বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬,
৪ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এসএসএফ-কে প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর      স্ত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় অভিনেতা আলভী কারাগারে      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু      সব বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হবে : শিক্ষামন্ত্রী      স্বর্ণের দামে আবারও রেকর্ড, ভরিতে কত?      যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি সই, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সংঘাত অবসানের আশা      বর্তমান সরকার কোনো দলের নয় সবার : প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগে বাংলাদেশে সার্কুলার ইকোনমি
ড. শাহ জে মিয়া
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ১০:১২ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার দেশের প্রায় সব সেক্টরে যথাসম্ভব গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করেছে। অন্য সব সেক্টরের সঙ্গে পরিবেশ ও শিল্প একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রে আমি বলতে চাই যে, বাংলাদেশ এখন তার পরিবেশ ও শিল্প উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত নগরায়ণ, ঘন জনসংখ্যা এবং দ্রুত শিল্প প্রবৃদ্ধি মিলে দেশে এক বিশাল জটিল বর্জ্য সংকট তৈরি করেছে। 

সম্প্রতি এক গবেষণায় বলা হয়েছে- প্রতি বছর দেশে প্রায় ৮ লাখ ২১ হাজার থেকে ৯ লাখ ৭৭ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, আর এর প্রায় ৭০ শতাংশই ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা হয় না। প্লাস্টিক বর্জ্য সব সময় খোলা জায়গায় ফেলে দেওয়া হয়, পোড়ানো হয়, কিংবা নদীতে গিয়ে মিশে। 

এক গবেষণা সূত্র মতে, মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার ২০০৫ সালে ৩ কেজি থেকে বেড়ে ২০২০ সালে ৯ কেজিতে পৌঁছেছে, আর ঢাকায় এই পরিমাণ মাথাপিছু ২২ কেজিরও বেশি। এর পাশাপাশি, দেশের পরিবারগুলো প্রতি বছর আনুমানিক ১ কোটি ৪১ লাখ টন খাবার নষ্ট করে। এই বাড়তে থাকা চাপের মুখে বাংলাদেশ এখন পুরোনো ‘নাও-বানাও- ফেলে দাও’ মডেল থেকে সরে আসার চেষ্টা করতে হবে এবং তার জায়গায় একটি সার্কুলার ইকোনমি বা বৃত্তাকার অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে, যার তিনটি মূল ভিত্তি থাকতে পারে, যেমন বর্জ্য কমিয়ে ফেলা, একটি উপকরণ বারবার বিভিন্নভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা এবং প্রকৃতিকে আবার সুস্থ করে তোলা। 

এখন এই পরিবর্তনকে বাস্তবে রূপ দিতে আমরা যারা টেকনোলজি নিয়ে কাজ করি, তাদের অনেকে মনে করছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ইন্টারনেট অব থিংস এর মতো হাই-টেক গুলি একটি ক্রমবর্ধমান নীতিকাঠামো তৈরিতে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি উন্নয়নে, যেমন পোশাক ও বস্ত্র খাতে এই ব্যবস্থাগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এ সময়ে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যা হোক, সার্কুলার ইকোনমির কথা বলতে গেলে, বাংলাদেশে ২০১০ সালে বাস্তবায়িত একটি জাতীয় কৌশল বা নীতিমালা প্রথমবারের মতো ‘কমাও, পুনরায় ব্যবহার কর, পুনঃচক্রায়ন কর’  ধারণাটি দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আলোচনায় নিয়ে আসে। 

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলো ২০২১ সালের কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা , যা ১৯৯৫ সালে বিএনপি সরকারের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে তৈরি করা হয়েছিল। এই সংক্রান্ত নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য গত অন্তবর্তৃকালীন সরকার একটি আইনি ভিত্তি প্রদান করেছিল, যার করণে এটি প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল ও ক্যানের মতো অপচনশীল পণ্যের উৎপাদক, ব্র্যান্ড মালিক এবং আমদানিকারকদের তাদের পণ্য থেকে তৈরি হওয়া বর্জ্য সংগ্রহ, পুনঃচক্রায়ন ও দায়িত্বের সঙ্গে নিষ্পত্তি করতে নীতিমালা তৈরি করা এবং উপরে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানদের এই নীতিমালা মেনে চলতে নির্দেশনা প্রদান করেছে। এছাড়াও সেই সময়, একটি জাতীয় সমন্বয় কমিটিও গঠন করা সম্ভবত হয়েছিল। 

যা হোক, তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিক বলতে ঠিক কাদের বোঝায়, তা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে এখনো পূর্ণাঙ্গ আইন দরকার, যাতে ফাঁকফোকর বন্ধ করা যায় এবং কেউ দায় এড়িয়ে যেতে না পারে।

আমি মনে করি, বাংলাদেশের সার্কুলার ইকোনমির স্বপ্নটি ‘যে দূষণ করবে, সে-ই খরচ দেবে’ নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা উচিত। এতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার শারীরিক ও আর্থিক দায়িত্ব শুধু পৌরসভা ও ভোক্তার ওপর না রেখে, তা উৎসের দিকে, অর্থাৎ যারা প্রথমে পণ্যটি বাজারে আনে, সেই উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকদের ওপর দিয়ে দিতে পারলে ভালো হতে পরে। এর কারণ শুধু পরিবেশগত নয়, আর্থিকও বটে- কেননা অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের মতে, একটি কার্যকর উৎপাদক ফি দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অর্থায়নের ঘাটতির প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করতে পারে, যা ব্যবস্থাটির অন্যতম গভীর দুর্বলতা দূর করতে সাহায্য করবে। 

যা হোক, একটি শক্তিশালী সার্কুলার ইকোনমির জন্য অনেক সংস্থার একসঙ্গে কাজ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে কঠিন বর্জ্য কার্যক্রম তদারক করবে, আর পরিবেশ অধিদপ্তর বিধি প্রয়োগ করবে, নীতিমালা তৈরি করবে এবং তহবিল পরিচালনা করবে। স্থানীয় সরকার সংস্থা সংগ্রহের তদারকি করবে, আর শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের পরিবেশ তৈরি করবে। উৎপাদক ও ব্র্যান্ড মালিকরা মূল আর্থিক দায় বহন করবে, যদিও ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলোর  ওপর চাপ কমাতে তাদের শুধু হালকা প্রতিবেদন দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। ভোক্তারাও সমান গুরুত্বপূর্ণ, এবং তারা ঠিকমতো বর্জ্য ফেলা ও উৎসেই আলাদা করার দায়িত্ব পালন করবে, আর এ কাজে সাহায্য করবে পণ্যের গায়ে থাকা মানসম্মত পরিবেশ-লেবেল, যা পুনঃচক্রায়নযোগ্যতা সম্পর্কে আমাদের অবহিত করবে।

এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে তৈরি পোশাক  খাত, যারা কিনা দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ জোগায়। এই শিল্প প্রতি বছর ৪ লাখ ৪০ হাজার থেকে ৬ লাখ টন প্রাক-ভোক্তা কাপড়ের বর্জ্য তৈরি করে, যা স্থানীয়ভাবে ঝুট নামে পরিচিত। বর্তমানে এই ঝুট ব্যবস্থাপনার পুরোটাই মূলত পরিচালিত হয় গাজীপুর এবং এর পার্শবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে। এখানে বেশকিছু দেশি অনানুষ্ঠানিক রিসাইক্লার ব্যবস্থাপনা রয়েছে, যেগুলো এখন পর্যন্ত এই বর্জ্য মোটামুটি দক্ষতার সঙ্গে সামলে এসেছে। তারা পোশাকের বাড়তি টুকরার ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত পুনরুদ্ধার করে এবং এক সূত্রে বলা হচ্ছে যে, ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি শহুরে দরিদ্র মানুষের জীবিকা এই ঝুট ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। 

কিন্তু এই ব্যবস্থাপনা এখন হুমকির মুখে। বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডগুলো এখন বিশ্ববাজারে টিকিয়ে রাখতে টেকসই লক্ষ্য পূরণে উন্নত মানের পুনঃচক্রায়িত ব্যবস্থাপনার কথা বলছে এবং তারা এখন শুধু সেসব পোশাক তৈরি দেশ এবং তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করতে রাজি হচ্ছে যাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে পরিচালিত হয়। এমতাবস্থায়, পোশাক খাতে আমাদের বর্তমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মোটেও আন্তর্জাতিক নীতিমালা মেনে চলছে না, যা কিনা আমাদের পোশাক শিল্পকে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, এই শিল্পে আমাদের অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ যেমন ভারত, চীন, ভিয়েতনাম তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছে এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো এখন তাদের সঙ্গে পোশাক তৈরির চুক্তিতে বেশি আগ্রহ প্রদান করছে। গবেষকরা একে ‘গ্রিন ভ্যালু অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন’ বা সবুজ মূল্য আত্মসাৎ বলে অভিহিত করেছেন আন্তর্জাতিক প্রকাশনায়।

এবার আসা যাক এ সমস্যাগুলোর সমাধান নিয়ে আলোচনায় : নীতিমালা যদি কাঠামো জোগায়, তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই জোগায় ইঞ্জিন। সার্কুলার অর্থনীতি পরিচালনা মানে বিশাল সরবরাহ চেইনের জটিলতা, উপকরণের ভিন্নতা ও তথ্যের অসামঞ্জস্য সামলানো। আর এসব সমস্যার জন্য এআই দারুণভাবে উপযোগী। পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দেশের স্বনামধন্য ও মাঝারি ধরনের সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার তৈরি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একত্রে করে ঢাকা, সিলেট ও ময়মনসিংহসহ অন্যান্য শহরগুলোতে স্মার্ট বিন বসানো যেতে পারে, যেগুলোতে থাকবে আল্ট্রাসনিক ফিল-লেভেল সেন্সর, তাপমাত্রা মনিটর, জিপিএস ট্র্যাকিং ও আরএফআইডি স্ক্যানার। এই বিন থেকে পাওয়া তথ্য মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমে যাবে, যা ময়লার গাড়ির রুট গতিশীলভাবে নির্ধারণ করে দিতে পারবে। ফলে জ্বালানি খরচ কমবে, সেই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় কমবে এবং বিন উপচে পড়া রোধ হবে, আর এআই চ্যাটবট মানুষকে সার্কুলার ইকোনোমি ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন করবে।

এআই-এর সবচেয়ে উন্নয়নশীল প্রয়োগ দেখা যেতে পারে কাপড় বাছাইয়ে, যা দীর্ঘদিন ধরে ঝুট পুনঃচক্রায়নের প্রধান বাধা হিসেবে রয়েছে। স্যাঁতসেঁতে, অসম গাঁটে আসা তুলা, কৃত্রিম আঁশ ও রাসায়নিক রঙের মিশ্রণ হাত দিয়ে আলাদা করা অর্থনৈতিকভাবে অসম্ভব। এআই-চালিত অপটিক্যাল ব্যবস্থা এই সমস্যা ‘মাল্টি-মোডাল সেন্সর ফিউশন’-এর মাধ্যমে সমাধান করতে পারবে যেখানে নিয়ার-ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি আঁশের রাসায়নিক গঠন বুঝতে পারবে, আর আরজিবি কম্পিউটার ভিশন ও কনভোলিউশনাল নিউরাল নেটওয়ার্ক প্যাটার্ন, রং ও পোশাকের ধরন চিনতে পারবে, এরপর রোবোটিক গ্রিপার বা সংকুচিত-বাতাসের ভালভ উপকরণটিকে আলাদা করবে। 

যেহেতু শুধু এনআইআর সেন্সর কাপড়ের একদম বাইরের স্তরটিই পড়তে পারে এবং এর নির্ভুলতা ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যেতে পারে, তাই এই মিশ্র পদ্ধতি অথবা এর চেয়েও ভালো কোনো প্রযুক্তি আমাদের ব্যবহার করা অপরিহার্য হবে; যাতে পোশাকের ধরন শনাক্তের নির্ভুলতা প্রায় ৯৭-৯৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। ফ্রান্সের পিআইসিভিসা’-এর ইকোসর্ট টেক্সটাইলের মতো প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই ঘণ্টায় ১.২ টনের বেশি কাপড় ২৫টিরও বেশি পরিষ্কার ভাগে আলাদা করছে, এবং প্রায় ৯৫ শতাংশ নির্ভুলতায়। এখন এমন ব্যবস্থা বাংলাদেশের ইকো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে বসালে দেশ উন্নত রিসাইক্লারদের জন্য দরকারি পরিষ্কার, যাচাইকৃত কাঁচামাল আলাদা করতে পারবে। 

যা হোক, এই পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি তিনটি দিকজুড়ে ছড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিকভাবে, সার্কুলার ব্যবস্থা নতুন কাঁচামালের ওপর ব্যয়বহুল নির্ভরতা কমাতে, পরিচালন দক্ষতা বাড়াতে এবং দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাবঞ্চিত বর্জ্য খাতের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ঘাটতি পূরণে সাহায্য করতে পারবে। সামাজিকভাবে, এটি বর্জ্য নিষ্কাশন কর্মীদের অনিশ্চিত জীবিকাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার, নতুন কর্মসংস্থান তৈরির এবং আয় বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করবে। তবে শর্ত হলো, বর্জ্য খাতের একটি ন্যায্য রূপান্তর যেন অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রাহক ও ভাঙারিদের ব্যবস্থাটি আধুনিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোণঠাসা হয়ে পড়া থেকে রক্ষা করে। পরিবেশগতভাবে, লক্ষ্য হলো নদীতে প্লাস্টিকের প্রবাহ বন্ধ করা। কিংবা উপচে পড়া ভাগাড়ের ওপর চাপ কমানো এবং শেষ পর্যন্ত সেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাগুলোকে আবার সুস্থ করে তোলা, যা কয়েক দশকের একমুখী ভোগ নষ্ট করে ফেলেছে।

আমি মনে করি যে, এই স্বপ্নগুলো বাস্তবে রূপান্তর করা খুব একটা সহজ নয়। সবচেয়ে বড় বাধা হলো অবকাঠামো যেখানে পৌরসভাগুলো এখনো হাতে-কলমে সংগ্রহ পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। এমনকি ঢাকার মতো মেগাসিটি ক্রমাগত উপচে পড়া ও অবৈধ ডাম্পিংয়ে ভুগছে। আর দেশে পুনঃচক্রায়নযোগ্য বর্জ্য সংগ্রহের নেটওয়ার্ক ও আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা, কোনোটিই পর্যাপ্ত যথাযত ব্যবস্থা নেই। 

যেমন, পোশাক খাতে পুরোনো প্রযুক্তির আধিপত্য এখনো আছে। আর আধুনিক পুনঃচক্রায়নে বিদেশি বিনিয়োগের অভাব প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্জ্য পোড়ানোর মতো ধ্বংসাত্মক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেয়। পরিচালন ঝুঁকি এই ঘাটতিগুলোকে আরও বাড়িয়ে তোলে। অনিয়ন্ত্রিত ঝুট কেন্দ্রগুলোতে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে এবং সেখানে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ লক্ষ্য করা যায়, যা অগ্রহণযোগ্য। এছাড়াও এসব ক্ষেত্রে এআই মডেলগুলো নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে ভুগবে। কারণ আমরা বর্জ্যের গঠন সম্পর্কিত নথি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করি না। যাও বা সংগ্রহ করি তা প্রায়ই অসম্পূর্ণ বা ভুল। 

আর এই খাতে এআইয়ের মতো জটিল ব্যবস্থা চালানোর মতো দক্ষ জনবলের অত্যন্ত অভাব রয়েছে। আচরণগত বাধাও ভালো নকশার সরঞ্জামকেও ব্যর্থ করে দিতে পারে। যেখানে কোনো স্মার্ট বিন যদি মানুষকে ট্যাগ স্ক্যান করতে বলে, তবে অনেকে নিয়ম না মেনে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে পারে। এর সঙ্গে আরও রয়েছে আমাদের পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ শক্তির অভাব, কারণ বড় পরিসরে এআই প্রযুক্তি চালাতে প্রচুর বিদ্যুৎ ও ঠান্ডা করার পানি প্রয়োজন হবে। আর বিদ্যুৎ গ্রিড যদি নবায়নযোগ্য শক্তিতে পরিচালিত না হয়, তবে এর কার্বন খরচ প্রযুক্তিটির প্রতিশ্রুত সুফলকেই বাতিল করে দিতে পারে।

একটি সার্কুলার ইকোনমির ভবিষ্যৎ বাস্তবে রূপ দিতে আমাদেরকে একটি প্রযুক্তিগত সমাজের রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের উচিত স্পষ্ট সংজ্ঞাসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ইপিআর আইন প্রণয়ন করা, যেখানে এআই প্রযুক্তির সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে বহু-সংস্থা সমন্বয় গড়ে তোলা, এরপর তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। 

প্রথমে তহবিলভিত্তিক মডেল দিয়ে শুরু করে, সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি উৎপাদক দায়বদ্ধতা সংস্থায় (পিআরও) রূপান্তর করা। প্রাথমিক লক্ষ্য হওয়া উচিত সবচেয়ে সমস্যাযুক্ত উপকরণ, যেমন একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন ও বহুস্তর প্যাকেজিং পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা- যাতে তা পাঁচ বছরে ৩০ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত হবে। কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে অবশ্যই বর্জ্য ট্র্যাক করতে পারতে হবে এবং আন্তর্জাতিক ট্রেসেবিলিটি নিয়ম পূরণ করতে হবে। সেইসঙ্গে এআই সরঞ্জামকে স্থানীয় উপযোগী করে তুলতে হবে- যাতে উন্মুক্ত উৎসের স্পেকট্রাল লাইব্রেরি ও আঞ্চলিক বাংলা ভাষায় মোবাইল ইন্টারফেসের মাধ্যমে কৃষক ও বর্জ্য সংগ্রাহকরা সহজ ও সঠিকভাবে তা ব্যবহার করতে পারেন। 

আমি এখানে দেখি যে, ইকো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, কর ছাড়, কম ভ্যাট, সহজ বিদেশি বিনিয়োগ এবং কাঁচা ঝুট রপ্তানিতে বেশি শুল্ক, এগুলো সবই দেশের ভেতরেই উপকরণের লুপ বন্ধ করতে সাহায্য করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এই আধুনিকায়ন যেন সমবায়, ঋণসুবিধা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক শ্রমশক্তিকে রক্ষা করতে পারে, যাতে দেশ একটি পুনর্জন্মশীল অর্থনীতির দিকে যাত্রা করতে পারে এবং এর ফলে সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের বা দেশের বিশাল গ্রামের জনগোষ্ঠীকে পেছনে না ফেলে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার কাজ করতে পারে। এই সেবার লক্ষ্য নিয়ে এগোলে বাংলাদেশ তার বর্জ্য সংকটকে একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধায় এবং টেকসই শিল্প উন্নয়নের এক আদর্শ উদাহরণের দেশে রূপান্তরিত হতে পারবে। আমার বিশ্বাস, বর্তমান সরকার এটা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। 

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ   বাংলাদেশে সার্কুলার ইকোনমি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close