নওগাঁয় বেশির ভাগ আম গাছ মুকুলে ছেয়ে গেছে। শহর থেকে গ্রামের প্রতিটি এলাকায় এখন বাতাসে মিষ্টি ঘ্রাণ। এ দৃশ্য এখন দেশের অন্যতম আম উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আম গাছে এবার প্রচুর মুকুল এসেছে।
আমের মুকুলের আধিক্য দেখে বাম্পার ফলনের স্বপ্ন বুনছেন বাগান মালিক ও চাষিরা। ফলন ভালো করতে মুকুলের পরিচর্যা করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা।
তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত আবহাওয়া আম চাষের অনুকূলে রয়েছে। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এ বছর আমের বাম্পার ফলন হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নওগাঁ জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক হুমায়রা মণ্ডল বলেন, ‘গত বছর শীত দীর্ঘ মেয়াদি হওয়া এবং পরবর্তীতে তীব্র খরার কারণে আমের মুকুল ও গুটিতে ঝরে পড়ায় ফলন বিপর্যয় হয়েছিল। তবে এবার এখন পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে গাছে গাছে মুকুল আসা শুরু করেছে। মুকুল ধরতে শুরু করার পর থেকে তাপমাত্রাও বাড়তে শুরু করেছে। এছাড়া এই সময়টায় এবার ঘনকুয়াশাও হয়নি। ফলে এখন পর্যন্ত কোনো মুকুল ঝরে পড়েনি।’
‘এখন পর্যন্ত আবহাওয়া আম চাষের অনুকূলে থাকায় এবার আমের অন-ইয়ার হবে বলে আশা করছি। এরপরেও মুকুল ও গুটি যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য আমরা চাষিদের কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দিচ্ছি।’
নওগাঁর পত্নীতলা, সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর ও বদলগাছী উপজেলায় গত দুই দশক ধরে ব্যাপক হারে আমের চাষ হচ্ছে।
এসব এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আম বাগানগুলো হলুদ হয়ে আছে। বসন্ত বাতাসে আম গাছে দোল খাচ্ছে মুকুল। আম গাছ ও মুকুলের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা।
বাগান মালিকেরা জানান, ফল হিসেবে মৌসুমি আম ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় প্রতি বছরই বাড়ছে আমবাগানের সংখ্যা। নওগাঁতে চাষ হওয়া বিভিন্ন জাতের আমের মধ্যে আম্রপালি জাতের আম চাষ হয়ে থাকে সবচেয়ে বেশি। নওগাঁয় চাষ হওয়া আমের ৫০ শতাংশের বেশি আম্রপালি চাষ হয়ে থাকে। এছাড়া বারি আম-৪, নওগাঁর জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নাকফজলি আম, ব্যানান ম্যাংগো ব্যাপক হারে চাষ হয়ে থাকে। আম চাষ নওগাঁর অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।
আম চাষিরা জানান, নিয়ম অনুযায়ী এক মৌসুমে ভালো ফলন হলে পরের বার আমের ফলন কম হয়। সে হিসাবে গত বছর নওগাঁয় আমের ফলন কম হওয়ায় এবার তারা আমের বাম্পার ফলনের আশায় আছেন। বাগানে প্রায় সব গাছেই মুকুল এসেছে। শীতের তীব্রতা ও ঘন কুয়াশা না থাকায় মুকুলের তেমন ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। তারপরেও আশানুরূপ ফলন পেতে কৃষি বিভাগের পরামর্শে আম গাছে এই মুহূর্তে দরকারি কীটনাশক স্প্রে করছেন তারা।
এবার নওগাঁ জেলায় ৩০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির বাগানে আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে কৃষি বিভাগ। গত বছর এই পরিমাণ ছিল ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টর। গত বছর আমের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার টন। তবে ফলন বিপর্যয় হওয়ায় উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন। এবার ৪ লাখ ৫০ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ।
নওগাঁর সাপাহার ও পোরশা উপজেলায় সবচেয়ে বেশি আম চাষ হয়। এই দুই উপজেলাতেই প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির বাগানে এবার আম চাষ হয়েছে। সাপাহার উপজেলার গোডাউনপাড়া এলাকাসহ ২০০ বিঘা জমির ওপর তিনটি আম বাগান রয়েছে তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানার। তিনি স্থানীয় বাজারে আম বিক্রি ছাড়াও বিদেশেও আম রপ্তানি করে থাকেন।
সোহেল রানা বলেন, ‘গত বছর তার বাগানে ৫০-৬০ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছিল। এবার এখন পর্যন্ত তার বাগানে ৮০ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছে। ফাল্গুন মাস আমের মুকুল আসার উপযুক্ত সময়। আশা করছি, আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে বাকি গাছগুলোয়ও মুকুল আসবে। আবহাওয়া এখন পর্যন্ত আমের জন্য অনুকূলে আছে। কিছু কিছু মুকুলে গুটিও আসতে শুরু করেছে। মুকুল ধরা ও গুটি আসার এই সময়টায় রোদের তাপ ভালো পাওয়ায় মুকুলে ছত্রাকের আক্রমণ তেমনটা নেই।’
নওগাঁ সদরের বাঙ্গাবাড়ীয়া এলাকার বাসিন্দা নাজনীন বানু বলেন, ‘এবার আম গাছে প্রচুর মুকুল এসেছে। গত বছর শীতের কারণে অনেক দেরিতে মুকুল এসেছিল। ১৫-২০ দিন দেরি হয়েছিল। মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়েও অনেক গাছে মুকুল ধরেছিল। তবে সে তুলনায় এবার অনেক আগেই মুকুল এসেছে। আশা করা যায় এবার আমের ভালো ফলন হবে।’
কেকে/এসএ