মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬,
৩ চৈত্র ১৪৩২
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬
শিরোনাম: আগামী মাসে চালু হচ্ছে কৃষক কার্ড : প্রধানমন্ত্রী      কাউন্টারে ঘরমুখো মানুষের ভিড়, চাপ বেড়েছে দূরপাল্লার বাসে      আল-আকসা খোলা নিয়ে সিদ্ধান্ত জানাল ইসরায়েল      শেকড় ভুলে গেলে ৫ আগস্ট বারবার ফিরে আসবে : সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী      ইউজিসি চেয়ারম্যান ও ৭ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে রদবদল      খাল খনন কর্মসূচিকে আরও প্রসারিত করা হবে : প্রতিমন্ত্রী নুর      স্কুল ভর্তিতে থাকছে না লটারি : শিক্ষামন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
নতুন গভর্নর নিয়োগ : কিছু প্রশ্ন, কিছু পরামর্শ
রেজাউল করিম খোকন
প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ১১:৩৫ এএম আপডেট: ০২.০৩.২০২৬ ১১:৩৯ এএম

২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. আহসান এইচ মনসুর। আইএমএফের অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ এই কর্মকর্তাকে গভর্নর পদে নিয়োগ সব মহলে প্রশংসিত হয়েছিল। ওই সময় বড় বিপর্যয়ের গিরিখাতে অর্থনীতির পতনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। দেশের বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশও এই ১১টি পতনোন্মুখ ব্যাংকের অন্যতম ছিল।

কারণ, এই ব্যাংকসহ দেশের সাতটি ব্যাংকের মালিকানা তুলে দেওয়া হয়েছিল চট্টগ্রামের কুখ্যাত ব্যাংক লুটেরা এস আলমের হাতে। পরবর্তী সময়ে সরকার গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, এস আলম এই সাত ব্যাংক থেকে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে।

পতিত স্বৈরশাসক হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয়েছিল ব্যাংকিং খাত। দেশে ৬১টি ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও হাসিনার খেয়ালখুশি সিদ্ধান্তে তার আত্মীয়স্বজন, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং তার পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া অলিগার্ক ব্যবসায়ী ও ‘রবার ব্যারন’-এ পরিণত হওয়া লুটেরাদের পুঁজি লুণ্ঠনের অবিশ্বাস্য সুযোগ করে দেওয়ার জন্য এতগুলো ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়।

বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিলেন ড. আহসান এইচ মনসুর। তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ করার পর গত দেড় বছরে ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরে এলেও খেলাপি ঋণ সমস্যার কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। বরং এখন আগের মতো খেলাপি লুকিয়ে ফেলার অপতৎপরতা আর না থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত ক্লাসিফায়েড লোনের অনুপাত বাড়তে বাড়তে এখন ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। খেলাপি ঋণের এই ৩৬ শতাংশ অনুপাত শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নয়, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সর্বোচ্চ। আরও গুরুতর হলো, বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের সিংহভাগই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।

এসব সত্ত্বেও ড. আহসান মনসুর গত দেড় বছরে ব্যাংকিং খাতের এই বিপর্যস্ত অবস্থাকে অনেকখানি সফলভাবে সামাল দিতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি, ২৫ ফেব্রুয়ারি ৩৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। ডলারের বাজারদর গত এক বছরের বেশি সময় ধরে ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিপর্যস্ত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকও বিপর্যয় অনেকখানি কাটিয়ে উঠেছে।

দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া পাঁচটি ইসলামি ধারার ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংকও কার্যক্রম শুরু করেছে। ব্যাংকের মোট আমানত আবার ১৮ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। ব্যাংকের ঋণের হারও ১১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে। দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টসের চলতি অ্যাকাউন্টে শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ তিন বছর ধরে সৃষ্টি হওয়া মারাত্মক ঘাটতি অবস্থার পরিবর্তে ২০২৬ সালে আবারও উদ্বৃত্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের বিপজ্জনক ঘাটতি পরিস্থিতির অবসান হয়েছে।

এসব তথ্য-উপাত্ত সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, দেশের আর্থিক খাত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার লুটপাটতন্ত্র কাটিয়ে গত দেড় বছরে আবার স্থিতিশীল অবস্থায় উপনীত হয়েছে। যদিও দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি এখনো খুবই নাজুক অবস্থায় রয়ে গেছে। বৈদেশিক বিনিয়োগে স্থবিরতা গেড়ে বসে রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দায়িত্ব পাওয়া সব নীতিনির্ধারকের মধ্যে সচেতন জনগণের কাছে সবচেয়ে বেশি প্রশংসনীয় হয়ে উঠেছিলেন গভর্নর ড. আহসান মনসুর। দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জনকারী গভর্নর ড. মনসুরকে তার চুক্তির মেয়াদ আরও দুই বছরের বেশি থাকার পরও বিদায় নিতে হলো। তার চেয়েও বড় কথা, তার সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই চুক্তিটি বাতিল করা হয়েছে।

নবনির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার তাদের পছন্দসই ব্যক্তিদের সরকারের বিভিন্ন পদে বসাবে, এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। কিন্তু ড. মনসুরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনীতির বিপর্যয় যেভাবে সফলভাবে মোকাবিলা করেছে, তাকে এমন অপমানজনকভাবে অপসারণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তার সঙ্গে সৌজন্যমূলক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি বাতিল করলে ব্যাপারটি নিন্দনীয় হতো না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী গভর্নর দেশের ক্রান্তিকালীন সময়ে ব্যাংকটির হাল ধরেছিলেন এবং কিছু সমালোচনা থাকলেও মোটের ওপর ভালোই কাজ করছিলেন। কয়েকটি রুগ্ন ব্যাংকের একীভূতকরণের অযৌক্তিক কাজ ছাড়া সামষ্টিক অর্থনীতি তিনি বেশ ভালোই সামাল দেন।

গভর্নর হিসেবে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত মো. মোস্তাকুর রহমান একজন ব্যবসায়ী। একজন ব্যবসায়ীকে প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ পদে বসানো নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। এতে কোনো স্বার্থের সংঘাত ঘটবে কি না, সেই প্রশ্ন অনেকে তুলেছেন। তিনি এর ঊর্ধ্বে উঠে কীভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো চাপমুক্ত হয়নি। এই মুহূর্তে প্রয়োজন সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং স্বচ্ছতা ও দৃঢ় নীতিনিষ্ঠ অবস্থান নেওয়া। নতুন গভর্নর সেই প্রত্যাশা পূরণ করবেন, সেটাই আমাদের চাওয়া।

কিন্তু তার রাজনৈতিক পরিচয় ও আর্থিক বিষয়ের কিছু অনিয়মের যে খবর বাজারে প্রচলিত, তা অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। কারণ, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ও আর্থিক অনিয়ম আর্থিক বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। উপরন্তু তার ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত অসম্ভব কিছু নয়।

এতৎসত্ত্বেও তার নিয়োগ যে বাজারমুখী সিদ্ধান্ত নয়, বরং প্রকারান্তরে তা যে রাজনৈতিক—তা অনুধাবন করা কষ্টসাধ্য নয়। অর্থনীতিতে যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত সুদের হার বৃদ্ধির মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা এবং একই সঙ্গে সরকারকে সঠিক রাজস্ব নীতি প্রণয়নের পরামর্শ দেওয়া।

রাজস্ব নীতির মাধ্যমে অল্প সময়ে ভোক্তার চাহিদা বৃদ্ধি করা যেমন সহজ, তেমনি বিভিন্ন প্রণোদনার মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি সম্ভব। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব নীতির যুগপৎ ব্যবহারের মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি টেকসই ও নিরাপদ।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির অর্থনীতিতে মুদ্রানীতির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করা অজ্ঞতা ও অনভিজ্ঞতার পরিচায়ক অথবা রাজনৈতিক সুবিধা প্রদানের কৌশল। যদিও অর্থনীতিতে সরল সমীকরণ বলে কিছু নেই—অর্থাৎ প্রতিটি নীতির ভালো বা মন্দ দিক থাকতে পারে—তথাপি সময় ও পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে কখনো কখনো কোনো কোনো নীতি অপর নীতির থেকে প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর হয়ে ওঠে।

সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিথিল মুদ্রানীতি বাংলাদেশের জন্য মোটেই উপযোগী নয়। এই বাস্তবতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্তাব্যক্তিদের অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে। আর যদি তা তারা অনুধাবন করতে না চান, তবে তাদের কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন আসতেই পারে, যা এই মুহূর্তে আমাদের কারও কাম্য নয়।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে আকস্মিক পরিবর্তন দেশের আর্থিক খাত নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিল করে মো. মোস্তাকুর রহমানকে চার বছরের জন্য গভর্নর করা হয়েছে। যে পদ্ধতিতে বা যে প্রক্রিয়ায় আহসান এইচ মনসুরকে সরানো হলো, তা প্রাতিষ্ঠানিক সৌজন্যের সঙ্গে কতটা সংগতিপূর্ণ—তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

আহসান এইচ মনসুরের চুক্তির মেয়াদ ছিল ২০২৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত। সেই চুক্তির অবশিষ্ট সময় এক প্রজ্ঞাপনে বাতিল করা হয়েছে। একই দিন এই প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘পদত্যাগ করতে আমার দুই সেকেন্ড সময় লাগবে।’ কিন্তু বাস্তবে তাকে পদত্যাগের সুযোগ না দিয়ে নিয়োগ বাতিলের প্রশাসনিক পথই বেছে নেওয়া হয়েছে। এরপরই নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগের খবর ছড়িয়ে পড়ে।

ঘटनাপ্রবাহের এই দ্রুততায় স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা যায় যে, সিদ্ধান্ত নিয়েই সরকার কাজটি করেছে। একটি নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে তাদের কাজের সুবিধা এবং নিজেদের কর্মসূচি ও নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো ঢেলে সাজাতে পারে। সেই বিবেচনায় সরকার আগের গভর্নরকে সসম্মানে বিদায় দিয়ে একজন নতুন গভর্নর নিয়োগের পথ ধরতে পারত।

কিন্তু এটা দুঃখজনক যে, আগের গভর্নরের বিদায়টি ভালোভাবে হয়নি। ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিক্ষোভের মুখে গভর্নর ব্যাংক ছাড়েন, যাকে মব সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হিসেবেই বিবেচনা করতে হচ্ছে। এরপর তার নিয়োগ বাতিল ও নতুন গভর্নরের নাম ঘোষণা করা হয়। এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতিটি কি এড়ানো যেত না?

এটা আমাদের মনে রাখতে হবে, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী এক কঠিন পরিস্থিতিতে আহসান এইচ মনসুরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিধ্বস্ত ও বিশৃঙ্খল আর্থিক খাতকে শৃঙ্খলায় আনার কঠিন চ্যালেঞ্জ তাকে নিতে হয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কিছু কঠিন, কিন্তু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

তিনি ডলারের বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কার্যকর করেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে সক্ষম হন এবং খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ্যে আনেন। তার এসব পদক্ষেপে নানা মহলে অসন্তোষ ছিল। ব্যাংক খাতের শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলোর বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকিও তিনি নিয়েছিলেন। তার সময়ে প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়, দুর্বল ব্যাংক একীভূত করা হয় এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া এগোয়।

আহসান এইচ মনসুরের এসব উদ্যোগ শেষ হয়নি, কিন্তু দিকনির্দেশনা স্পষ্ট ছিল। প্রশ্ন উঠেছে, কোনো পক্ষ কি তার সংস্কার উদ্যোগের কারণে ক্ষুব্ধ ছিল? তা না হলে বিদায়ী গভর্নরের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের একশ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অসদাচরণ ও অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণ কী? গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী একটি গণতান্ত্রিক যাত্রার শুরুতে অন্তত এমন ঘটনা ঘটবে না—এটাই প্রত্যাশিত ছিল।

বর্তমান সরকার গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি দুর্বল পদক্ষেপ নিয়েছে। একই সঙ্গে প্রক্রিয়াটি অস্বচ্ছ ছিল। সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় গভর্নর নিয়োগ দিতে চাইলে এর চেয়ে আরও ভালো নিয়োগ দিতে পারত। নবনিযুক্ত গভর্নরের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। সরকার এ ধরনের সমালোচনাগুলো এড়িয়ে আরও ভালো নিয়োগ দিতেই পারত এবং সে ধরনের লোক সরকারের হাতে ছিল বলে আমার কাছে মনে হয়।

বাংলাদেশে গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম বা বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নেই। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার উদাহরণ টেনে বলা যায়, ভারতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায় আলাদা করে একটি কমিটি রয়েছে। কমিটিতে দেশটির অর্থসচিব, সাবেক গভর্নর ও অন্যান্য ব্যক্তিরা থাকেন। তারা সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা করেন এবং পরে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তা চূড়ান্ত করেন।

সেখানে আবেদনের ক্ষেত্রে শর্তের মধ্যে রয়েছে—গভর্নরকে অন্তত ২০ বছর এ খাতে অভিজ্ঞতা ও প্রতিষ্ঠান চালানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তিনি প্রাজ্ঞ হবেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তার মাস্টার্স বা পিএইচডি থাকতে পারে। ভারতে প্রতিষ্ঠান চালানোর অভিজ্ঞতার খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে এ ধরনের আইনবদ্ধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে অর্থনৈতিক বিষয়গুলো খুব বেশি অগ্রাধিকার পায়নি। আর্থিক খাতের যে সংস্কারগুলো হয়েছে, তা অনেকটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল। এসব সংস্কারের বিরুদ্ধে একটি স্বার্থগোষ্ঠী সব সময় কাজ করেছে।

তা সত্ত্বেও সাবেক গভর্নর (আহসান এইচ মনসুর) নিজস্ব দক্ষতায় কাজ করেছেন এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে সফলও হয়েছেন। আমরা মনে করি, সংস্কার কাজগুলো অব্যাহত রাখতে তার মতো একজন ব্যক্তিকে সরকার রেখে দিতে পারত। তাতে আর্থিক খাতের জন্য ভালো হতো।

আমরা এটাও প্রত্যাশা করব, প্রধানমন্ত্রী যেন সাবেক গভর্নরকে তার দপ্তরে আমন্ত্রণ জানান এবং তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানান। যেহেতু জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে তিনি এবং তার রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন হয়েছেন, এখন খেয়ালখুশিমতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রকারান্তরে তার জন্য বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে।

অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে—তা বলাই বাহুল্য। আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের ক্ষেত্রে যে সব প্রতিষ্ঠান কাজ করে, তারা বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি। এখানে দেশের আর্থিক খাতের ইমেজের প্রশ্ন জড়িত।

অতএব, সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে এ ব্যাপারটিকে ছেলেখেলা না ভেবে গুরুত্বসহকারে বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছি।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার

কেকে/এলএ
আরও সংবাদ   বিষয়:  গভর্নর   নিয়োগ  
মতামত লিখুন:

সর্বশেষ সংবাদ

‘শপিং, গ্রামে ফেরার তাড়া যেন রমজানের শেষ মুহূর্তের তাৎপর্য ভুলিয়ে না দেয়’
আমরা উন্নতি করতে চাই, তবে প্রকৃতি ধ্বংস করে নয় : পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী
গোপালপুরে সৌদি আরবের উপহার খেজুর বিতরণ
‘কিশোরগঞ্জ ভলান্টিয়ার্স’-এর ‘দুই টাকায় ইফতার’
বুড়িচংয়ে সারের অতিরিক্ত মূল্য আদায়, ন্যাশনাল ট্রেডার্সকে জরিমানা

সর্বাধিক পঠিত

চবির নতুন উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান
মৌলভীবাজারে ছোট ভাইকে হত্যার ঘটনায় বড় ভাই গ্রেপ্তার
মহম্মদপুরে ব্যবসায়ীর ঘরে ভিজিএফের চাল, সিলগালা ও জরিমানা
মৌলভীবাজারে কাটাগাং খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন
শ্বশুরের নির্দেশে ২৮ বছর ধরে ঈদ উপহার বিতরণ করছেন বিএনপি নেত্রী

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close