পবিত্র রমজান উপলক্ষে মৌসুম শুরুর আগেই কিশোরগঞ্জে বাজারে রসালো ফল তরমুজে সয়লাব হয়ে গেছে। রমজানে রসালো ফলটির চাহিদা ও দাম বেশি থাকায় আড়তে অপরিপক্ব তরমুজ সরবরাহ করছেন আড়তদাররা। কম দামে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষকদের কাছ থেকে সংগৃহীত এসব অপরিপক্ব তরমুজে ব্যবসায়ীরা লাভ গুনলেও চড়া দামে কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা।
জানা গেছে, বিভিন্ন জেলা থেকে কিশোরগঞ্জ জেলায় আসা তরমুজ দিয়ে জেলার চাহিদা পুরুণ করেন ব্যবসায়ীরা। গ্রীষ্মের রসালো ফল তরমুজ আমদানি নির্ভর ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন সাধারণ ক্রেতারা। অন্যান্য সময় পিস হিসেবে তরমুজ বিক্রি হলেও গেল কয়েক বছর রমজান থেকে কেজি দরে তরমুজ বিক্রি শুরু হয়। চলতি রমজানের শুরু থেকেই চড়া দামে কেজি ওজনে তরমুজ বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। একদিকে যেমন চড়া দাম অন্যদিকে অপরিপক্ক তরমুজ বাজারে আসায় ক্রেতাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অনিহা।
সরেজমিনে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের স্টেশন রোড ফলের আড়ত ঘুরে দেখা যায়, আড়তে তরমুজে সয়লাব। বেশিরভাগই অপরিপক্ক। প্রতিটি তরমুজের ওজন ৪ থেকে ৬ কেজি পর্যন্ত। প্রতি কেজি দাম চাওয়া হচ্ছে ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকায়। সেই হিসেবে মাঝারি সাইজের একটি তরমুজের দাম পড়ে যাচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। আবার পিস হিসেবে নিতে গেলে দাম চাওয়া হচ্ছে আকাশ ছোঁয়া। তাতে ‘স্বাদ নিতে’ বাধ্য হয়ে ক্রেতারা কেজি হিসেবেই তরমুজ কিনছেন।
এদিকে সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, তরমুজের দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় তরমুজ কিনতে পারছেন না। তারা কেজি দরে তরমুজ বিক্রি বন্ধের বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। পিস হিসেবে তরমুজ কিনতে চান তারা।
আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিভিন্ন জেলা থেকে আসা তরমুজ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তবে এখনও মৌসুম পুরোপুরি শুরু না হওয়ায় সব তরমুজ আসছে না। রমজান মাসে চাহিদা বেশি থাকায় এসব অপরিপক্ক তরমুজগুলোয় তাদের বাধ্য হয়ে কিনতে হচ্ছে। এই জন্য দামও বেশি। কিছুদিন পর একযোগে তরমুজ আসতে শুরু হলে দাম এমনেই কমে যাবে।
রোজায় তরমুজের চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী হবে এমনটি আঁচ করতে পেরে আড়তে তরমুজ তোলেন আড়তদাররা। পটুয়াখালী, খুলনা ও সিলেট থেকে আড়তে তরমুজ নিয়ে আসেন তারা। নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশনের বিনিময়ে আড়তদাররা এসব তরমুজ পিস হিসেব খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। এক্ষেত্রে একদম ছোট আকৃতির ১০০ পিস তরমুজ ১২ হাজার টাকা বিক্রি করা হয়। এসব তরমুজের একেকটির ওজন তিন কেজির ওপর। মাঝারি আকৃতির তরমুজের ১০০টির দাম ২৫-৩০ হাজার। এগুলোর প্রতিটির ওজন ৬-৭ কেজি।
কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত ডিসেম্বর মাসে তরমুজের আবাদ শুরু হয়। মে মাসজুড়ে মাঠে তরমুজ থাকে। মে মাস হলো ভরা মৌসুম। পরিপক্ক তরমুজ উঠতে উঠতে চৈত্র মাস বা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ হয়। কিন্তু চাষিরা দামের কারণে আগেভাগেই অপরিপক্ক তরমুজ তুলে বেশি লাভের আশায় বিক্রি শুরু করে দিয়েছে।
তরমুজ কিনতে আসা ফরিদ নামের এক ক্রেতা বলেন, রোজা বলেই বাজারে তরমুজ কিনতে আসলাম। তবে বিক্রেতারা দাম বেশি চাচ্ছেন। তাছাড়া তরমুজগুলো অপরিপক্ক। বেশি বড় হয়নি। প্রতি কেজি তরমুজ ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দাম চাওয়া হচ্ছে। কেজি দরে একটি তরমুজ কিনতে গেলে ৪০০-৫০০ টাকা হয়ে যাচ্ছে। পিস হিসেবে কিনতে গেলে তখন কেজি দরের চেয়ে বেশি দাম হাকানো হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে কেজি দরেই কিনতে হচ্ছে তরমুজ। আসলে বাজারে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে। সব দোকানেই একই দাম। যদি দামটা ৫০-৬০ টাকা কেজি হতো তাহলে আমাদের মতো ক্রেতাদের সুবিধা হতো।
সালমা বেগম নামের আর এক ক্রেতা বলেন, ১২০ টাকা কেজি দরে ৪ কেজি ওজনের একটি তরমুজ কিনেছি। দামটা আগের তুলনায় অনেক বেশি নিয়েছে। দোকানদার একটু কমও রাখল না। আমার বাচ্চারা বায়না ধরেছে তরমুজ খাবে কিছু করার নেই। যত দামই হোক কিনতে হয়েছে। রমজানে অনেক দেশে জিনিসপত্রের দাম কমে আর আমাদের দেশে বাড়ে, এটা খুবই দুঃখজনক। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে কিন্তু কমে না। বাজার নিয়ন্ত্রণে নেই। সরকারের উচিত বাজার নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের মতো মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের কষ্ট কেউ বোঝে না।
রাকিব হোসেন নামের এক ক্রেতা বলেন, ১০০ টাকা কেজি দরে ৩০০ টাকা দিয়ে একটা তরমুজ কিনেছিলাম। বাসায় এনে ইফতারের আগে কেটে দেখি অপরিপক্ক। তরমুজের ভিতরে সাদা, স্বাদও ভালো না। বাজারে অপরিপক্ক তরমুজ বাড়তি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে আমার মতো অনেকেই প্রতারিত হচ্ছেন। তবে সরকার যদি এদিকে একটু নজর দিতো তাহলে আমরা কিছু অসাধু ব্যবসায়ীদের হাত থেকে রক্ষা পেতাম।
পুরানথানা এলাকায় মামুন মিয়া এক খুচরা তরমুজ বিক্রেতা বলেন, গত বছর এ সময় ১০০ তরমুজ ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা করে আড়ৎ থেকে কেনা গেছে। আর এবার দ্বিগুণ দাম। তারপরও রোজার আগের দিন পাওয়া যায়নি। সে কারণে অস্বাভাবিক দামে কেনাবেচা হচ্ছে। চলতি বছরে রোজার আগে প্রতি ১০০ তরমুজ কিনতে হয়েছে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায়। তাই খুচরায় ১০০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন।
কাঁচারি বাজারের ফল ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম রতন বলেন, স্টেশন রোড ফলের আড়ত থেকে পাইকারি দরে তরমুজ কিনি। কিন্তু এবার বেশি দামে তরমুজ কিনতে হচ্ছে। অন্যান্য বছরে এ সময়ে ৪০-৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও এ বছর বেশিদামে কিনতে হয়েছে। তাই দামও বেশি চাওয়া হচ্ছে। দাম শুনেই ক্রেতারা চলে যাচ্ছেন। বাজারে বাড়তি দামে একেবারে ক্রেতা নেই তরমুজের।’
স্টেশন রোডের সিদ্দিক ফল ভান্ডারের আড়তদার মো. আবু বক্কার সিদ্দিক বলেন, ফলের আড়ত এখনো তরমুজের মৌসুম আসেনি। রোজার কারণে চাষিরা আগে ভাগে তরমুজ তুলে ফেলছে। এখন যে তরমুজগুলো আসছে, তা আকারে ছোট, ৩ থেকে সাড়ে ৩ কেজির মধ্যে বেশি। বড় তরমুজ নেই বললেই চলে। রমজান মাসে চাহিদা বেশি থাকায় এসব অপরিপক্ক তরমুজগুলোয় তাদের বাধ্য হয়ে কিনতে হয়েছে। এই জন্য দামও বেশি। কিছুদিন পর একযোগে তরমুজ আসতে শুরু হলে দাম এমনেই কমে যাবে।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে কথা হলে তিনি খোলা কাগজকে জানান, রমজানের শুরু থেকেই আমরা বাজার মনিটরিং করছি। আমরা যখন বাজার মনিটরিং করেছি তখন তরমুজের বিষয়টিও মাথায় রাখছি। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের পাশাপাশি তরমুজের বাজারেও নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি এবং বিক্রেতাদের সতর্ক করছি। পাশাপাশি ক্রেতাদেরকেও অপরিপক্ক তরমুজ কিনতে নিরুৎসাহিত করছি।
কেকে/ এমএস