রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬,
১ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশ বিমানের উড়োজাহাজে কারিগরি ত্রুটি, আটকা ১২৭ যাত্রী      বংশালে হেলমেটের গোডাউনে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের সাত ইউনিট      ডেঙ্গুতে আরও তিনজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৮০৫      ইউনূসের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে নোটিশ      ফের মেসির পেনাল্টি মিস, হারল মায়ামি      সব দিক দিয়েই অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে বাংলাদেশ ভালো খেলেছে : কামিন্স      জ্বালানি সংকট পুরোপুরি কাটাতে কমপক্ষে দুই বছর লাগবে : অর্থমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
আধুনিক শিক্ষায় আদিম পদ্ধতির প্রয়োগ কেন
অলোক আচার্য
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৩:৩১ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

সাম্প্রতিক সময়গুলোতে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরের বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে প্রহারের ঘটনা এবং এ নিয়ে যেসব অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিয়েছে তা রীতিমতো দুশ্চিন্তার। শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক সম্পর্ক অনেকটাই নিবিড় এবং পারস্পরিক আস্থাপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থেই এটা প্রয়োজন। 

অথচ, প্রায়ই দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিভাবকের সঙ্গে বাগবিতন্ডা সেই সুষ্ঠু পরিবেশের পথে বাধা তৈরি করছে। পড়ালেখা অথবা দুষ্টুমি যে কারণেই হোক শিক্ষক হাত বা বেত দিয়ে শারীরিকভাগে আঘাত করছেন। যদিও এটি আইনের দিক থেকে নিষিদ্ধ। তবে বহু শতাব্দী পুরোনো একটি পদ্ধতি যা মন থেকে পুরোপুরি দূর করা যায়নি। খুব অল্প সময় তা সম্ভবও নয়। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণামূলক সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে সক্ষম হলে এবং মন থেকে গ্রহণ করলেই শারীরিক শাস্তির বিষয়টি এক সময় বিলুপ্ত হবে। 

একজন প্রধান শিক্ষককে অফিসকক্ষে ঢুকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়েছে। শিক্ষককে সন্তানকে শাসনের জন্য হুমকিধমকি দেওয়া হচ্ছে, যা রীতিমতো অপমানজনক। শিক্ষকতা পেশাটাই ঝুঁকিতে রয়েছে। শিক্ষকের সম্মান ধুলোয় মিশছে এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে। আইনে নিষেধ থাকা সত্ত্বেও কেন এটি হচ্ছে অথবা সামান্য শাসনেই কেন অভিভাবকমহল অসন্তোষ প্রকাশ করছেন, তা নিয়ে আলোচনা করা দরকার। অথবা শাসনের বিকল্প পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না সেটিও পর্যবেক্ষণ করা উচিত। এ নিয়ে একটি পরিসংখ্যান রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সি ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু শারীরিক শাস্তির শিকার হয়ে থাকে। ৫ থেকে ৯ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে এ হার ৮৯ দশমিক ৮ শতাংশ। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাস্তি নিষিদ্ধ করতে ২০১১ সালে একটি পরিপত্র জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তারপরও শিশুরা শিক্ষকদের মারধর ও অপমানের শিকার হচ্ছে। বাড়ি, প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রেও শাস্তি নামে শিশুদের ওপর চলে সহিংসতা। ৩০ এপ্রিল পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিশু শাস্তি বিলোপ দিবস আমাদের দেশেও পালিত হয়। আশ্চর্য বিষয় হলো, খুব শিক্ষিত একটি শ্রেণির হাতেই শিশু শাস্তি পাচ্ছে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘করপোরাল পানিশমেন্ট অব চিলড্রেন : দ্য পাবলিক হেলথ ইম্প্যাক্ট (২০২৫)’ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ১৮ বছরের নিচের অর্ধেকের বেশি শিশু প্রতিবছর শারীরিক শাস্তির শিকার হয়। এদের মধ্যে ১৭ শতাংশ শিশু গুরুতর শাস্তির মুখোমুখি হয়। যেমন মাথা, মুখ বা কানে আঘাত করা, অথবা জোরে ও বারবার মারধর করা। ৪৯টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা শাস্তির শিকার হয় তাদের বিকাশের সম্ভাবনা সমবয়সিদের তুলনায় ২৪ শতাংশ কমে যায়। শাস্তি শরীরে হরমোনজনিত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতায় পরিবর্তন আনতে পারে। এর ফলে আত্মমর্যাদা হ্রাস পায় এবং উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং পরিণত বয়সে অসামাজিক আচরণ বা মাদকাসক্তির ঝুঁকি বেড়ে যায়।

স্কুলভীতি বা স্কুলের প্রতি অনীহা জন্মানোর একটি বড় কারণ হলো-সেই শিক্ষার্থীকে শারীরিক বা মানসিকভাবে শাস্তি দেওয়া। অতীতে এ ধরনের শাস্তি ব্যবস্থা বহাল তবিয়তে চালু থাকলে আধুনিককালে মনোবিশেষজ্ঞরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাস্তি কোনো কার্যকর পদ্ধতি নয় বরং তা শিশুর মনে স্থায়ী ভীতি বা বিরক্তি জন্মানোর কারণ। ফলে এখন এটি নিষিদ্ধ। এটা সত্ত্বেও দেখা যায়, প্রায়শই দেশে শিক্ষার্থীকে শারীরিক শাস্তির খবর পাওয়া যায় এবং মাঝে মধ্যে তা শিউরে ওঠার মতো। 

একটি শিশু সাধারণত চার বছর হওয়ার পরই তাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। শিশু পরিবারে বেড়ে ওঠার পর্যায়ে সাধারণত তিন বছর বয়স থেকেই শেখার প্রক্রিয়া শুরু হয়। মা-বাবার কাছ থেকে আমাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পরিচিতি এবং পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে পরিচিত হয় এবং এসবের ভাষান্তর করতে শেখে। এসব জ্ঞান লাভের একপর্যায়ে শিশুকে বিদ্যালয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। একটি নতুন পরিবেশে নতু মুখ এসব কিছু থেকে শিশু স্বাভাবিকভাবেই ভীত হয়ে পরে। তাকে মা-বাবা এবং শিক্ষক উৎসাহ দিলেও তার মধ্যে এক ধরনের ভয় বা সংকোচ কাজ করতে থাকে। এ ভয় স্কুল ভীতি নামে পরিচিত। সাধারণ ভাষায় শিশুর এই ভীতির বিষয়টাকে ‘স্কুল অ্যাভয়ডেন্স, স্কুল রিফিউজাল বা স্কুল ফোবিয়া’ বলা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে ডিডাসক্যালেই নোফোবিয়া নামে পরিচিত। 

যেসব শিশু স্কুল পলায়নের প্রবণতা বা এ নিয়ে অজুহাত দেখা যায়, তারা স্কুল ফোবিয়ায় আক্রান্ত। আমাদের দেশে ছাত্রছাত্রীর মধ্যে স্কুল ভীতি ব্যাপকভাবে কাজ করে। স্কুল মানেই ছাত্রছাত্রীর কাছে শুধু লেখাপড়া এবং শিক্ষকের শাস্তির জায়গা। যে কারণে স্কুল ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতাও কাজ করে। যদি কোনো ছাত্রছাত্রীর শ্রেণির কাজ প্রস্তুত না হয়, তাহলে সে হয় স্কুলে যায় না অথবা স্কুলে গেলেও সে ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে। এ স্কুলভীতি ছাত্রছাত্রীর অন্তত মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত থেকে যায়। স্কুলভীতি থেকে তার ভেতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিও অনীহা জন্ম নেয়। অনেকেই মনের বিরুদ্ধে গিয়ে স্কুল-কলেজের লেখাপড়া শেষ করে। তবে এ ভীতি বা ধারণা উচ্চ মাধ্যমিক বা তার পরবর্তী পর্যায়ে গিয়ে পরিবর্তিত হয়।  

মাঝেমধ্যে পত্রিকার পাতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের আঘাতে আহত হওয়ার খবর আমরা পাই। শিক্ষকরা আজও লেখাপড়া করার উপায় হিসেবে শারীরিক শাস্তিকেই উত্তম উপায় হিসেবে বোঝেন। শারীরিক শাস্তির ভয়ে যে ছাত্রছাত্রী লেখাপড়া করে না এমন নয়। শাস্তি প্রদানও একটি উপায় হিসেবে একসময় ছিল। কিন্তু এ পদ্ধতিটি অস্থায়ী এবং একরকম বল প্রয়োগপূর্বক গেলানোর মতো অবস্থা। যা মনের ওপর চাপ বৃদ্ধি করে এবং যে পড়া প্রস্তুতের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়, তা খুব বেশি সময়ের জন্য মনে থাকে না। কারণ যে পাঠের সঙ্গে আনন্দ নেই, সেই পাঠ মস্তিষ্ক বেশিদিন ধরে রাখতে পারে না। কিন্তু এ পদ্ধতিটি সেকেলে এবং আধুনিক বিজ্ঞান বিষয়টিকে মোটেই সমর্থন করে না। স্কুলভীতি বা অনীহার একটি বড় কারণ হলো এ শাস্তি প্রদান। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে ছাত্রছাত্রীকে শাস্তির পরিবর্তে উৎসাহমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়। উৎসাহ প্রদান বা পড়ালেখায় মনোযোগী করতে ইতিবাচক পদ্ধতি গ্রহণের বহুবিধ সুবিধা রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হলো বিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থী কখনোই উৎসাহ হারায় না এবং যে পাঠ আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়, তা অপেক্ষাকৃত স্থায়ী। শারীরিক শাস্তির পাশাপাশি মানসিক শাস্তিও কম প্রভাব ফেলে না। 

শারীরিক শাস্তি শরীরে প্রভাব ফেলে আর মানসিক শাস্তি অনেক সময় মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। একটি দীর্ঘ সময় ধরে শিশুর মনে যে নেতিবাচক বক্তব্য যা শিশুর উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয় তা পরবর্তী সময়ে প্রভাব ফেলতে বাধ্য। একটি আনন্দময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে মূল ভূমিকা পালন করবেন শিক্ষকরা। যেহেতু দিনের একটি বড় সময় তারা স্কুল-কলেজ পার করে, ফলে তাদের সঙ্গে শিক্ষকদের সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দিতে হবে। না হলে স্কুল ফোবিয়া কোনোদিনই কাটবে না। কখনোই স্কুল-কলেজ কোনো আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠবে না। পূর্ণ বয়সে স্কুল-কলেজের স্মৃতি যতই মধুর হোক না কেন, যেসময় তার স্কুল ভালো লাগার কথা, সে সময়ে অনাগ্রহ থেকে আগ্রহী করে তুলতে হবে। শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় আবদ্ধ করে রাখলে চলবে না, আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে আরাও অনেক সময় লেগে যাবে। তা ছাড়া শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নয়, বাড়িতেও শারীরিক শাস্তি প্রদান করা উচিত নয়।

সময় বদলেছে, যুগ এগিয়েছে মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বের করে দেখেছেন, শিশুকে শারীরিক শাস্তি প্রদান তার মনে ভীতির সৃষ্টি করে। যা তার শিখন ঘাটতি অগ্রসর হলেও তা স্থায়ী হচ্ছে না। এর ফলে শ্রেণিকক্ষে শাস্তি বা তিরস্কারের পরিবর্তে শিশুকে উৎসাহ প্রদান করা উচিত। এক্ষেত্রে শিক্ষকের ব্যক্তিগত মোটিভেশনাল কৌশল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তার ছাত্রছাত্রীকে কীভাবে ম্যানেজ করবেন, সে কৌশল তার নিজের। 

তবে অবশ্যই শারীরিক বা মানসিক শাস্তি বাদ দিয়ে অন্য কোনো কৌশল অবলম্বন করতে হবে । এ বিষয়ে সরকার থেকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনাও রয়েছে। সেসব কাজে লাগাতে হবে। এটা শুনতে বা দেখতে অত্যন্ত খারাপ যে কোনো শিক্ষক তার ছাত্রকে পিটিয়ে আহত করে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  আধুনিক শিক্ষা   আদিম পদ্ধতির প্রয়োগ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close