বাংলাদেশের আবহমান কাল ধরে চলমান রাজনীতির মাঠে টিকে থাকতে হলে শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে নয়—দরকার সাংগঠনিক গতিশীলতা, আদর্শিক স্পষ্টতা এবং নিজস্ব ভোটভিত্তিক জনসমর্থন।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণের কঠিন পরীক্ষায় ভালোভাবে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ছয়টি আসনে বিজয় পাওয়া নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের জন্য সংখ্যার দিক থেকে অর্জন হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় এটি অত্যন্ত দুর্বল অবস্থানের প্রমাণ। বরং এই ফলাফল দলটির জামায়াতে ইসলামীর ভোট ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীলতার সীমাবদ্ধতাই স্পষ্ট করেছে। শুধুমাত্র জামায়াতের ভোটেই এই ৬ আসনে তারা বিজয় লাভ করেছে এটা শতভাগ নিশ্চিত।
দলের প্রধান নাহিদ ইসলাম (ঢাকা-১১), সেক্রেটারি আখতার হোসেন (রংপুর-৪), মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ (কুমিল্লা-৪), হান্নান মাসুদ (নোয়াখালী-৬), দলটির অল্প পরিচিত মুখ আতিকুর রহমান মুজাহিদ (কুড়িগ্রাম-২) এবং আব্দুল্লাহ আল আমিন (নারায়ণগঞ্জ-৪) আসন থেকে জামায়াতের ভোটে বিজয়ী হয়েছেন।
এদেশের নির্বাচন পরবর্তী মাঠে সব নাম ছাপিয়ে দলটির শুধুমাত্র নাহিদ, হাসনাত, আকতার, নাসিরুদ্দিন, হান্নান ও সারজিস—এই নামগুলোই এখন এনসিপির আলোচিত সমালোচিত মুখ। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক অস্পষ্ট অবস্থানকে ঘিরে জনমনে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
নির্বাচনের আগে নানা সভা, সমাবেশ ও টকশোতে অনেক বড়াই, বড় বড় বক্তব্য, কড়া হুঁশিয়ারি, কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এবং সাধারণ মানুষকে বিকল্প রাজনীতির স্বপ্ন দেখানো হলেও বাস্তবে তারা নিজেদের শক্তিতে কতটুকু দাঁড়াতে পেরেছে—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
সম্প্রতি জামায়াতের জোট ছাড়া তারা কোন আসন পেতো কিনা—এমন মন্তব্য দলের ভেতর থেকেই এখন প্রকাশ্যে মিডিয়ায় চলে এসেছে। দলের নেতাদের এই সরল স্বীকারোক্তি দলটির স্বতন্ত্র শক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিশেষ করে হান্নান মাসুদ ও সারজিসের বক্তব্য, যে—জোট না হলে এক বা দুটি আসন পাওয়াও কঠিন হতো, তা রাজনৈতিকভাবে আত্মসমালোচনা হতে পারে। কিন্তু তা এখন জনমনে ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। জনগণ এনসিপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করছে। এতে বোঝা যায়, দলটির সাংগঠনিক ভিত এই মুহূর্তে প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে আছে।
হেভিওয়েট প্রার্থী নাসিরুদ্দিনের পরাজয় নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিতর্ক, সারজিসের পরাজয় বরণ, সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ নিয়ে দ্বিধা, সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রশ্নে অস্পষ্ট অবস্থান দলটির নেতৃত্বের অস্থিরতার চিত্র তুলে ধরেছে।
দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় সমালোচনা হলো অতিরিক্ত মাত্রায় সোস্যাল মিডিয়া ও অনলাইন নির্ভরতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির নানাবিধ কার্যক্রম ও রাজনৈতিক তৎপরতা থাকলেও মাঠের রাজনীতিতে তার প্রতিফলন খুবই কম। জেলা, উপজেলা ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কার্যকর কমিটি না থাকা এবং সক্রিয় কর্মীভিত্তিক সাংগঠনিক গতি না থাকায় দলটি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। মাত্র ৬ আসনের নির্বাচনী সাফল্য কখনও কোন গণতান্ত্রিক দেশে শক্তিশালী ভুমিকা পালনের জন্য টেকসই হয় না।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বহু এলাকায় এনসিপির উপস্থিতি কাগজে-কলমে ও ফেইসবুকে সীমাবদ্ধ। যেহেতু মাত্র ৩০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে সেহেতু অবশিষ্ট বেশকিছু জেলা ও উপজেলার স্থানীয় কার্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরও মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচারের পর জনমনে হতাশা বাড়িয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের একমাত্র স্টেকহোল্ডার দাবি করা এনসিপি নিয়ে জনমনে যে আশার আলো ছিল তা ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভরাডুবির পর বিলীন হয়ে গেছে।
নাহিদ, আকতার, নাসিরুদ্দিন, সারজিস ও হাসনাতকে ঘিরে সমালোচনার আরেকটি দিক হলো—রাজনৈতিক দুরদর্শিতা ও পরিপক্বতার অভাব। ইউনুস সরকারের সময় উপদেষ্টা পরিষদে ছাত্র প্রতিনিধি রাখার মাধ্যমে এবং বাড়তি রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার কারণে এনসিপির নেতারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বড় বড় বক্তব্য হুমকি-ধমকি এবং সমালোচনা করে কোন বাধার মুখোমুখি হতে হয় নাই বলে ভেবেছিল, তারা আরও ভেবেছিল এইভাবেই সবসময় সুযোগ সুবিধা পাবে। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারীর পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ফলে এনসিপির আদর্শিক অবস্থান আপাতত তলানিতে।
বড় হওয়ার সম্ভাবনা থাকার পরেও শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টায় তারা কখনও কখনও বাস্তব রাজনীতির হিসাব-নিকাশে অনেক বড় রাজনৈতিক ভুল করে ফেলেছে। আকতার ও হান্নানের ফলাফলের ক্ষেত্রেও ইঞ্জিনিয়ারিং হওয়ার মত অভিযোগ শোনা যায়। দলীয় অবস্থান স্পষ্ট করার বদলে জামায়াতের ‘বি’ টিম হিসেবে দলটির ছায়ায় জোট রাজনীতির নামে নিজেদের টিকিয়ে রাখার কৌশল নিয়ে ব্যস্ত। এতে দলীয় সক্রিয়তা, দলীয় অবস্থান, দলীয় স্বাধীনতা ও দলীয় ভবিষ্যৎ ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৭ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা শক্তিশালী আওয়ামী লীগের পতনের মুল ভুমিকা পালনকারী দলের মাত্র দেড় বছর পর শুধুমাত্র ৬ জন সংসদ সদস্য নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এনসিপি কি সত্যিই স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা, নাকি জামায়াতে ইসলামী শক্তির কৌশলগত সহযাত্রী?
জনগনের বড় একটি অংশ মনে করছে—ছয়টি আসন মূলত জামায়াত জোটের ভোটের হিসাবের ফল। এখানে এনিসিপির ভোট ব্যাংক মাত্র ৪% থেকে ৫% এর বেশি নয়। এই ধারণা যদি সত্য হয় এবং জনমনে শক্ত অবস্থান তৈরি করে তবে দলটির ভবিষ্যৎ আগামী ৫ বছরে আরও সংকুচিত হবে। কারণ বাংলাদেশের ভোটাররা শেষ পর্যন্ত শক্ত নেতৃত্ব, শক্তিশালী দল—যারা একক নির্বাচন করে সেদিকেই পরিষ্কার অবস্থান নিতে চায়।
দলের ভেতর থেকে হেভিওয়েট নারী নেতৃত্বের দলত্যাগ, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বেশিরভাগ পরাজয় এবং গুটিকয়েক নেতৃত্বের ওপর অতিরিক্ত ব্যক্তিনির্ভরতা এনসিপিকে একটি অনিশ্চিত মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। বহুদলীয় গণতন্ত্রে ছোট দল টিকে থাকতে পারে, কিন্তু তার জন্য দরকার ধৈর্য, শক্ত সংগঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
শুধু নির্বাচনী সমঝোতার ওপর দাঁড়িয়ে ৬ আসনের প্রাপ্তি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়া যায় না। এই মুহূর্তে জাতীয় নাগরিক পার্টির সামনে দুটি পথ খোলা—আত্মসমালোচনা করে সংগঠন পুনর্গঠন করা, নিজস্ব ভোটভিত্তিক জনমত তৈরি করা এবং আদর্শিক অবস্থান পরিষ্কার করা। অথবা জোটনির্ভর রাজনীতিতে সীমিত প্রভাব নিয়ে ধীরে ধীরে প্রান্তিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া। দলটির বর্তমান পরিস্থিতি বিলুপ্তির দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি যদি দ্রুত নিজেদের শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলতে না পারে, তবে ছয় আসনের এই অর্জনই তাদের শেষ উল্লেখযোগ্য সাফল্য হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের ইতিহাস তখন তাদের স্মরণ করবে—বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে শুরু করা একটি রাজনৈতিক দল শুধুমাত্র সঠিক সিদ্ধান্ত ও কৌশলের অভাবে হারিয়ে যাওয়া একটি দল হিসেবে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ, ডীন—ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
কেকে/এলএ