রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীর একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা মঙ্গলবার বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন। বেলা দেড়টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বরের প্রধান সড়কে অবরোধ করা হয়। বেতন-ভাতার দাবিতে এরকম শ্রমিক বিক্ষোভ বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। বরং রমজান মাসে এবং ঈদের আগে এ প্রবণতা বাড়ে।
বিশেষ করে বকেয়া বেতন না পেয়ে প্রায় প্রতি ঈদের আগে বিক্ষোভে নামেন শ্রমিকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অনেক সময় সরকারকে ভূমিকা নিতে হয়। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এবারও রোজার মধ্যে ঈদের আগে শ্রমিকরা রাস্তায় নামতে পারেন।
ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকার সদ্যই দায়িত্ব নিয়েছে। এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে পবিত্র রমজান। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহেই উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল ফিতর। আর এবারও যদি ঈদের আগে মালিকপক্ষ ঠিকমতো বেতন-বোনাস পরিশোধ না করেন, তাহলে শ্রমিকরা রাস্তায় নামতে পারেন। যদি তা ঘটে, তবে সরকারের জন্য তা বিব্রতকর হবে। এমনকি শ্রমিক বিক্ষোভকে পুঁজি করে পলাতক ফ্যাসিস্ট শক্তি এবং প্রতিপক্ষ সুযোগ নিতে পারে। এতে অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে দেশ।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, ট্রাম্পের শুল্ক নিয়ে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের আদেশ এবং পরবর্তিতে ট্রাম্পের পাল্টা ১৫ শতাংশ শুল্কের ঘোষণায় দেশটির ক্রেতারা দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে। যার প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের পোশাক খাতেও। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বৃহত্তর পোশাকবাজার। কিন্তু শুল্ক পরিস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয়াদেশ কমে যেতে পারে। এতে আয় কমে গেলে শ্রমিকদের বেতন নিয়ে সংকটে পড়বে কারখানাগুলো।
রপ্তানি হারানোর শঙ্কায় পোশাক খাত :
মাত্র পাঁচ মাসের জন্য ঘোষিত ১৫ শতাংশ শুল্ক কি থাকবে, বাতিল হবে, নাকি আরও বাড়বে? এ প্রশ্নের উত্তর না মেলায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা অর্ডার স্থগিত রাখছেন, বলছেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। ফলে দেশের রপ্তানি প্রবাহে তৈরি হয়েছে দৃশ্যমান ধীরগতি। নতুন অর্ডার স্থগিত থাকার পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পারস্পরিক শুল্ক বাতিল করার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে আরোপিত ১৫ শতাংশ শুল্ক বিদ্যমান চালানের ক্ষেত্রেও নতুন করে দরকষাকষির জন্ম দিয়েছে।
২০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে শুল্ক কমানোর পর ইতোমধ্যে উৎপাদন বা প্রক্রিয়াধীন পণ্যের ওপর ২ শতাংশ মূল্যছাড় দাবি করছেন কয়েকজন মার্কিন ক্রেতা। রপ্তানিকারকদের ভাষ্য, এতে আগেই সংকুচিত মুনাফা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, ক্রেতারা এখন ন্যূনতম পরিমাণ অর্ডার দিচ্ছেন। এ প্রবণতা দীর্ঘায়িত হলে দেশের পোশাক রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
১৪০০ কোটি টাকার ‘সফট লোন’ চাইল বিজিএমইএ :
আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধে সম্ভাব্য চাপ মোকাবিলায় বকেয়া নগদ প্রণোদনার অর্থ দ্রুত ছাড় এবং দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ স্বল্পসুদে ঋণ (সফট লোন) চেয়েছে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এ ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
মঙ্গলবার দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিজিএমইএর একটি প্রতিনিধি দল এ সংক্রান্ত চিঠি হস্তান্তর করেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন সংগঠনের সিনিয়র সহসভাপতি এনামুল হক খান বাবলু ও সহসভাপতি শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী।
সাক্ষাৎ শেষে বিজিএমইএর সহসভাপতি শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘পোশাক খাতে বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকার নগদ প্রণোদনা বকেয়া রয়েছে। ঈদের আগে যাতে কোনো কারখানা বেতন-বোনাস দিতে সমস্যায় না পড়ে, সে জন্য এই অর্থ দ্রুত ছাড়ের অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ সহজ শর্তে ‘সফট লোন’ চাওয়া হয়েছে।’
প্রতিবছর ঈদের আগে কেন এ ধরনের ঋণের প্রয়োজন হয় এমন প্রশ্নের জবাবে বিজিএমইএ নেতারা বলেন, এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন, শ্রমিক অসন্তোষ এবং নির্বাচনি পরিস্থিতির প্রভাব শিল্পে পড়েছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কনীতির প্রভাবেও রপ্তানি খাত চাপে রয়েছে। বিজিএমইএর দাবি, গত সাত মাস ধরে পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। এ সংকটকালে শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের দ্রুত নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। তারা শুধু জমে থাকা পাওনা এবং যৌক্তিক ভিত্তিতে স্বল্পমেয়াদি সহায়তা চেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।
মিরপুরে শ্রমিক বিক্ষোভ :
মঙ্গলবার বেলা ৩টার দিকে সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা। বিক্ষোভ ও অবরোধের কারণে মিরপুর-১১ নম্বর সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
শ্রমিকদের অভিযোগ, পল্লবীর ৭ নম্বর সেকশনের অ্যালায়েন্স ভবনে অবস্থিত এস এম ফ্যাশন কারখানার শ্রমিকদের গত জানুয়ারি মাসের বেতন-ভাতা গত সোমবার পরিশোধ করার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও মালিকপক্ষ বেতন-ভাতা পরিশোধ করেননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শ্রমিকেরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ করছেন।
আন্দোলনরত শ্রমিকরা জানান, কয়েক দফা আশ্বাসের পরও বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়নি। অবিলম্বে বকেয়া পরিশোধের সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
পল্লবী থানার ডিউটি অফিসার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহজাহান বলেন, ঘটনাস্থলে থানা-পুলিশের দল পাঠানো হয়েছে। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
কেকে/ এমএস