বগুড়া-৬ (সদর) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকার আসন রেখে বগুড়ার আসনটি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেন। এরপর থেকেই উপনির্বাচনকে ঘিরে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। শহর থেকে গ্রাম, চায়ের দোকান, বাজার, দলীয় কার্যালয় সবখানেই এখন একটাই প্রশ্ন- বগুড়া-৬ আসনে কে পাচ্ছেন বিএনপির মনোনয়ন?
শহরের সাতমাথা এলাকায় ফল ব্যবসায়ী আবু জাফর, রিকশা চালক আব্দুস সালাম বলেন, বগুড়া সদর থেকে তারেক রহমান নিজে নির্বাচিত হয়েছেন, তাই যদি পরিবারের কাউকে মনোনয়ন দেন, তাহলে বগুড়াবাসী বেশি খুশি হবে। অন্যদিকে দলের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা বলেন, আমরা চাই এমন একজন প্রার্থী আসুক, যিনি বগুড়ার মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কলেজ শিক্ষক বলেন, “পরিবার থেকে মনোনয়ন দিলে সহানুভূতির ভোট পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয়, মাঠপর্যায়ে পরীক্ষিত কাউকে দিলে দল আরও শক্ত অবস্থানে থাকবে।”
বগুড়া সদরের সাতশিমুলিয়া গ্রামের কৃষক মতিউর রহমান বলেন, “আমরা বড় নেতাদের নাম জানি, কিন্তু দরকার এমন এমপি যিনি আমাদের রাস্তা-ঘাট, কৃষি আর বাজারের সমস্যাগুলো বুঝবেন।”
বিএনপির ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা বলেন, “দলের দুঃসময়ে যারা মাঠে ছিলেন, মামলা-হামলা মোকাবিলা করেছেন, কর্মীদের আগলে রেখেছে। বিপদে আপদে নিজের টাকা খরচ করে কর্মীদের দেখভাল করেছেন তাদের মধ্য থেকে কাউকে মনোনয়ন দিলে তৃণমূল কর্মীরা বেশি উৎসাহ পাবে।”
জেলা বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, “তারেক রহমানের পরিবারের কেউ প্রার্থী হলে কেন্দ্রীয় বার্তা শক্ত হবে। তবে স্থানীয় নেতাদের মধ্যেও কয়েকজন যোগ্য প্রার্থী আছেন, যাদের গ্রহণযোগ্যতা ভালো।”
বগুড়া-৬ আসন ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এই আসন থেকে দলটির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পরপর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া বগুড়া-৬ আসনে ১ লাখ ৩৬ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি ভোট পেয়েছিলেন ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৫৫। ২০০৮ সালে তিনি ভোট পেয়েছিলেন ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৯৩ ভোট। ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় এই আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী নুরুল ইসলাম ওমর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রার্থী হয়ে ২ লাখ ৭০ হাজার ২৫ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালে বিএনপি ও জামায়াত ভোট বর্জন করায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী রাগেবুল আহসান ভোট পেয়েছিলেন মাত্র ৫৩ হাজার ২২৬ ভোট। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রার্থী হয়ে ২ লাখ ১৬ হাজার ২৮৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। এবারের নির্বাচনে জামায়াত ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী আবিদুর রহমান সোহেল ভোট পেয়েছেন ৯৭ হাজার ৬২৬ ভোট।
অতীতে এই আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ার পর খালেদা জিয়া ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আসন ছেড়ে দিয়েছিলেন। এবারও তারেক রহমান নির্বাচিত হওয়ার পর আসন ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
তারেক রহমানের আসন হওয়ার কারণে উপনির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে জেলা বিএনপির কোনো নেতা মুখ খুলছেন না। তারা বলেছেন, এই আসনে যে কাউকে মনোনয়ন দিলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে থাকেন। তবে জিয়া পরিবার থেকে প্রার্থী দিলে আবেগের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে, আর জেলার নেতাদের মধ্য থেকে দিলে সংগঠন শক্তিশালী হবে।
উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘিরে গুঞ্জন বাড়ছে। কেউ মুখ না খুললেও জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা, সাবেক সভাপতি একেএম মাহবুবর রহমান ও খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা হেলালুজ্জামান তালুকদার লালুর নাম নেতাকর্মীদের মুখে মুখে শোনা যাচ্ছে। এ নেতাদের পক্ষে তাদের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রার্থী হওয়ার জন্য লেখালেখিও করছেন।
তবে শেষ পর্যন্ত দলীয় হাইকমান্ড কাকে মনোনয়ন দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয় বলে মনে করে বগুড়া সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাফতুন আহমেদ খান রুবেল।
তিনি বলেন, জিয়া পরিবার থেকে প্রার্থী দেওয়া হলে বগুড়াবাসী সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন। অন্য কোনো প্রার্থী দেওয়া হলে তিনি যেন এলাকার উন্নয়ন ও জনগণের পাশে থাকার অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ দেন এটাই বগুড়াবাসীর প্রত্যাশা।
কেকে/এসএ