কোনো রকম উসকানি ছাড়া ইরানে হামলা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানের প্রত্যাঘাতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির বহু শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে দেশটি। তবে তাতে দমে না গিয়ে পাল্টা হামলায় ত্রাস ছড়াচ্ছে তারা। এরই মধ্যে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল, খামেনিকে হত্যা করলেই তাদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জিত হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উল্টো ঘটনা। ইরানের প্রতিশোধমূলক পাল্টা হামলায় হতবিহ্বল হয়ে পড়েছে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী। এতে বিশ্বজুড়ে মার্কিন হামলার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইরানকে ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রণকৌশলের হিসাব মিলছে না।
এদিকে ইরানে হামলা চালানো নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেছেন, ইরানে হামলার বিষয়ে সংকল্পবদ্ধ ছিল ইসরায়েল এবং একবার দেশটিতে হামলা হলে নিশ্চিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা তেহরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হবে। সেই চিন্তা থেকে ট্রাম্প প্রশাসন আগেই দেশটিতে হামলা করেছে।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে বিস্ময়করভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়া নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ব্যাখ্যা কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় গত সোমবার সন্ধ্যায় কংগ্রেসের শুনানিতে ইরানে হামলা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। রুদ্ধদ্বার ওই শুনানিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ)-এর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সোমবার রাতে ফক্স নিউজকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো এটি নিশ্চিত করা যে ‘ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।’ ভ্যান্স বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) ইরানিদের ও পুরো বিশ্বকে স্পষ্ট করে জানাতে চান যে, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে— সেটা নিশ্চিত করার জন্য সব গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি বিশ্রামে যাবেন না।’
সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানজুড়ে ধারাবাহিকভাবে বিমান হামলা চালিয়েছে। জবাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত দেশগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা নিহত হয়েছেন। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ছয়জন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। আর ইরানের রেড ক্রিসেন্টের দেওয়া তথ্যমতে, দেশটিতে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ৭৮৭ জনে পৌঁছেছে।
এই যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। রিপাবলিকান নেতারা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়ালেও ডেমোক্র্যাটরা সমালোচনা করে বলছেন, এটি অপ্রয়োজনীয় সংঘাত, যার লক্ষ্যও স্পষ্ট নয়।
সিনেটে ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা চাক শুমার বলেছেন, ‘এটি ট্রাম্পের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ বেছে নেওয়া হয়েছে। তার কোনো কৌশল নেই, কীভাবে যুদ্ধ শেষ হবে তারও কোনো পরিকল্পনা নেই।’ শুমার বলেন, ‘শুনানিতে উপস্থিত আইনপ্রণেতারা অনেক প্রশ্ন করেছিলেন। কিন্তু তারা যে জবাব পেয়েছেন, তা একেবারেই অপর্যাপ্ত। আসলে অন্তত আমার কাছে মনে হয়েছে, শুনানিতে অনেক বেশি প্রশ্ন উঠেছে, যেগুলোর উত্তর দেওয়া হয়নি।’
সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মার্ক ওয়ার্নার বলেন, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন একটি যুদ্ধে টেনে নেওয়ার ফলে যেসব জটিলতা দেখা দেবে, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। ওয়ার্নার বলেন, ‘ইরানিদের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আসন্ন কোনো হুমকি ছিল না। হুমকি ছিল ইসরায়েলের প্রতি। যদি আমরা ইসরায়েলের প্রতি হুমকিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আসন্ন হুমকি হিসেবে দেখি, তাহলে আমরা একটি অজানা পরিস্থিতিতে পড়ে যাই।’
ইরানে হামলা চালানোর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কয়েকটি লক্ষ্যের কথা বলেছিলেন। তার মধ্যে রয়েছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও তাদের নৌবাহিনী ধ্বংস করা, দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো জায়গায় তাদের ‘প্রক্সি’ বাহিনীকে তেহরানের সমর্থন দেওয়া বন্ধ করা। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও মাত্র দুটি লক্ষ্যের কথা বলেছেন। তা হলো ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও তাদের নৌবাহিনী ধ্বংস করা।
ইরানে পাল্টা হামলা চালিয়েছে কাতার
উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে তেহরানের পাল্টা হামলার জবাবে ইরানে হামলা চালিয়েছে কাতার। গত ২৪ ঘণ্টায় ইরানের বিভিন্ন এলাকা লক্ষ্য করে ওই হামলা চালিয়েছে কাতারের সামরিক বাহিনী। কাতারের হামলার বিষয়ে অবগত অজ্ঞাতনামা পশ্চিমা সূত্রের বরাত দিয়ে ইসরায়েলের টেলিভিশন চ্যানেল-১২ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
ইরানে কাতারের হামলার পর শিগগিরই দেশটিতে সৌদি আরব আরও হামলা শুরু করতে যাচ্ছে বলে ওই সূত্র জানিয়েছে। ইসরায়েলের রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম কানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, গতকাল ইরানের হামলার শিকার হওয়ার পর সৌদি আরবও শিগগির দেশটিতে পাল্টা হামলা শুরু করবে বলে ধারণা করছে ইসরায়েল।
এদিকে তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ভবনে বিমান হামলা চালানোর কথা বলেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইসরায়েলি বিমানবাহিনী তেহরানের কেন্দ্রস্থলে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর নেতাদের কমপাউন্ডের স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়ে সেগুলো ধ্বংস করেছে।’ এতে আরও বলা হয়েছে, কমপাউন্ডে হামলার সময় প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ভবনের ওপর বিপুল গোলাবারুদ নিক্ষেপ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের জন্য নরকের দরজা উন্মুক্ত হবে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করেছে। গতকাল এই যুদ্ধ চতুর্থ দিনে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ওই দুই দেশের বিরুদ্ধে চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। আইআরজিসি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের সামরিক বাহিনীর হামলা আরও তীব্র হবে। যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ইরানের এই বাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য আরও অধিক ‘জাহান্নামের দরজা’ উন্মুক্ত হবে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে আইআরজিসির মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নাইনি বলেছেন, শত্রুদের জন্য সামনে আরও ভয়াবহ এবং ক্রমাগত শাস্তিমূলক হামলা অপেক্ষা করছে। তিনি বলেন, ‘শত্রুদের একের পর এক শাস্তিমূলক হামলার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর মুহূর্তের মধ্যে জাহান্নামের দরজাগুলো আরও বেশি করে উন্মুক্ত হতে থাকবে।’
যুদ্ধে না জড়াতে ইউরোপকে হুঁশিয়ারি ইরানের
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোকে যোগ না দেওয়ার বিষয়ে হুঁশিয়ার করেছে ইরান। গতকাল তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ওই হুঁশিয়ারি দেন।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতা ধ্বংস করার জন্য জার্মানি, ব্রিটেন ও ফ্রান্স ‘প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা’ নিতে পারে বলে জানানোর পর তেহরান এই হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তেহরানে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘এটি যুদ্ধের শামিল হবে। ইরানের বিরুদ্ধে এ ধরনের যেকোনো পদক্ষেপকে হামলাকারীদের সঙ্গে যোগসাজশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। একে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবেই দেখা হবে।’
কেকে/এলএ