এবারও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যেই শুরু হয় রমজান। রমজান শুরুর পর সেই ঊর্ধ্বগতিতে কিছুটা লাগাম পড়তে না পড়তে এবার ঈদকে সামনে রেখে বাড়তে শুরু করেছে পোলাও রান্নায় ব্যবহৃত চিনিগুঁড়া চাল, চায়না রসুন, মাছ ও মুরগির দাম।
অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকারের কর্মীদের শঙ্কাকে সত্যে পরিণত করে নতুন সরকারের শপথের সুযোগে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করেছেন ব্যবসায়ীরা। যদিও সরকার দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানায় কঠোর হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে সেই প্রতিশ্রুতির বাতাস খুব একটা লাগেনি বাজারে-এমনটাই মত ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ, খুচরা ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের।
কয়েকদিনের ব্যবধানে চিনিগুঁড়া চাল কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে চায়না রসুন কেজিতে ৩০ টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকায়। তবে দেশি রসুনের দাম কমে প্রতি কেজি ৬০ টাকায় নেমেছে, যা আগে ছিল ৮০ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদকেন্দ্রিক বাড়তি চাহিদার কারণেই এসব পণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে।
এবার রোজার শুরুতেই এক ধাক্কায় বিভিন্ন পণ্যের দাম বেশ বেড়ে যায়। এমনকি লেবু, শসা ও কাঁচামরিচসহ কিছু পণ্যের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ে। যদিও গত কয়েকদিন সেসব পণ্যের দাম ধীরে ধীরে কমছে। তবে সার্বিকভাবে রমজানের বাজার এখনও চড়াই।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর হাতিরপুল, লালবাগ, নিউ মার্কেট ও মিরপুরে বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
লালবাগে বাজার করতে আসা গৃহিণী রোজিনা আক্তার বলেন, “পোলাওয়ের চালের দাম শুনে মনে হয় আকাশ থেকে পড়লাম। দুদিন আগে নিয়েছিলাম, এখনই দাম বেড়ে গেছে।”
সরেজমিনে দেখা যায়, দুইদিন আগেও যে চায়না রসুন ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছিল, এখন তা ২৩০ টাকায় উঠেছে। তবে দেশি রসুনের দাম কমে ৬০ টাকায় নেমেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে মাছের বাজারেও দামের ধাক্কা লেগেছে। রুই, তেলাপিয়া কিংবা পাঙাশ—কোনো মাছই ২০০ টাকার নিচে মিলছে না। কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে দাম।
বাজারে মাঝারি আকারের রুই মাছ প্রতি কেজি ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহে ছিল ৩০০ টাকা। বড় আকারের রুই কিনতে কেজিতে আরও ৪০ থেকে ৬০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। তেলাপিয়া কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে এখন ২৫০ থেকে ২৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাঙাশ মাছের দামও বেড়ে ২২০ টাকা কেজিতে উঠেছে।
নিউ মার্কেটের মাছ বিক্রেতা মো. হানিফ বলেন, “বাজারে মাছের সরবরাহ কিছুটা কম। এর মধ্যে রোজার মাস চলছে। সব মিলিয়ে চাহিদা বেশি থাকায় দাম বেড়েছে।”
মুরগির বাজারেও দামের ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে ২৮০ টাকায় বিক্রি হওয়া সোনালি ও লেয়ার মুরগি এখন ৩০০ টাকা কেজি। তবে ডিমের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। লাল ডিম হালি ১১০ টাকা এবং সাদা ডিম ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
লালবাগের মুরগি ব্যবসায়ী হেলাল বলেন, “মাছের দাম একটু বেশি থাকায় মানুষ মুরগি বেশি কিনছে। এজন্য সব ধরনের মুরগির দাম কিছুটা বেড়েছে। ঈদের আগে দাম আরও বাড়তে পারে।”
অন্যদিকে গরুর মাংসের বাজারে বড় কোনো পরিবর্তন নেই। প্রতি কেজি গরুর মাংস ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায় এবং খাসির মাংস ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নিউমার্কেটে মাছ কিনতে আসা আশরাফুল বলেন, “রোজার মাস শুরু হতেই মাছের বাজারে বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে। এতে আমাদের চাপ বাড়ছে। ২০০ টাকার নিচে কোনো মাছই মিলছে না। সাধারণ পাঙাশও এখন কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
অন্যদিকে সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। টমেটো ৬০ টাকা থেকে কমে ৪০ টাকা, বেগুন ৮০ টাকা থেকে নেমে ৬০ টাকা, লাউ ৬০ টাকা থেকে ৪০ টাকা এবং করলা ১৬০ টাকা থেকে কমে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লেবু ৮০ টাকা থেকে কমে ৫০ টাকা এবং শসা ৮০ টাকা থেকে কমে ৪০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। গাজর কেজি ৫০ টাকা এবং আলু কেজি ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পেঁয়াজের দামও কিছুটা কমেছে। বর্তমানে কেজিপ্রতি পেঁয়াজ ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েকদিন আগেও ছিল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। আদা বিক্রি হচ্ছে কেজি ১২০ টাকায়।
চালের বাজারে বড় কোনো পরিবর্তন নেই। মিনিকেট চাল কেজি ৮০ টাকা, পাইজাম ৫৫ টাকা এবং আটাশ চাল ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মুগ ডালের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ১৭০ টাকায় উঠেছে, যা আগে ছিল ১৬০ টাকা। তবে ছোলা, ডাবলি বুট ও মসুর ডালের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। তেলের বাজারও স্থিতিশীল। সয়াবিন তেল কেজি ২০০ টাকা এবং পাম তেল ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নিত্যপণ্য কিনতে আসা রিমা আক্তার বলেন, ‘কিছু পণ্যের দাম কমলেও মাছ-মাংস এখনো চড়া। রোজার কারণে বিক্রেতারা কয়েক দফা দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন। তার উপর যোগ হয়েছে ঈদ।’
তিনি আরও বলেন, ‘টানা কয়েকদিন বাড়তি দরে বিক্রি করে এখন ঈদ ঘিরেও মাংসের দামে নতুন করে কারসাজি শুরু হয়েছে। এজন্য বাজার তদারকি জোরদার করা উচিৎ।’
স্থানীয় মহল্লার বাজারে দাম বেশি দেখে কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে এসেছেন স্কুল শিক্ষক রাকিব হোসেন। তিনি বলেন, ‘রোজার শুরুর দিন থেকে বাজারে জিনিসপত্রের দাম এখনো খুব একটা কমেনি। এখন আবার ঈদকে সামনে রেখে আরও বাড়ছে সব পণ্যের দাম।’
খুচরা বিক্রেতা আব্দুল হালিম বলেন, ‘রোজার শুরুর দিকের চেয়ে দাম কমছে, ১৫ রোজার পর আরও কমবে।’
এদিকে অলিগলি, বিপণিবিতান, ফুটপাত; সব জায়গায় শুরু হয়ে গেছে ঈদের প্রস্তুতির ব্যস্ততা। ঢাকার প্রধান শপিং এলাকা নিউ মার্কেট, বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স কিংবা চাঁদনি চক মার্কেট; প্রতিটি জায়গায় ক্রেতাদের ভিড় ধীরে ধীরে বাড়ছে। ইফতারের পর দোকানগুলোয় আলো ঝলমল পরিবেশ। পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসছেন অনেকে। কেউ কিনছেন বাচ্চাদের পোশাক, কেউ নিজের পাঞ্জাবি বা শাড়ি বেছে নিচ্ছেন সময় নিয়ে।
মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর হিসাবটা একটু অন্যরকম। মাসের বাজেট সামলে ঈদের কেনাকাটা করতে হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, আগেভাগে শপিং শুরু করলে তুলনামূলক কম ভিড় আর একটু কম দামে ভালো জিনিস পাওয়া যায়।
নিম্নআয়ের মানুষদের কেউ কেউ আবার ঈদের বোনাস বা বেতন হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তাদের শপিং জমে উঠবে রোজার মাঝামাঝি থেকে শেষ দশকে।
কেকে/এসএ