নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার ওবায়দুল্লা হক বাদলের খন্ডিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পল্টন থানা পুলিশ।
নিহত ওবায়দুল্লা হক ওরফে বাদল মিয়া (৩০) শিবপুরের সাধারচর ইউনিয়নের তাঁতারকান্দি গ্রামের আ. হামিদ মিয়ার ছেলে।
সোমবার (২ মার্চ) বিকালে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, শোকে স্তব্ধ সবাই। কারও মুখ দিয়ে কথা আসছে না। কিছুক্ষণ বসার পর বাদলের মা রানী বেগম ও বাদলের ছোট বোন মাহেরা আক্তার মিলি পাশে বসলেন।
সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কিছু জানতে চাইলে অজোরে কেঁদে কেঁদে মিলি বললেন, তারা দুই ভাই দুই বোন। বাদল মিয়া ভাই বোনের মধ্যে সবার বড়। বাড়িতে থাকে বাবা, মা, ছোট ভাই জলিল মিয়া, ছোট বোন ইতি আক্তার। তাদের সংসার চলে টানাপোড়নে। বাবা কৃষি কাজ করেন। বড় ভাই বাদল মিয়া পার্শ্ববর্তী চলনা মাদ্রাসা থেকে কামিল পাশ করার পাশাপাশি তেলিয়া মাদ্রাসা থেকে কুরআনের হাফেজ হয়েছেন। বাড়ির আর্থিক অভাব অনটন গোছাতে বড় ভাই বাদল মিয়া গত তিন বছর ধরে ঢাকার পল্টনে রাসনা ফার্মাসিউটিক্যালসের ইউনানি কোম্পানির ক্যান্সার গবেষক অধ্যক্ষ ডা. এসএম সারওয়ারের সহকারী পদে ও বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে চাকরি করে আসছেন। মাঝেমধ্যে তিন বাড়িতে আসতেন।
‘সর্বশেষ তিনি ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট দিতে বাড়িতে আসেন ও পরের দিন চলে যান। ২৫ ফেব্রুয়ারি বাবার সাথে তার ফোনে শেষ কথা হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় আমাদের প্রতিবেশী একজন বাড়িতে এসে বাবা মাকে জানান, শিবপুর থানা থেকে বলেছে, আমার ভাই বাদলকে হত্যা করা হয়েছে এবং তার দুই হাত ও একটি পা ঢাকায় পাওয়া গেছে।’
‘শুনেছি ভাইয়ের হত্যাকারী তার রুমমেট হবিগঞ্জের শাহিনকে পল্টন থানা পুলিশ গতকাল রোববার আটক করেছে। আমাদের বাড়িতে শিবপুর মডেল থানা থেকে পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সাংবাদিকসহ অনেক লোক এসেছেন ভাইয়ের খবর নেওয়ার জন্য। কিন্তু আমার ভাই তো আর জীবিত আসবে না। আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বড় ভাই আর নেই। আমারদের চলার আর কোন পথ রইল না। আমার ভাইয়ের হত্যাকারীর ফাঁসি চাই। আজ সোমবার সকালে বাবা, ছোট ভাই বাদলের লাশ আনার জন্য ঢাকা গিয়েছেন।’
শিবপুর মডেল থানার পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার রহস্য উদঘাটনসহ একজনকে গ্রেফতার করেছে পল্টন মডেল থানা পুলিশ। গ্রেফতারকৃতের নাম শাহিন আলম (২১)। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাত আনুমানিক ২টায় পল্টন থানা এলাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারের বিপরীত পাশ থেকে নিহতের খণ্ডিত একটি পা, সকাল আনুমানিক ৯টায় বায়তুল মোকারমের স্টেডিয়াম সংলগ্ন গেটের পাশ থেকে দুইটি পূর্ণাঙ্গ হাত, দুপুর আনুমানিক ২টায় কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকা থেকে অপর একটি পা উদ্ধার করা হয়।
রহস্য উদঘাটনে পল্টন মডেল থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় ঘাতকের অবস্থান শনাক্ত করে। এক পর্যায়ে শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে মতিঝিল থানাধীন হীরাঝিল হোটেলের সামনে অভিযান চালিয়ে শাহীন নামের একজনকে আটক করে। তার দেখানো মতে কবি জসীমউদ্দীন রোডের ভাড়া বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাপাতি, ভিকটিমের মোবাইল ফোন এবং লাশ পরিবহনে ব্যবহৃত সাইকেলটি উদ্ধার করা হয়।
তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার রাতে মাতুয়াইল ময়লার ভাগাড় হতে খন্ডিত মাথা ও সকালে আমিনবাজারের সালেহপুর ব্রিজের নীচ হতে কোমরের একটি অংশ উদ্ধার করা হয় এবং উদ্ধার কার্যক্রম চলছে। গ্রেফতারকৃত মো. শাহীন আলম তিন মাস আগে হবিগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে প্রথমে গুলিস্তানের একটি হোটেলে কাজ নেন। সেখানে ২০ দিন কাজ করার পর বেতন কম হওয়ায় সে চাকরিটি ছেড়ে দেয়। এরপর বাল্যবন্ধু মারুফের কমলাপুরের বাসায় ওঠেন। মারুফ হবিগঞ্জে চলে গেলে শাহীন গত দুই মাস ধরে ভিকটিম ওবায়দুল্লাহর সাথে থাকা শুরু করে। পরবর্তী সে হীরাঝিল হোটেলে কাজ শুরু করে।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি শাহীন হীরাঝিল হোটেল থেকে বাসায় ফেরার পথে ওবায়দুল্লাহ ফোন করে সিগারেট আনতে বলে। শাহীন টাকা নেই বললে ওবায়দুল্লাহ তাকে টাকা দেয় এবং সে সিগারেট এনে দেয়। কিছুক্ষণ পর ওবায়দুল্লাহ তাকে দিয়ে পুনরায় রুটি ও কাবাব আনতে বলে। রমজান মাসে ইফতারের পর ছয়তলা থেকে বারবার নিচে নামায় শাহীনের বিরক্তির উদ্রেক হয়। রাতে শাহীন ঘুমানোর চেষ্টা করলে ওবায়দুল্লাহ উচ্চস্বরে ফোনে কথা বলা শুরু করে। এ নিয়ে দুইজনের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। এতে চরম ক্ষিপ্ত হয়ে শাহীন ওবায়দুল্লাহকে রান্নাঘর থেকে চাপাতি এনে আঘাত করে হত্যা করে। তাছাড়া ওবায়দুল্লাহর বিভিন্ন সময়ে দেওয়া অনৈতিক প্রস্তাবে শাহিন আলম আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিল।
মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর শাহিন নিজেকে বাঁচানোর জন্য দেহটিকে খণ্ড খণ্ড করে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ফেলে দেয়। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা যায়।
শিবপুর উপজেলার সাধারচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোর্শেদ মিয়া জানান, ওবায়দুল্লা ওরফে বাদল মিয়া ভালো ছেলে। পরিবারটি একটি সাধারণ পরিবার ও কৃষক পরিবার। উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে পরিবারটি এখন দিশেহারা। যতটুকু সম্ভব আমরা সহায়তা করছি।
শিবপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কোহিনূর মিয়া জানান, পল্টন থানা থেকে খবর পেয়ে আমরা বাড়িতে গিয়ে খবর পৌছাই এবং খোঁজখবর নেই। এ ব্যাপারে পল্টন থানায় হত্যা মামলা হয়েছে এবং একজন আটক হয়েছে।
কেকে/এমএ