বর্তমান বিশ্বে খাদ্য নিয়ে মানুষের ভাবনা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এক সময় মানুষ খাবার বেছে নিত মূলত স্বাদ, দাম এবং সহজলভ্যতার ভিত্তিতে। কিন্তু এখন খাদ্যকে শুধু ক্ষুধা মেটানোর উপায় হিসেবে দেখা হয় না; বরং স্বাস্থ্য রক্ষা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস প্রতিরোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক উপাদান জিএলপি-১।
জিএলপি-১ বা গ্লুকাগন-লাইক পেপটাইড-১ হলো মানবদেহের একটি প্রাকৃতিক হরমোন, যা মূলত অন্ত্র থেকে নিঃসৃত হয়। আমরা যখন খাবার খাই, তখন এই হরমোন শরীরকে বিভিন্ন সংকেত দেয়। এটি মস্তিষ্ককে জানায় যে কখন পেট ভরেছে, অগ্ন্যাশয়কে ইনসুলিন নিঃসরণে সহায়তা করে এবং একইসঙ্গে খাবার হজমের গতি কিছুটা ধীর করে দেয়। ফলে মানুষ দীর্ঘ সময় তৃপ্তি অনুভব করে এবং ঘনঘন ক্ষুধা লাগে না। এ কারণেই বর্তমানে জিএলপি-১ বিশ্বব্যাপী স্থূলতা ও ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিশ্বজুড়ে জিএলপি-১-ভিত্তিক ওষুধ জনপ্রিয় হওয়ার পর খাদ্যশিল্পেও বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এখন খাদ্যপ্রতিষ্ঠানগুলো এমন খাবার তৈরি করছে, যা শরীরের স্বাভাবিক ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে সহায়তা করে। আগে যেখানে ‘লো-ফ্যাট’ বা ‘ডায়েট’ খাবারের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো, এখন সেখানে গুরুত্ব পাচ্ছে ‘উচ্চ প্রোটিন’, ‘খাদ্যআঁশসমৃদ্ধ’ এবং ‘দীর্ঘ সময় তৃপ্তিদায়ক’ খাবার।
বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের বড় সুপারমার্কেটগুলো ইতোমধ্যে নতুন খাদ্য বিভাগ চালু করেছে, যেখানে উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ সালাদ, কম চিনিযুক্ত পানীয়, উদ্ভিদভিত্তিক স্ন্যাকস এবং ছোট পরিমাণের কিন্তু পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার রাখা হচ্ছে। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, জিএলপি-১ ব্যবহারকারীরা একবারে কম খাবার খান, কিন্তু তারা চান এমন খাবার যা দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখবে এবং শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করবে।
একইভাবে ইউরোপের খাদ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন উদ্ভিদভিত্তিক প্রোটিন নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করছে। মটর, ছোলা, মসুর, সয়াবিন এবং বিভিন্ন শস্য থেকে প্রোটিন আলাদা করে নতুন ধরনের খাদ্য তৈরি করা হচ্ছে। এসব খাবার শুধু নিরামিষভোজীদের জন্য নয়; বরং স্বাস্থ্যসচেতন সাধারণ মানুষের জন্যও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
খাদ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, জিএলপি-১ সক্রিয় রাখতে প্রোটিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার তুলনামূলকভাবে ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূতি তৈরি করে। এর ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়। পাশাপাশি খাদ্যআঁশ অন্ত্রের উপকারী জীবাণুগুলোকে সক্রিয় রাখে, যা আবার জিএলপি-১ নিঃসরণে সহায়তা করে।
এই কারণে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ‘প্রোটিনকেন্দ্রিক খাদ্য’ একটি বড় প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। হাই-প্রোটিন পানীয়, স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস, প্রস্তুত খাবার, মিল রিপ্লেসমেন্ট এবং উদ্ভিদভিত্তিক বিকল্প মাংসের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে কৃষকেরা এখন আগের তুলনায় বেশি মটর, ডাল এবং উদ্ভিদ প্রোটিনসমৃদ্ধ শস্য উৎপাদনে আগ্রহ দেখাচ্ছেন, কারণ খাদ্যশিল্পে এসব কাঁচামালের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
এখন প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত?
বাংলাদেশে বর্তমানে ডায়াবেটিস, স্থূলতা, হৃদরোগ এবং জীবনধারাজনিত বিভিন্ন রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহরাঞ্চলে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, কোমল পানীয়, উচ্চমাত্রার চিনি এবং পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণের প্রবণতা অনেক বেড়েছে। অন্যদিকে মানুষ ধীরে ধীরে স্বাস্থ্য সচেতনও হচ্ছে। অনেকেই এখন কম চিনি, বেশি প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু দেশের বাজারে এখনো জিএলপি-১-সহায়ক বা দীর্ঘ সময় তৃপ্তিদায়ক খাবারের সংখ্যা খুবই সীমিত।
বাংলাদেশের অধিকাংশ প্যাকেটজাত খাবারে এখনো অতিরিক্ত চিনি, নিম্নমানের তেল এবং উচ্চমাত্রার পরিশোধিত ময়দা ব্যবহার করা হয়। স্বাস্থ্যসম্মত বিকল্প খাবারের বাজার এখনো ছোট এবং তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল। ফলে সাধারণ মানুষ সহজে এসব পণ্য কিনতে পারেন না।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। কারণ আমাদের দেশ ডাল, ছোলা, মসুর, মুগ, সয়াবিন এবং বিভিন্ন উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যের সমৃদ্ধ উৎস। সঠিক গবেষণা, প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ খুব সহজেই জিএলপি-১-সহায়ক নতুন খাদ্যপণ্য তৈরি করতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়
ডালভিত্তিক উচ্চ প্রোটিন স্ন্যাকস, ছোলা প্রোটিনসমৃদ্ধ পানীয়, খাদ্য আঁশসমৃদ্ধ সকালের খাবার, কম চিনিযুক্ত প্রস্তুত খাবার, উদ্ভিদভিত্তিক মিল রিপ্লেসমেন্ট এবং উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ স্বাস্থ্যকর বিস্কুট বা নুডলস বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন ‘ফাংশনাল ফুড’ বা কার্যকর স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের বাজার দ্রুত বাড়ছে। ভবিষ্যতে শুধু স্বাদের জন্য নয়, বরং শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক কার্যক্রমকে সহায়তা করার ক্ষমতার জন্যও খাদ্য মূল্যায়ন করা হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের খাবার এমন হবে, যা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করবে, রক্তে শর্করা স্থিতিশীল রাখবে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়তা করবে।
বাংলাদেশের খাদ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এখন সময় এসেছে নতুনভাবে চিন্তা করার। শুধু প্রচলিত প্রক্রিয়াজাত খাবারের বাজারে সীমাবদ্ধ না থেকে উচ্চ প্রোটিন, খাদ্য আঁশসমৃদ্ধ এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক নতুন পণ্য উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করতে হবে। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পুষ্টিবিদ এবং খাদ্য প্রযুক্তিবিদদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
কারণ আগামী দিনের খাদ্যশিল্প শুধু পেট ভরানোর ব্যবসা হবে না; বরং স্বাস্থ্য রক্ষার অংশ হয়ে উঠবে। আর সেই পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
লেখক : খাদ্য বিজ্ঞানী, বার্মিংহাম, ইউকে
কেকে/ এমএস