দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা সত্ত্বেও অপরাধের লাগাম টানা যাচ্ছে না এমন চিত্র কোনোভাবেই একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রের লক্ষণ হতে পারে না। খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ, কিংবা অস্ত্রের প্রকাশ্য মহড়া যেভাবে বাড়ছে, তাতে জনজীবন চরম আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে, গণঅভ্যুত্থানের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জামিনে মুক্ত হয়ে আসা শীর্ষ ও দুর্র্ধষ সন্ত্রাসীদের পুরোনো আন্ডারওয়ার্ল্ড পুনর্গঠনের তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যেভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে গোলাগুলি ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে, তা সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা তৈরি করছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদন সরকারের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হলেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র কিন্তু স্বস্তিদায়ক নয়। মার্চ ও এপ্রিল মাসেই দেশে ৬০৫টি খুন, ১৯৬টি অপহরণ এবং ১২৯টি পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এ পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়া এবং জনগণের একাংশের মধ্যে আইন হাতে তুলে নেওয়ার যে প্রবণতা দেখা দিয়েছে, অপরাধীরা মূলত সেই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে। পুলিশ কোনো কঠোর অবস্থানে গেলে যদি ‘ফ্যাসিস্ট আমলের পুলিশ’ তকমা দিয়ে হামলার চেষ্টা করা হয়, তবে স্বাভাবিক পুলিশিং কার্যক্রম ব্যাহত হতে বাধ্য। পুলিশের এই ‘নড়বড়ে’ অবস্থানের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ জনগণকে।
অপরাধ অর্থনীতিতে আধিপত্যের লড়াই এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে এমনিতেই নড়বড়ে থাকা দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে।
আমরা মনে করি, বর্তমান সরকারের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধী যে-ই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে এবং কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায় জনগণ। আদালত কাকে জামিন দেবেন তা আদালতের এখতিয়ার, কিন্তু জামিন পেয়ে কেউ যদি পুনরায় অপরাধ জগতে ফিরে যায়, তবে তাকে তৎক্ষণাৎ গ্রেপ্তার করার আইনি বাধ্যবাধকতা প্রশাসনের রয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে হোয়াটসঅ্যাপ বা সিগন্যাল অ্যাপ ব্যবহার করে বিদেশ থেকে বা দেশের ভেতর থেকে যে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট চালানো হচ্ছে, তা কঠোর গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দিতে হবে।
সর্বোপরি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদেরও আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় যেন অপরাধীর ঢাল না হয়ে দাঁড়ায়, সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা আশা করি, আর কোনো কালক্ষেপণ না করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দমন এবং পুলিশ বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনতে সরকার এখনই সর্বোচ্চ কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হোক এই মুহূর্তের প্রধান অগ্রাধিকার।
কেকে/ এমএস