমার ওপর দাঁড়িয়ে কাপড় কাচা ও লাকড়ি কাটার কাজ করে আসছিলেন। সেনাবাহিনী পরে এটি নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা নেয়।
বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার:
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রামু থানা পুলিশের একটি বিশেষ অভিযানে ১ লাখ ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে । উপজেলার ফতেখাঁরকুল এলাকায় অস্থায়ী চেকপোস্ট বসিয়ে একটি পিকআপ ভ্যান থেকে এই বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করা হয়। একই দিন পৃথক অভিযানে আরও ৭০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ। এছাড়া ১৮ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে সীমান্তে বিজিবির সাথে মাদক পাচারকারীদের গুলি বিনিময়ের পর প্রায় ৯.৮ লাখ পিস ইয়াবা পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
হত্যা ও হামলা:
গত জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে রামুতে মোহাম্মদ বাবুল (৪০) নামে এক টমটম চালককে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করে তার গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এছাড়া গত ১ ফেব্রুয়ারি রামুতে এক চিহ্নিত ডাকাত ও হত্যা মামলার আসামি অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারীদের গুলিতে নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রামুর কাউয়ারখোপ ইউনিয়নে সড়ক দুর্ঘটনায় এক কিশোরের মৃত্যু এবং ৪ জন আহত হওয়ার ঘটনাও গত মাসে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে ।
অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ:
পুলিশি অভিযানে ঈদগড় ইউনিয়ন থেকে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও চাইনিজ রাইফেলের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। আটক ব্যক্তি একজন দক্ষ আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির কারিগর বলে পুলিশ জানিয়েছে। এছাড়া ফতেখাঁরকুল এলাকায় ডাকাতির প্রস্তুতিকালে অস্ত্রসহ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
অন্যান্য ঘটনা:
সম্প্রতি রামুর ১২-১৩ বছর আগের বৌদ্ধ বিহারে হামলার মামলার অন্যতম অভিযুক্ত উত্তম বড়ুয়ার প্রকাশ্যে আসার খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রামু থানার বর্তমান অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভুঁইয়া জানিয়েছেন, সম্প্রতি আমারা জঙ্গি কাজে ব্যবহৃত প্রায় ১৬ শত বাউন্ডেলে আটক করেছি। ঈদগড়ে অসত্র কারখানা ধ্বংস করা হয়েছে এবং অস্ত্রসহ যারা অস্ত্র তৈরি কওে তাদের আটক করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে । মাদক ও সন্ত্রাস দমনে পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রয়েছে এবং নিয়মিত টহল ও চেকপোস্ট জোরদার করা হয়েছে।
কেকে/ এমএস