সীমান্তে যখন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে ওঠে মানুষ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা, তখন বোঝা যায়, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে আছে। গত শুক্র ও শনিবার মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টায় ফেনী, দিনাজপুর, ঝিনাইদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কুষ্টিয়া- এই পাঁচ সীমান্ত দিয়ে অন্তত আটত্রিশ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ।
সৌভাগ্যক্রমে প্রতিটি প্রচেষ্টাই প্রতিহত করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। কিন্তু এ ঘটনাপ্রবাহ আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, সীমান্তে যা কিছু ঘটছে, তা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং একটি ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত তৎপরতার অংশ। কয়েক মাস আগেও একই ধরনের পুশইনের ঘটনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। কিছু দিন এ তৎপরতা বন্ধ থাকার পর তা আবার শুরু হওয়া প্রমাণ করে, সীমান্ত সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি; বরং তা সাময়িকভাবে চাপা পড়েছিল মাত্র।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নদীপথে সাঁতরে আটজনকে ঢোকানোর চেষ্টা, দিনাজপুরের বিরামপুরে ভোররাতে নয় নারীকে ঠেলে দেওয়ার প্রয়াস, কিংবা ঝিনাইদহের মহেশপুরে ছয়জনকে শূন্যরেখায় আটকে রাখা-প্রতিটি ঘটনাই দেখায়, এ তৎপরতা এলোমেলো নয়, বরং সুপরিকল্পিত ও একাধিক বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগে পরিচালিত। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের পর্যবেক্ষণ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
তারা বলছেন, বাংলাদেশের প্রতি ভারতের নীতি স্পষ্টতই দ্বিমুখী। একদিকে কূটনৈতিক পর্যায়ে বন্ধুত্বের বার্তা, প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি; অন্যদিকে সীমান্তে পুশইন, বিক্ষিপ্ত হত্যাকাণ্ড ও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের মতো একতরফা তৎপরতা। এ দ্বৈরথ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তা যেন নতুন মাত্রা পেয়েছে। বাংলাদেশ এখন আর একরৈখিকভাবে কোনো একটি শক্তির ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্র নয়, এটি এত দিনে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে।
বহুমুখী বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ যখন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, তখন সীমান্তে এ ধরনের আগ্রাসী আচরণ ভারতের জন্যও কৌশলগতভাবে অসুবিধাজনক হয়ে উঠতে বাধ্য। এখানে বিজিবির পেশাদারত্বের কথা না বললেই। প্রতিটি ব্যর্থ পুশইনের চেষ্টা আসলে পরবর্তী চেষ্টার পূর্বাভাস মাত্র, যতক্ষণ না কূটনৈতিক পর্যায়ে এর গোড়ায় হাত দেওয়া হয়।
প্রশ্ন হলো, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে বলপ্রয়োগ করে মানুষ ঢুকিয়ে দেওয়ার এ প্রবণতাকে আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মানদণ্ডে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও চুক্তি থাকা সত্ত্বেও যদি একতরফাভাবে পুশইনের চেষ্টা চলতেই থাকে, তাহলে সেই কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। শুধু ঘটনার পর প্রতিবাদ জানিয়ে দায় সারলে চলবে না; বাংলাদেশকে এখন থেকেই একটি ধারাবাহিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কূটনৈতিক কৌশল নিতে হবে, যাতে এই তৎপরতা শুধু প্রতিহতই না হয়, বরং পুনরাবৃত্তি বন্ধ হয়। এ বাস্তবতায় আমরা মনে করি, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
প্রতিটি পুশইনচেষ্টার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদলিপি অবিলম্বে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হবে এবং তার জবাব প্রকাশ্যে দাবি করতে হবে। সীমান্ত হত্যা ও পুশইনের ঘটনাগুলো নিয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে একটি সমন্বিত নথিভুক্তকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিজিবি-বিএসএফ পর্যায়ের নিয়মিত পতাকা বৈঠকের পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক চ্যানেলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তির পুনর্বিবেচনা ও তার লঙ্ঘনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদানের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও বিজিবির মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে। সীমান্তে বিজিবির তৎপরতা আমাদের আস্থা জোগায়, কিন্তু আস্থার এ জায়গাটি যেন আত্মতুষ্টিতে রূপ না নেয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক টেকসই হয় পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে, একতরফা সহনশীলতার ওপর নয়। ভারতকে বুঝতে হবে, বন্ধুত্বের বার্তা আর সীমান্তে আগ্রাসন-এ দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় সম্ভব নয়।
কেকে/এমএ