জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায় চলতি মৌসুমে আলুর ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকরা। উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও বাজারে আলুর দাম আশানুরূপ না হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে পাইকারি বাজারে আলুর দাম উৎপাদন খরচের কাছাকাছি কিংবা নিচে নেমে এসেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ ) উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ও বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি মণ আলুর দাম মিউজিক: ২৮০ টাকা, সানসাইন: ২৮০ টাকা, ডায়মন্ড: ২৮০ টাকা, এ্যারোস্টিক (শুকনা): ৪০০ টাকা, গ্যানোলা: ২২০ টাকা।
উত্তরের কৃষিপ্রধান জনপদ হিসেবে পরিচিত জয়পুরহাট জেলার অন্যতম অর্থকরী ফসল আলু। জেলার উৎপাদিত আলু দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রপ্তানি হয়। আলুকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিস্তৃত কৃষি অর্থনীতি যেখানে হাজার হাজার কৃষক, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও ব্যবসায়ী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ক্ষেতলালে মোট ৮ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৭৭০ হেক্টর কম। প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ধরা হয়েছে ২৪.৫৬ মেট্রিক টন। সে হিসেবে মোট সম্ভাব্য উৎপাদন প্রায় ২ লাখ ৭ হাজার ৫৩২ মেট্রিক টন।
প্রতি হেক্টরে গড় উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৪৩ হাজার ৬০০ টাকা। এর মধ্যে বীজ, সার, সেচ, শ্রমিক ও কীটনাশক বাবদ ব্যয় প্রায় ২৯ হাজার ২৫০ টাকা। যদিও কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী গত বছরের তুলনায় সামগ্রিক খরচ কিছুটা কমেছে। বিশেষ করে বীজের দাম কম থাকায় তবে কৃষকদের দাবি, বাস্তবে বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মোট খরচ বেড়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, এসব দামে আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচই উঠছে না। বিশেষ করে গ্যানোলা, মিউজিক, সানসাইন ও ডায়মন্ড জাতের আলুতে বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে। অনেক কৃষক ঋণ ও ধারদেনা করে আলু চাষ করেছেন। বর্তমান দামে বিক্রি করলে খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়ছে, লাভ তো দূরের কথা।
আলু উত্তোলনের পর সংরক্ষণ নিয়েও দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। উপজেলায় মোট ৪টি হিমাগার রয়েছে, যার সম্মিলিত সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩৪ হাজার ৮৮০ মেট্রিক টন। প্রতি বস্তা সংরক্ষণ ভাড়া প্রায় ৪০০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে হিমাগারে জায়গা সংকট দেখা দিয়েছে। পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হয়ে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে আলু সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে আলু বিক্রি করছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একসঙ্গে আলু উত্তোলন হওয়ায় বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া রপ্তানি কম এবং বড় ক্রেতাদের চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় বাজারে স্থিতিশীলতা আসছে না।
কৃষকদের অভিযোগ, মাঠ পর্যায়ে যে দামে তারা আলু বিক্রি করছেন, খুচরা বাজারে সেই আলু অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। মাঝখানে মধ্যস্বত্বভোগী ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের বড় অংশ থাকায় উৎপাদক ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না, অথচ ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে বাড়তি দাম। বাজার ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব ও সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ ব্যবস্থা না থাকাকে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ‘চলতি মৌসুমে উৎপাদন সন্তোষজনক হলেও অতিরিক্ত সরবরাহ ও সংরক্ষণ সংকটের কারণে বাজারদর নিম্নমুখী। উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয় ও কৃষকের ন্যায্য লাভ বিবেচনায় বাজারমূল্য নির্ধারণ জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় সচেতন হতে হবে। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিকল্পিতভাবে আবাদ করলে ক্ষতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব। ভবিষ্যতে চাহিদাভিত্তিক আবাদ পরিকল্পনা ও ফসল বহুমুখীকরণে গুরুত্ব দিলে কৃষকরা বেশি লাভবান হতে পারবেন।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে আলু চাষিদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ভর্তুকি বা প্রণোদনা নেই। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
কৃষকদের আশঙ্কা, এভাবে লোকসান গুনতে হলে আগামী মৌসুমে আলু চাষে আগ্রহ কমে যেতে পারে। এতে একদিকে কৃষকের ক্ষতি হবে, অন্যদিকে জেলার সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেকে/ এমএস