মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তীব্র আকার ধারণ করেছে, যার সরাসরি চাপ পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশেও। সম্ভাব্য উৎস থেকে নির্ধারিত সময় ও পরিমাণে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, গ্যাস সরবরাহ ও সার উৎপাদনে সাময়িক বিঘ্নের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি বৈঠক করে সাশ্রয়ী ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছে সরকার, সীমান্তে নজরদারি জোরদার করেছে এবং সংকট কাটাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতাও চেয়েছে। তবে রমজানে ইফতার ও সাহরির সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতের আশ্বাস দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে জরুরি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাধারণ জনগণের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য অনুরোধ, সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহার করার জন্য নির্দেশনা, ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে পাবলিক বাহন ব্যবহারের অনুরাধ জানানো হয়েছে।
একইসঙ্গে খোলাবাজারে ডিজেল, পেট্রোল বিক্রয় না করার জন্য ব্যবসায়ীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর হওয়ার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বর্ডারগার্ড বাংলাদেশকে জ্বালানি পাচার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ইতোমধ্যে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, বৈশ্বিক পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার জন্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। জ্বালানি সংগ্রহ স্বাভাবিক রাখতে সব উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাময়িক সংকট মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগগুলো সফল করার জন্য জনগণকে ধৈর্যধারণ করে সর্বাত্মক সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ব্যবহারে সাশ্রয়ী হলে মার্চ পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ ধরে রাখা যাবে বলে মনে করছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহ ধীর হয়ে গেছে। জ্বালানি না থাকলে বিদ্যুৎ আসবে কোথা থেকে। জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা তো কঠিন। লোডশেডিং হলেও তা অসহনীয় হবে না। কিছুটা গ্যাস-সংকট হতে পারে। সংকট নিরসনে সবাইকে সাশ্রয়ী হতে হবে।
তিনি বলেন, এটি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়ে বড়। সবাই সহযোগিতা না করলে বিরাট সংকট থেকে উত্তরণ করা কঠিন। যা আছে, তার সাশ্রয়ী ব্যবহার করতে হবে। সবাই সাশ্রয়ী হলে চালিয়ে নেওয়া যাবে।’ ইফতার থেকে তারাবিহ পর্যন্ত এবং সাহ্রির সময় লোডশেডিং হবে না।
মন্ত্রী বলেন, ‘এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বৈশ্বিক বাজারে সবাই এখন জ্বালানি সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় আছে। অন্ধকারে যাব নাকি আলোতে থাকব, তা মন্তব্য করা কঠিন। নিয়মিত সরবরাহ কমে যেতে পারে। তাই খোলাবাজার থেকে বাড়তি জ্বালানি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তাই সংকটের ব্যবস্থাপনা এখন প্রধান কাজ। সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। ঈদের ছুটির সময়ে শিল্প কারখানার কার্যক্রম কমে গেলে বিদ্যুতের চাহিদাও কমবে, ফলে চাপ কিছুটা হ্রাস পাবে। বিভিন্ন খাতে গ্যাস সরবরাহ রেশনিং করা হবে।’
দেশে হঠাৎ করে ডিজেল বিক্রি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে বলে জানান ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, সীমান্তের ওপারে দাম বেশি থাকায় কিছু পরিমাণ ডিজেল পাচার হয়ে যেতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক করা হয়েছে। প্রয়োজনে সীমান্ত অঞ্চলে ডিজেল বিক্রিতে রেশনিং ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় বিক্রি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ শুরু হয়েছে।
জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার শুরু করা হচ্ছে বলে জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ সংকটের সময় শপিংমলে আলোকসজ্জা করা উচিত নয়। যুদ্ধ নিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্ব সমস্যায় রয়েছে। তাই জ্বালানি ব্যবহারের বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ডিজেল পাচার ঠেকাতে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিজিবিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি সংকট মার্চ পর্যন্ত চলতে পারে। দেশে যে মজুত রয়েছে, তা সাশ্রয়ভাবে চলতে হবে। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও সহযোগিতা করতে হবে। শপিংমলে আলোকসজ্জা কারা উচিত নয় এ সংকটের সময়ে। যুদ্ধ নিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয় সারা বিশ্ব সমস্যায় রয়েছে। তিনি বলেন, রেশনিং করে সরকার জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে চায়। বেশি দাম পাওয়ায় বর্ডার দিয়ে জ্বালানি চলে যায়। সেখানে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, এখনই লোডশেডিং হবে না। সরকার যে কোনো মূল্যে ইফতার এবং সাহরিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেবে। বৈশ্বিক সংকট হলে সে আচ বাংলাদেশেও পড়বে। তবে এখনই সংকট অসহনীয় হবে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, সরকারের সব ব্যয় সংকোচন করে জ্বালানির জন্য তহবিল গঠন করতে হবে। যুদ্ধ বিগ্রহের কথা বলা যায় না তবে আমাদের বাড়তি প্রস্তুতি তো নিতে হবে। সাধারণ জ্বালানি ৪৫ দিনের মজুদ রাখা হয়। আমাদের সমস্যা জ্বালানি প্রাপ্যতা নয়, সমস্যা মূল বৃদ্ধি। জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হলে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হবে। আমাদের মূল্য পরিশোধ করার মতো সামর্থ্য ও সক্ষমতা নেই।
জানা গেছে, চলতি বছরে বাংলাদেশের নির্ধারিত ১১৫টি এলএনজি কার্গোর মধ্যে ৪০টি সরবরাহ করার কথা ছিল কাতার এনার্জির। সেই সরবরাহ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প কারখানার উৎপাদন, রপ্তানি কার্যক্রম ও দৈনন্দিন জনজীবনে ব্যাপক গ্যাস সংকটের আশঙ্কা করছে পেট্রোবাংলা।
নীতিনির্ধারকরা সতর্ক করে বলেছেন, এত বড় সরবরাহকারীর থেকে জোগান বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকোচনের পরিস্থিতিতে অন্য উৎস থেকে কার্গো সংগ্রহও ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে।
পেট্রোবাংলার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চে সাতটি এলএনজি কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা এর মধ্যে ছয়টি কাতারএনার্জির, যা হরমুজ প্রণালি হয়ে আসার কথা, অন্য একটি আসবে অ্যাঙ্গোলা থেকে। পেট্রোবাংলা ইতোমধ্যে কাতারএনার্জির চারটি কার্গো নিশ্চিত করেছে, তবে দুটি এখনো অনিশ্চিত।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে সরকার
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের ঘটনায় সারা পৃথিবীতে জ্বালানির সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এতে বাংলাদেশেও সংকট দেখা দিয়েছে। যেগুলো কমিটমেন্ট ছিল, সেগুলো আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এসব তথ্য জানিয়ে দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
বুধবার সচিবালয়ে ঢাকা সফরে আসা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। এ বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে আলোচনা করে পল কাপুর বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, দেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারকে সবার আগে জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কারখানায় গ্যাস-সংযোগের জন্য মন্ত্রণালয় ও তিতাসে হাজার হাজার আবেদন জমা পড়ে আছে। কিন্তু কোনো নতুন সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। নতুন সংযোগ না হওয়ায় আমরা নতুন শিল্প বিনিয়োগ করতে পারছি না, মূলধনি যন্ত্রপাতি আনতে পারছি না। ফলে কর্মসংস্থানও বাড়ছে না।
এ কে আজাদ বলেন, গ্যাসের জন্য আমি দ্বিগুণ দাম পরিশোধ করছি। অথচ আমি সিএনজি থেকে গ্যাস নিয়ে কারখানায় বয়লার চালাই। আপনারা (সরকার) বাসাবাড়িতে গ্যাস সিস্টেম (সংযোগ) বন্ধ করে দেন। এখানে তো কোনো কর্মসংস্থান হচ্ছে না। তারা এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করুক। লাইনের গ্যাসটা যদি শিল্পে দেন, তাহলে কারখানা চলতে পারে।
কেকে/ এমএস