বাংলাদেশের বর্তমান সংকট কেবল গ্যাসের ঘাটতি নয়; এটি মূলত জ্বালানি পরিকল্পনা, শিল্প পরিকল্পনা এবং অবকাঠামো পরিকল্পনার সমন্বয়হীনতার ফল। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমছে, আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, অথচ শিল্পের চাহিদাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একযোগে চাপে পড়ছে। বিশ্বের বহু দেশ যেমন—জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, জার্মানি ও চীন নিজস্ব গ্যাসের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছেছে। তাদের সাফল্যের মূল ভিত্তি ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বহুমুখী জ্বালানি উৎস এবং পরিকল্পিত শিল্পায়ন। বাংলাদেশেরও সেই পথেই এগোতে হবে।
সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট থেকেই শুরু করা যাক। গত এক সপ্তাহে দেশজুড়ে যে গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে, তা নিছক একটি প্রযুক্তিগত বিভ্রাট নয়—এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার কাঠামোগত ভঙ্গুরতার একটি বাস্তব প্রমাণ। কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক চাহিদার তুলনায় সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ ঠেকেছে মাত্র ২১৫ কোটি ঘনফুটে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্প উৎপাদনে। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে বহু কারখানার উৎপাদন নেমে এসেছে মোট সক্ষমতার মাত্র ২৫-৩০ শতাংশে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, সরকার আপাতত শিল্পে নতুন গ্যাস-সংযোগ দেওয়াই বন্ধ রেখেছে।
এ সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—একটি একক টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটি কীভাবে সারা দেশের শিল্প উৎপাদনকে এভাবে থমকে দিতে পারে? উত্তরটি প্রকৌশলগত নয়, কাঠামোগত। এখানেই ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্পায়ন’ শীর্ষক রোডম্যাপের মূল যুক্তি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
সমস্যার প্রকৃতি : ঘাটতি নয়, নির্ভরতার কাঠামো
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন প্রতি বছর যে হারে কমছে, তার বিপরীতে আমদানিনির্ভরতা যেভাবে বেড়েছে, তাতে জ্বালানি ব্যবস্থার ভারসাম্য মূলত একমুখী হয়ে পড়েছে। এলএনজি আমদানি এখন আর বিকল্প নয়, বরং প্রধান নির্ভরতার জায়গা। সমস্যা হলো, এ নির্ভরতা তৈরি হয়েছে সীমিত সংখ্যক অবকাঠামোর ওপর ভর করে—হাতে গোনা কয়েকটি এফএসআরইউ এবং একটি মূল পাইপলাইন করিডোর। ফলে যে কোনো একটি বিন্দুতে বিভ্রাট ঘটলেই পুরো ব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়ে, যা গত কয়েক দিনের সংকটে স্পষ্ট দেখা গেছে।
এ কাঠামোগত দুর্বলতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমস্যাটি শুধু ‘গ্যাস কম’—এ সরল সমীকরণে আটকে নেই। বরং এটি তিনটি ভিন্ন স্তরের সমন্বয়হীনতার ফল—জ্বালানি পরিকল্পনা, শিল্প স্থাপন নীতি এবং অবকাঠামো বিনিয়োগ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়েছে। শিল্প-কারখানা যেখানে রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক সুবিধার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে, জ্বালানি সরবরাহ সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।
তুলনামূলক অভিজ্ঞতা কতটা প্রাসঙ্গিক
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, জার্মানি ও চীনের উদাহরণ প্রায়ই বাংলাদেশের জ্বালানি বিতর্কে টেনে আনা হয় এবং যৌক্তিক কারণেই। এ দেশগুলো নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও বহুমুখী জ্বালানি উৎসের মাধ্যমে শিল্পায়নে সফল হয়েছে। তবে এ তুলনা ব্যবহার করার সময় কিছু বাস্তবতা মাথায় রাখা জরুরি।
জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার সাফল্যের পেছনে যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ক্ষমতা এবং কারিগরি দক্ষতা কাজ করেছে, তা তৈরি হতে দশকের পর দশক লেগেছে এবং বিপুল মূলধন প্রয়োজন হয়েছে। সিঙ্গাপুরের মডেল মূলত একটি ছোট, বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক অর্থনীতির জন্য কার্যকর। বাংলাদেশের মতো বৃহৎ জনসংখ্যা ও বিস্তৃত শিল্পভিত্তির দেশে তা হুবহু প্রয়োগযোগ্য নয়। জার্মানির উদাহরণটি বরং বেশি প্রাসঙ্গিক এই অর্থে যে, সংকটকালীন দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিকল্প অবকাঠামো স্থাপনের সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্যও অনুকরণযোগ্য শিক্ষা হতে পারে। কিন্তু এখানেও পার্থক্য আছে। জার্মানির হাতে ছিল শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও ইউরোপীয় সরবরাহ নেটওয়ার্কের সংযোগ, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সীমিত।
অর্থাৎ, এই তুলনাগুলো দিকনির্দেশক হিসেবে মূল্যবান হলেও সরাসরি অনুকরণযোগ্য মডেল হিসেবে নেওয়া বিভ্রান্তিকর হতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোন উপাদানগুলো আমাদের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য।
প্রস্তাবিত সমাধানের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা
রোডম্যাপে প্রস্তাবিত ধাপভিত্তিক পরিকল্পনা—স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির বিভাজন নীতিগতভাবে যৌক্তিক। বিশেষত ‘এনার্জি অ্যাভেইলেবিলিটি সার্টিফিকেট’ বা জ্বালানি প্রাপ্যতা সনদের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সেই মৌলিক সমস্যার সমাধান করতে চায়, যা সাম্প্রতিক সংকটে স্পষ্ট হয়েছে—জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা ছাড়াই শিল্প অনুমোদনের প্রবণতা। একইভাবে জ্বালানিভিত্তিক শিল্প অঞ্চল বিন্যাসের (ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনিং) প্রস্তাবটিও অবকাঠামো বিনিয়োগের অপচয় রোধে সহায়ক হতে পারে।
তবে বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে দেখলে এ পরিকল্পনায় কিছু ফাঁক থেকে যায়। প্রথমত, প্রস্তাবটি মূলত সরবরাহকেন্দ্রিক। কীভাবে বেশি গ্যাস, বেশি এলএনজি, বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে; কিন্তু চাহিদা ব্যবস্থাপনা বা শিল্পে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশ্নে তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ১০০টির বেশি নতুন গ্যাসকূপ খনন বা নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের মতো প্রস্তাবগুলোর জন্য যে বিপুল অর্থায়ন প্রয়োজন, তার উৎস বা অগ্রাধিকার কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা স্পষ্ট নয়। তৃতীয়ত, পারমাণবিক বিদ্যুৎ বা গ্রিন হাইড্রোজেনের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তির উল্লেখ থাকলেও, বাংলাদেশের বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো এসব প্রযুক্তি বাস্তবায়নের জন্য কতটা প্রস্তুত, সে প্রশ্নটি অনুত্তরিত থেকে যায়।
আরও একটি বাস্তবতা হলো, সরকার নিজেই সাম্প্রতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলমান থাকার কথা জানিয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস দিয়েছে। এটি ইঙ্গিত করে যে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমস্যাটি অস্বীকৃত নয়; বরং বাস্তবায়নের গতি ও অগ্রাধিকারই মূল চ্যালেঞ্জ।
গভীরতর প্রশ্ন : রাজনৈতিক অর্থনীতি
জ্বালানি-শিল্প সমন্বয়হীনতার আলোচনায় প্রায়ই একটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়—কেন এই সমন্বয়হীনতা এত দীর্ঘদিন ধরে চলছে। প্রযুক্তিগত সমাধান জানা থাকা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়িত না হওয়ার পেছনে সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক অর্থনীতির কারণ থাকে—স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতার অভাব কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। ‘এনার্জি ফার্স্ট, ইন্ডাস্ট্রি নেক্সট’ নীতিগতভাবে যত যৌক্তিকই হোক, তা কার্যকর করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন, যা স্বল্পমেয়াদি নির্বাচনি চক্র বা আমলাতান্ত্রিক বাস্তবতায় প্রায়ই দুর্বল হয়ে পড়ে।
রোডম্যাপের কেন্দ্রীয় বার্তা—‘বাংলাদেশের সংকট গ্যাসের নয়, পরিকল্পনার’—মূলত সঠিক একটি পর্যবেক্ষণ এবং সাম্প্রতিক সংকট তা আবারও প্রমাণ করেছে। কিন্তু পরিকল্পনার অভাব যতটা সমস্যা, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও রাজনৈতিক ইচ্ছা। বিশ্বের সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দিকনির্দেশনা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশকে নিজস্ব আর্থিক সীমাবদ্ধতা, প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা এবং স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার জরুরি প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই নিজস্ব পথ তৈরি করতে হবে। একটি একক এফএসআরইউ-এর ত্রুটিতে সারা দেশের শিল্প উৎপাদন থমকে যাওয়ার মতো ঘটনা যদি বারবার ঘটতে থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনার আলোচনা যতই যৌক্তিক হোক, তার বাস্তব গুরুত্ব জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
লেখক : প্রকৌশলী, সদস্য, অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ
কেকে/এলএ