রোববার, ২১ জুন ২০২৬,
৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ২১ জুন ২০২৬
শিরোনাম: ২০৩০ লক্ষ্য সামনে রেখে আইসিটি খাতে কৌশলগত সংস্কারের দাবি      শ্রমবাজার ও তিস্তায় নতুনের হাতছানি      সম্প্রীতি নষ্টের পাঁয়তারা      প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া যাচ্ছেন আজ       বাংলাদেশকে ফুটবল বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখতে হবে : প্রধানমন্ত্রী      বগুড়ার সেই তিন ইউনিয়নের নাম পরিবর্তন করতে ডিসিকে চিঠি      ফের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করলো ইরান      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
আমার বাবা, আমার প্রথম শিক্ষক
মীমরাজ হোসেন
প্রকাশ: রোববার, ২১ জুন, ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বছরে একটি দিন আসে, যেদিন বাবাদের নিয়ে আলাদা করে কথা বলা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তখন বাবাকে নিয়ে ছবি, স্মৃতি, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার কথায় ভরে ওঠে চারপাশ। কিন্তু আমার কাছে বাবা শুধু একটি সম্পর্কের নাম নয়, তিনি আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক। যিনি বইয়ের অক্ষরের আগে আমাকে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন, অন্যের হক নষ্ট না করতে শিখিয়েছেন, কষ্টের মধ্যেও মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখিয়েছেন।

আমি একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আমাদের পরিবারে আমরা ছয় ভাইবোন। এত বড় সংসার চালানো, সবার খাওয়া-দাওয়া, পড়ালেখা, চিকিৎসা, ঈদ-পার্বণের খরচ সবকিছুর ভার ছিল বাবার কাঁধে। কিন্তু ছোটবেলায় কখনো বুঝিনি, এই দায়িত্ব কতটা কঠিন। কারণ বাবা তার কষ্ট আমাদের বুঝতে দেননি। সংসারে টানাপোড়েন থাকলেও তিনি তা আড়াল করে রেখেছেন, যেন সন্তানদের চোখে অভাব নয়, স্বপ্নই বড় হয়ে ওঠে।

আজও বাবা জীবিত। বয়স বেড়েছে, শরীরও আগের মতো নেই। তারপরও সংসারের জন্য তিনি ছোট্ট পরিসরে আতর-টুপি ব্যবসা করেন। হয়তো এই ব্যবসা খুব বড় নয়, আয়ও সীমিত। কিন্তু পরিবারের জন্য কিছু করে যাওয়ার যে ইচ্ছা, সেটিই তাকে আমার কাছে বড় করে তোলে। একজন বাবা কতটা দায়িত্বশীল হলে জীবনের এই পর্যায়েও সংসারের হাল ছাড়েন না তা নিজের বাবাকে না দেখলে হয়তো এত গভীরভাবে বোঝা যেত না।

ছোটবেলায় বাবাকে শুধু একজন অভিভাবক হিসেবে দেখেছি। তিনি সংসার চালাতেন, বাজার করতেন, আমাদের পড়ালেখার খোঁজ নিতেন, ভুল করলে শাসন করতেন। কিন্তু বড় হওয়ার পর বুঝেছি, তার প্রতিটি কাজের ভেতরে ছিল শিক্ষা। এমন শিক্ষা, যা বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না, কিন্তু জীবন গড়ার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়।

আমার শৈশবের একটি ছোট্ট ঘটনা আজও খুব স্পষ্ট মনে আছে। তখন আমার বয়স চার কিংবা পাঁচ বছর। একদিন বাবার সঙ্গে বাজারে গিয়েছিলাম। তিনি তরকারি কিনছিলেন। আমি পাশে দাঁড়িয়ে বাজারের ভিড় আর দোকানের জিনিসপত্র কৌতূহল নিয়ে দেখছিলাম। এমন সময় দেখি, একটি তরকারির দোকানের সামনে একটি আলু নিচে পড়ে আছে। শিশুমনে মনে হয়েছিল, এটি তো পড়ে আছে, ব্যাগে রাখলে ক্ষতি কী? আমি আলুটি তুলে বাজারের ব্যাগে রাখতে চেয়েছিলাম। ঠিক তখনই বাবা আমাকে থামিয়ে দিলেন। শান্ত গলায় বললেন, ‘এটা আমাদের না, এটা দোকানদারের। তার কাছে রেখে দাও।’

সেদিন হয়তো কথাটির গভীরতা বুঝিনি। কিন্তু আজ বুঝি, বাবা আমাকে শুধু একটি আলু ফেরত দিতে বলেননি, তিনি আমাকে জীবনের অন্যতম বড় শিক্ষা দিয়েছিলেন। শিখিয়েছিলেন, অন্যের জিনিস যত ছোটই হোক, তা নিজের করে নেওয়া যায় না। মানুষের হক নষ্ট করা যাবে না। সততা শুধু বড় বড় কথায় নয়, ছোট ছোট আচরণের মধ্যেই তৈরি হয়। সেই ছোট্ট ঘটনাই আমার জীবনে সততার প্রথম পাঠ হয়ে আছে।

বাবার কাছ থেকে পাওয়া এই শিক্ষার মূল্য আমি আরও বেশি বুঝেছি বড় হওয়ার পর। এখন আমি সাংবাদিকতা করি। সমাজের নানা অসঙ্গতি, মানুষের জীবনসংগ্রাম, অন্যায়-অবিচার এসব নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বারবার মনে হয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর শক্তি তো হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর পেছনে আছে শৈশবের শিক্ষা, বাবার হাতে গড়ে ওঠা মূল্যবোধ।

এই দেশের অসংখ্য মধ্যবিত্ত বাবার মতো আমার বাবাও ছিলেন নীরব এক যোদ্ধা। তারা খুব বেশি কথা বলেন না, খুব বেশি আবেগও দেখান না। কিন্তু সংসারের সবচেয়ে বড় দায় নিজের কাঁধে তুলে নেন। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে নিজের চাওয়া-পাওয়া সরিয়ে রাখেন। হয়তো নতুন জামা কেনার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সেটি বাদ দিয়ে সন্তানের বই কিনেছেন। হয়তো নিজের জন্য বিশ্রাম দরকার ছিল, কিন্তু সংসারের চিন্তায় সেটিও আর হয়ে ওঠেনি। এই ত্যাগগুলো সন্তানরা ছোটবেলায় বুঝতে পারে না, বড় হয়ে বুঝতে শেখে।

আজ বাবা দিবসে বাবাকে নতুন করে ভাবতে গিয়ে মনে হচ্ছে, একজন বাবার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো এটিই তিনি পরিবারকে আগলে রাখেন, কিন্তু নিজের কষ্টের কথা খুব কম বলেন। তিনি অভাবের দেয়াল নিজের বুক দিয়ে ঠেকিয়ে রাখেন, যেন সন্তানের সামনে তা ভেঙে না পড়ে। তিনি হয়তো মুখে ভালোবাসা বলেন না, কিন্তু প্রতিটি দায়িত্ব পালন করে, প্রতিটি ত্যাগের ভেতর দিয়ে সেই ভালোবাসার প্রমাণ দিয়ে যান।

আমার বাবা আমার প্রথম শিক্ষক কারণ তিনি আমাকে শুধু লেখাপড়া শেখাননি, মানুষ হওয়ার পথ দেখিয়েছেন। সততা শিখিয়েছেন, আত্মমর্যাদা শিখিয়েছেন, অন্যের প্রাপ্যকে সম্মান করতে শিখিয়েছেন। আজ আমি যে কলম হাতে নিয়ে সমাজের কথা লিখতে চাই, সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে চাই, তার ভেতরেও বাবার সেই শিক্ষার ছাপ স্পষ্টভাবে রয়ে গেছে।

বাবা দিবস হয়তো ক্যালেন্ডারের একটি দিন। কিন্তু বাবার ঋণ, বাবার ত্যাগ, বাবার শিক্ষা এসব কোনো একদিনে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রতিদিনের জীবনেই তার উপস্থিতি থাকে। আজ বাবা দিবসে তাই বাবাকে শুধু শুভেচ্ছা জানানো নয়, কৃতজ্ঞতাও জানাতে চাই।

বলতে চাই বাবা, ছোটবেলায় তোমার কষ্ট বুঝিনি, তোমার ত্যাগের গভীরতাও বুঝিনি। কিন্তু আজ বুঝি, তুমি শুধু আমার বাবা নও, তুমি আমার প্রথম শিক্ষক, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা।

পৃথিবীর সব বাবার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা। বিশেষ করে সেইসব মধ্যবিত্ত বাবাদের প্রতি, যারা নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েন, অভাবকে আড়াল করেন, আর শেষ বয়সেও সংসারের জন্য ছোট্ট কোনো কাজকে ছোট মনে করেন না। তারা হয়তো আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন না, কিন্তু প্রতিটি সন্তানের জীবনে তারা সবচেয়ে বড় নায়ক হয়ে থাকেন।
শুভ বাবা দিবস।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close