জুলাই গণভ্যুত্থানে নিহত দেড় হাজার শহীদের একটি বড় অংশই পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। গণতন্ত্রকামী সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর এই চরম নিপীড়নমূলক ও প্রাণঘাতী আচরণ তখন থেকেই মানুষের আলোচনায় এসেছে বারবার। শুধু জুলাই নয়, এর আগেও বহুদিন ধরে আমরা বিভিন্ন ন্যায্য আন্দোলনে, বিশেষত শ্রমিকদের আন্দোলনে পুলিশের প্রাণঘাতী ভূমিকা দেখি।
অনেকেই হয়তো জানেন না, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ নামে পুলিশের খোদ একটা আলাদা বাহিনী আছে। শিল্পাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা খাতা-কলমে তাদের কাজ। কিন্তু শিল্পাঞ্চলে তো আইনশৃঙ্খলার ধরন দেশের আরও দশটা জায়গার মতোই। এই বিশেষায়িত বাহিনীর প্রকৃত কাজ দাঁড়ায় শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনসমূহকে বলপূর্বক নিয়ন্ত্রণ করা।
কেবল রাজনৈতিক আন্দোলন-সংঘাতে নয়, পুলিশ ও অন্যান্য বেসামরিক/আধাসামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, কারা হেফাজতে নির্যাতন, এমনকি নিরপরাধ মানুষকে ব্লাকমেইল ও চাঁদাবাজির অসংখ্য ঘটনা বহুবার ডকুমেন্টেড হয়েছে। তবে কোনোক্ষেত্রেই সুষ্ঠু বিচার হয়নি। সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক বদলি নামক এক আজব শাস্তির বিধান হয়েছে যাতে অপরাধী পুলিশ সদস্যকে শহর বা বড় স্টেশন থেকে সরিয়ে প্রান্তিক এলাকা কিংবা পার্বত্য অঞ্চলে বদলি করা হয়, যেন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ভালো ও সৎ পুলিশ পাবার অধিকার নেই!
জুলাই পরবর্তীতে হামলায় জড়িত পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বন্দোবস্তটা যে কি তা আদৌ পরিষ্কার ছিল না জনগণের কাছে। একদিকে আমরা দেখি পুলিশবাহিনী হুট করে কর্মবিরতিতে চলে যায়, তারপর আবার কর্মবিরতি থেকে ফিরে আসে। পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা জনগণের কাছে স্পষ্টতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে হয়নি। ফলে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে থাকা অনেক ফ্যাসিস্ট সরে গেলেও অনেক ফ্যাসিস্ট বর্তমান কাঠামোয় বিভিন্ন ফাকেতালে টিকে যায়। তদপরি পুলিশ বাহিনীর মৌলিক প্রক্রিয়া ও কাঠামো পুরোনো এবং নিপীড়নমূলক থেকে যায়।
পুলিশ সংস্কার কমিশন তৈরির মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীকে গণবান্ধব করার চেষ্টা বিগত সরকার করলেও সেই পুলিশ সংস্কার কমিশনের বেশিরভাগ প্রস্তাবনা ঐকমত্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জুলাই সনদে আসতে পারেনি। যে প্রস্তাবগুলো পুলিশের অতিরিক্ত, অবৈধ বলপ্রয়োগ ও পুলিশ কর্তৃক মারণাস্ত্র প্রয়োগকে আইনানুগ কাঠামোয় নিয়ে আসে এমন প্রায় সকল প্রস্তাবনা আশ্চর্যজনকভাবে বাদ যায় জুলাই সনদ থেকে। কেবল রাজনৈতিকভাবে দুইটি শক্তিশালী দলের মধ্যে যেন পুলিশবাহিনী সরাসরি বিরোধীদলের বিরুদ্ধে সরকারের অস্ত্র না হয়ে ওঠে তার জন্য কিছু গণতান্ত্রিক ও পুলিশ বাহিনীকে স্বাধীন করার প্রস্তাবনা সেখানে আছে।
কিন্তু পুলিশ বাহিনীর স্বাধীন কমিশন অন্যদিকে আবার পুলিশ বাহিনীর ওপর গণতান্ত্রিক সরকারের নিয়ন্ত্রণকেও কমিয়ে আনে। যেখানে আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বে আধুনিক পুলিশিং এর নীতিমালা তৈরিই হয় অবৈধ বলপ্রয়োগ নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশকে গণপ্রতিনিধিদের কাছে বারবার জবাবদিহিতা নেওয়া, সেখানে বাংলাদেশে বুঝি পুলিশ বাহিনীর জবাবদিহিতার চেয়ে রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রশ্নটা বড় হয়ে উঠছে বারবার। কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণও একটা আবশ্যক প্রশ্ন। পুলিশ বাহিনীর সশস্ত্র সক্ষমতা বৃদ্ধি করলে সঙ্গে যদি জবাবদিহিতা ও নিয়ন্ত্রণ না বাড়ে তবে পুলিশবাহিনী নিজেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়াও বারবার জনগণের ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান পুলিশ মোটাদাগে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পক্ষে আছে এমনটা বলা যাবে না। তবু আমরা জুলাই পরবর্তী সময়ে কারা হেফাজতে মৃত্যু, আন্দোলনে শ্রমিকের মৃত্যু এবং শ্রমিকের আন্দোলনে হামলা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে হামলা, অহেতুক বলপ্রয়োগে আটকসহ নানাবিধ পুলিশি অপকর্মের শিকার হয়েছি। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখি গত কয়েকদিনে বিভিন্ন জায়গায় পুলিশি নিপীড়ন।
গত ২৩ তারিখ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতা নাঈম উদ্দিনের ওপর হামলা এরই অংশ। কাঠামোয় নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিকভাবে পুলিশের যে কলোনিয়াল চরিত্র এবং মনোবৃত্তি তাও তাকে অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিজমের দিকে নিয়ে যায়। আমাদের দেশের পুলিশ এখনো জনগণের ‘ভাই’ হওয়ার বদলে ‘স্যার’ হইতে চায়।
শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দিন যখন তাদের প্রশ্ন করে যে সে কোনোরকম অবৈধ কাজ না করে একটা পার্কের রাস্তায় হেঁটে গেলে তাতে সমস্যা কোথায়, সেই প্রশ্নের উত্তর তাদের কলোনিয়াল মনস্তত্ত্বে নাই। সেই অস্বস্তি থেকেই কাপুরুষোচিত উপায়ে পেছন থেকে তার ওপর হামলা করে এক পুলিশ সদস্য।
তাই আজকে আপনার আমার মনে রাখতে হবে পুলিশ আপনার বন্ধু নয়, বরং বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী সহনাগরিক। এই ক্ষমতা আপনি তাকে দেন আপনার নিরাপত্তার স্বার্থে। সেই ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখাও জনগণের দায়িত্ব।
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কেকে/ এমএস