বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই দেশের অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনার ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতে গতি আনতে ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। এরমধ্যে বিনিয়োগ বাড়ানো, বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
তার এ পদক্ষেপগুলো পরোক্ষভাবে বর্তমান সরকারকেই প্রতিনিধিত্ব করছে। সম্প্রতি সরকারপ্রধান তারেক রহমান এক নির্দেশনায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্প কারখানা পুনরায় চালু করা এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করার কথা উল্লেখ করেছেন। ফলে নতুন এ গভর্নরের নেওয়া কর্মপরিকল্পনা ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
রুগ্ণ ও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্প কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিতে ইতোমধ্যে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সমন্বয়ের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এসব শিল্প চালু করা গেলে একদিকে যেমন বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি আসবে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় বিশেষভাবে বন্ধ পাটকল ও চিনিকল দ্রুত চালুর কথা বলা হয়েছে এবং সেখানে পুরোনো শ্রমিকদের বহাল রেখে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু উৎপাদন পুনরারম্ভ নয়; শ্রমিকদের পুনর্বাসন, দক্ষতা ব্যবহার এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও এ পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত রাখা হচ্ছে, যাতে শিল্প পুনরুজ্জীবনের সুফল সরাসরি শ্রমজীবী মানুষের কাছে পৌঁছায়।
ফলে সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী দেশের বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত পুনরায় চালু করতে নীতি সহায়তার কথা জানিয়েছেন নতুন গভর্নর। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঋণের উচ্চ সুদহার, আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্য খাতে চাপ তৈরি হয়েছে। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে পারলে বাজারে আস্থা ফিরবে। তাদের মতে, নতুন গভর্নরের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মুদ্রানীতি স্থিতিশীল রাখা, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর গতকাল বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালকদের সঙ্গে একটি বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে গভর্নর বলেন, ‘উৎপাদন বৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ব্যাংকিং খাতে সমন্বয় জোরদার করা হবে। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ সুদের হার পর্যালোচনা ও ঋণ প্রবাহের ভারসাম্য রক্ষা করা হবে।’
তিনি প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়মভিত্তিক ও বৈষম্যহীন করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং কর্মকর্তাদের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে কাজের গতি বাড়ানোর বিষয়েও জোর দেন। গভর্নর বলেন, ‘পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্জিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করা হবে।’
তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার একটি নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে দেশের অর্থনীতিকে নিম্নস্তরের ভারসাম্যে নিয়ে এসেছে। এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির ধারা তৈরি করা, যাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
তিনি অর্থনীতিকে গতিশীল করতে ১১টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন। এর মধ্যে ম্যাক্রো অর্থনীতি স্থিতিশীল রেখে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বন্ধ কলকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উচ্চ সুদের হার ইস্যু পর্যালোচনা করা। পাশাপাশি মূল্যস্থিতি বজায় রাখা ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বস্তুনিষ্ঠ পদ্ধতি অনুসরণের ওপর জোর দেন।
গভর্নর আরও বলেন, ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় রুল-বেসড কাঠামো কার্যকর করতে হবে এবং কাজের গতি বাড়াতে দায়িত্ব অর্পণের পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন। একইসঙ্গে সরকারের অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখতে হবে।
বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, নবনিযুক্ত গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা থেকে সরে এসে গভর্নরের দায়িত্ব নিয়েছেন। গভর্নরের মূল উদ্দেশ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, উচ্চ সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা।
আরিফ হোসেন আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের সুশাসন প্রতিষ্ঠা অব্যাহত থাকবে। প্রাইস স্ট্যাবল রেখে কীভাবে সুদের হার শিথিল করা যায়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন গভর্নর। গত দেড় বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা, প্রণোদনা এবং ব্যাংকিং খাতে সমন্বয় জোরদারের নির্দেশনা দিয়েছেন গভর্নর। এর মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব হবে বলে আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি জানান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা হবে অগ্রাধিকার। একইসঙ্গে বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে এমন উচ্চ সুদের হার পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন গভর্নর।
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন গভর্নর। দপ্তরগুলো সমন্বয়হীনতার কারণে সরকার যেন কোনো চ্যালেঞ্জে না পড়ে, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়েও কথা হয়েছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর সম্পর্কে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, নতুন গভর্নরের কাছে তাদের প্রধান প্রত্যাশা হলো ব্যাংক খাতে যেন আর কোনোভাবেই দুর্নীতি বা লুটপাটের সুযোগ তৈরি না হয়। একইসঙ্গে তিনি ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, খেলাপি ঋণ হ্রাস এবং সুদের হার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, নতুন গভর্নরকে যে কোনো ধরনের চাপ উপেক্ষা করে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও এটিকে অস্বাভাবিক বলা যাবে না, বরং এটি একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে সংগঠনটি খুশি না অসন্তুষ্ট, তা এখনই বলার সময় হয়নি; গভর্নরের কাজের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত তাদের মূল্যায়নের ভিত্তি হবে।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভুঁইয়া বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের আবাসন খাত স্থবির অবস্থায় রয়েছে। তাই নতুন গভর্নরের কাছে তাদের আশা, এ খাতে গতি আনতে তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। বিশেষ করে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংকিং জটিলতা নিরসন এবং কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি আবাসন ঋণের সুবিধা চালুর বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
কেকে/এসএ