দেশের উত্তরের কৃষি সমৃদ্ধ জেলা ঠাকুরগাঁও। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ জেলায় অন্যান্য জেলার তুলনায় সব ধরনের ফসলের উৎপাদন ভালো হয়। তবে এবার অর্থকরী ফসলগুলোর মধ্যে অন্যতম আলু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকরা।
ঠাকুরগাঁওয়ে আলুর ফলন ভালো হলেও ফসলের মাঠ থেকে পাইকারি বাজার, সর্বত্রই ধস নেমেছে আলুর দামে। বর্তমানে প্রতি কেজি আলু মাত্র ৩-৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে উৎপাদন খরচ কেজি প্রতি ১২-১৫ টাকা। ফলে উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামও না পেয়ে লোকসানের মুখে পড়েছেন জেলার হাজার হাজার কৃষক।
বাজারদর নিয়ন্ত্রণের অক্ষমতা জানিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, লক্ষ্যমাত্রার চাইতেও বেশি আবাদ হওয়ায় এমন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ঠাকুরগাঁওয়ে আলুর দাম কেজিতে ২৫-৩০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। ১৪-১৫ দিন আগেও প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) আলু কৃষকেরা বিক্রি করেছিলেন ২২৫০-২৩০০ টাকায়। এখন বিক্রি হচ্ছে ৯০০-৯৫০ টাকায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ২৮ হাজার হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও আবাদ হয়েছে ২৮ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ টন। গত মৌসুমে ৩৪ হাজার ৭২৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করে ৮ লাখ ৬৮ হাজার ১২৫ টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল। জেলায় ১৭টি হিমাগারে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫৩২ টন আলু সংরক্ষণ করা যায়, যা মোট উৎপাদনের তুলনায় অনেকটাই কম।
সদর উপজেলার আকচা এলাকার কৃষক আলতাফুর রহমান বলেন, ‘গত মৌসুমেও আলু চাষ করে লোকসানের সম্মুখীন হয়েছিলাম। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় ঋণ করে এবারও পাঁচ বিঘা জমিতে আবাদ করেছি। কিন্তু এবারও উৎপাদন খরচ তুলতে পারব না। আরো বেশি ঋণের বোঝা বেড়ে গেলো।’
নারগুন এলাকার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রতি বিঘায় আলু চাষে খরচ হয়েছে ৩০০০০-৪০০০০ টাকা। অথচ বাজারে দাম ৫-৭ টাকা। একজন শ্রমিকের মজুরি ৪০০-৫০০ টাকা, এক বিঘার আলু তুলতে ৮-১০ জন শ্রমিক লাগে। এই দামে বিক্রি করে শ্রমিক ও পরিবহন খরচই উঠছে না, সংসার চালাবো কিভাবে আর ঋণই বা মেটাবো কিভাবে।’
আলুর পাইকারি ক্রেতা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে পুরোদমে আলু ওঠা শুরু হয়েছে, তাই দাম কমছে। এছাড়া ভারত থেকে আমদানির খবর পেয়ে মূল্য হু হু করে কমে যাচ্ছে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁওয়ের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘গত মৌসুমে লোকসানের পর কৃষকদের কম জমিতে আলু চাষের পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেক কৃষক বেশি লাভের আশায় আবারও বেশি জমিতে আলু আবাদ করেছেন। আগে ঠাকুরগাঁওয়ের আলু দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হতো। এখন অন্যান্য জেলাতেও আলু চাষ বাড়ায় চাহিদা কমেছে। আমরা কৃষকদের বিকল্প ফসল চাষ এবং পরিকল্পিত উৎপাদনের বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছি, যাতে ভবিষ্যতে তারা লোকসানের ঝুঁকি কমাতে পারেন।’
কেকে/এসএ