দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। একদিকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের শীর্ষ নেতাদের ধারাবাহিক আক্রমণাত্মক বক্তব্য, প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা অন্যদিকে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ক্যাম্পাগুলোর স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর টানাপোড়েনের প্রভাব যেন একাডেমিক কার্যক্রমে না পড়ে এমনটাই বলছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ক্লাস-পরীক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে তারা সব পক্ষকে সংযত আচরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্ররাজনীতির এই নেতিবাচক প্রতিযোগিতা যদি পারস্পরিক সংলাপ, সহাবস্থান ও সাংগঠনিক সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান না হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে ক্যাম্পাসের স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা ও প্রশাসনের সক্রিয় তদারকিই এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার প্রধান শর্ত।
গত ২ মার্চ রাতে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের লতিফ ছাত্রাবাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়।
সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম অভিযোগ করেন, শিবিরের সন্ত্রাসীরা দেশি অস্ত্র নিয়ে লতিফ ছাত্রাবাসের কক্ষে ঢুকে ছাত্রদল ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে। কক্ষের ভেতরে ঢুকে ছাত্রদলের একজন সহযোদ্ধাকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেছে। অনেকেই আহত হয়েছেন। ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিটিউটে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে শিবিরের সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করা হবে।
তিনি বলেন, ছাত্রদলের রক্ত ঝরালে রক্তের বদলা নেওয়া হবে। বিগত সাড়ে ১৫ বছর ছাত্রদলের রক্ত ঝরেছে। বিগত দেড় বছর প্রতিটি ক্যাম্পাসে ছাত্রদল মবের শিকার হয়েছে। আজও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রদলের রক্ত ঝরল। অনেক ছাড় দেওয়া হয়েছে। আর ছাড় দেওয়া হবে না।
এ ঘটনায় পাল্টা অভিযোগ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) ও ছাত্রশিবিরের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আবু সাদিক কায়েম বলেন, ঢাকা পলিটেকনিকে রাতের অন্ধকারে ছাত্রাবাসে ঢুকে শিবির কর্মীদের ওপর রামদা, রড ও দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে ছাত্রদল।
এর আগে গত বছরের ২৩ নভেম্বর ব্যানার টানানোকে কেন্দ্র করে সরকারি তিতুমীর কলেজে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে সংর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত তিন শিক্ষার্থী আহত হয়। ১১ সেপ্টেম্বর বরিশালের মুলাদী সরকারি কলেজে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে দুই পক্ষের ১৫ জন আহত হয়। ২২ জুলাই চট্টগ্রাম নগরীতে মধ্যরাতে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায়-দফায় সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হয়। ছাত্রদল দাবি করে চট্টগ্রাম সরকারি মহসীন কলেজ ও চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে আধিপত্য ধরে রাখতে শিবিরের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা করে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে শাখা শিবিরের নেতাকর্মীরা।
বক্তব্যে আক্রমণাত্মক শিবির নেতারা:
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নিয়ে ক্রমাগত আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন শিবিরের নেতাকর্মীরা। শিবির থেকে নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিরা এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকায় রয়েছেন। দলটির বিরুদ্ধে ছাত্রদল ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার এবং মব উসকে দেওয়ার অভিযোগ ক্যম্পাসগুলোর পরিবেশ অস্থিতিশীল করতে পারে বলে অনেক বাজনৈতিক বিশ্লেষক আশক্সক্ষা প্রকাশ করেছেন।
গ্রুপিংয়ে ব্যস্ত ছাত্রদল:
ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, গ্রুপিং, আধিপত্য বিস্তার, যোগ্যদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ উঠেছে। নেতৃত্বের প্রশ্নে মতবিরোধ এবং কেন্দ্রীয় নির্দেশনা বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা সংগঠনটির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমকে দুর্বল করে তুলেছে।
নেতাকর্মীদের মতে, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েই প্রতিপক্ষ সংগঠন ক্যাম্পাসে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার চেষ্টা করছে। নেতৃত্বের এ ব্যর্থতার দায়ে নতুন কমিটি চাইছেন ছাত্রদলের অনেকেই। দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতৃত্বহীনতা এবং শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুধাবনে ব্যর্থতা- এসবই ছাত্রদলের বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও।
কেকে/ এমএস