আন্তর্জাতিক নারী দিবস মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। নারী মানেই শুধু একটি লিঙ্গ পরিচয় নয়; নারী মানে সৃষ্টি, মমতা, সংগ্রাম ও সম্ভাবনার এক অপার উৎস। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি অগ্রযাত্রার পেছনে নারীর অবদান নিঃশব্দ অথচ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে নারী তার সাহস, মেধা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে মানবসমাজকে সমৃদ্ধ করেছে। এই উপলব্ধি থেকেই প্রতি বছর ৮ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস।
নারী দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীর ভাবনা তুলে ধরছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মুহাম্মাদ রিয়াদ উদ্দিন।
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক
আমাদের দেশে ধর্ষণের বিচার হলো ধর্ষিতাকে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে। অথচ আমরা কি জানি—আইনত ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড—এটা হয়তো দেশের অনেক মানুষ জানেও না। আর জানলেও আইন কার্যকর না থাকায় বেড়েই চলেছে ধর্ষণ। নারীর প্রতি সহিংসতার চরম রূপটি কেবল ধর্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং অপরাধ আড়াল করতে ভুক্তভোগীকে হত্যা করার ঘটনা এখন এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। যেখানে ধর্ষণের বিচার হয় না, সেখানে নারী নির্যাতন, সাইবার বুলিং ও যৌন হয়রানির বিচার পাওয়া তো বিলাসিতা।
নারীর ওপর নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ন্যায়বিচার দাবি করা যেন কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানানো আর রাজপথে বিক্ষোভ প্রদর্শনের মধ্যেই সীমিত হয়ে আছে। বিচারহীনতা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, সমাজে নারীরা নির্যাতিত হয়ে কারো কাছে বলার সাহস পায় না। ধর্ষণকারীর চেয়েও সমাজে বেশি অপমান, অবহেলা আর লাঞ্ছনার শিকার হয় ধর্ষিতা নিজে। বিচারহীনতায় নারীর নীরব আর্তনাদ দেখার কেউ নেই। নির্যাতিত নারীর আর্তনাদ আর চারদেয়ালে বন্দি রাখা যাবে না, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। নারী দিবস পালন কেবল সভা সেমিনারে সীমাবদ্ধ না রেখে নারী হত্যা, ধর্ষণ আর নির্যাতনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ন্যায়বিচারের মাধ্যমে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক নারী দিবসের অন্যতম লক্ষ্য।
নুসরাত সুলতানা
শিক্ষার্থী, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
নারী সম্মান হোক মায়ের সমান
প্রতিটি জীবের প্রথম উষ্ণতা, আশ্রয়স্থল মায়ের কোলেই। যার গর্ভে চড়ে ধরীত্রিতে আসি, তার হাত দুটো ধরেই প্রথম সেখানে পদচারণ করি। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো মানব সভ্যতার জন্মদাত্রী 'নারী ও মা' যুগের পর যুগ এই সভ্যতায় অবহেলিত, লাঞ্ছিত। দীর্ঘ অবহেলার সূত্র ধরেই জন্ম নিয়েছে একটি প্রতীকি দিন–নারী দিবস বা ইন্টারন্যাশনাল ওয়েমেন্স ডে! যেটি শুধু পালনের জন্য নয়, আত্মসমালোচনা ও নতুন অঙ্গীকারের দিন। নারীর ইতিহাস সব যুগেই ছিল সংগ্রামের ইতিহাস। কখনো অধিকার আদায়ের লড়াই, কখনো নিজের স্বপ্ন কে দমিয়ে রাখার যুদ্ধ, কখনো বা আত্মরক্ষার মতো কঠিন সময়ের মোকাবেলা করতে হয়েছে।
শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, সমাজের নেতৃত্ব সকল ক্ষেত্রেই নারীকে পুরুষের চেয়ে বরাবরই দ্বিগুণ বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। সভ্য সমাজের পরিচয় বহন করে সেই সমাজ যে সমাজে নারীর স্বাধীনতা, অধিকার ও মর্যাদাকে সম্মান করা হয় এবং সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে উন্নত ও মানবিক হয়ে ওঠে। তাই নারীর সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠা শুধু নারীর বিষয় নয়; এটি মানবতার বিষয়, ন্যায়বিচারের বিষয়।
তাই আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমাদের প্রত্যাশা কেবল নারী দিবস পালন ও শুভেচ্ছা বিনিময়ে নারীর গুরুত্ব, সম্মান, অধিকার সীমাবদ্ধ না থেকে এই দিবসটি আসল কার্যকারিতা, অর্থ প্রতফলিত হোক। নারীকে সম্মান, সমান মর্যাদা ও সুযোগ দেওয়া অর্থই আগামী প্রজন্ম কে উন্নত করা, সভ্যতার কারিগর তৈরি করা। নারী সম্মান হোক মায়ের সমান।
মোনতাহিনা জান্নাত স্বর্ণা
শিক্ষার্থী, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
নারী দিবস হোক সমতার পথে নতুন অঙ্গীকার
প্রতি বছর ৮ মার্চ পালিত হয় ইন্টারন্যাশনাল ওয়েমেন্স ডে। এই দিনটি নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সমতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে আনে। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে নারী দিবস আমার কাছে কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়, এটি আত্মসম্মান, সচেতনতা ও সম্ভাবনার প্রতীক। নারীর সমতার কথা বলা সহজ, কিন্তু সেই ভাবনাকে জীবনে ধারণ করাই আসল চ্যালেঞ্জ। এতো এতো প্রতিকূলতার মধ্যেও নারীকে থামানো যায়নি। বরং প্রতিটি বাধা, প্রতিবন্ধকতাকে সমানভাবেই অতিক্রম করে সে প্রমাণ করেছে—সম্ভাবনার কোনো লিঙ্গ নেই, আছে শুধু সাহস ও মনোবল। বিশ্ব নারী দিবস আমাদের স্মরণ করায়, নারীর প্রতি সম্মান ও সমতা এখনো পুরোপুরি সম্পূর্ণ হয়নি।
নারীবাদ কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ট্রেন্ড নয় এটি শেখা, প্রশ্ন করা এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে ভাবার এক নিরন্তর প্রক্রিয়া। উচ্চশিক্ষা সেই ভাবনার দিগন্তকে প্রসারিত করে। তবু বাস্তবতার মাটিতে এখনো বহু নারী বৈষম্যের মুখোমুখি হয়। তাই নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সচেতনতা, শিক্ষা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই সমতার পথে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি।
অতসী অরণ্য
শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
নারীর প্রতি সাইবার বুলিং বন্ধ হোক
সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে, প্রযুক্তির ব্যবহার যত আধুনিক হচ্ছে, নারীর নিরাপত্তা তত হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। যেমন কোনো নারী যদি পরিচিত মুখ হয়, কিংবা রাজনৈতিক কোনো দলের সঙ্গে জড়িত হয়, সেক্ষেত্রে তাকে নানাভাবে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হতে হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন মানুষের হাতের মুঠোয় এমনভাবে চলে আসছে, যেক্ষেত্রে কেউ ইচ্ছা করলেই এখন এটির অপব্যবহার করতে পারে। আর এই অপব্যবহারের সুযোগেই একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নারীর দুর্বল জায়গাগুলোয় আঘাত করতে পারছে।
এর ফলস্বরূপ দেখতে পাই, কোনো নারী এখন সম্মুখসারিতে যেতে চায় না, পরিচিত হতে চায় না, কিংবা রাজনীতি-সচেতন হলেও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হতে চায় না। নারী তার সাহসিকতার জন্য যেতে চাইলেও পরিবারের কাছে বাধার সম্মুখীন হয়। দিনশেষে এ ধরনের হেনস্তা শুধু ব্যক্তিজীবনের ওপর প্রভাব ফেলে না, পরিবারের ওপরও ফেলে। কিন্তু আমরা এই জিনিসগুলো নিয়ে খুব কম কথা বলি, খুব বেশি সচেতনতা দেখাই না। তার পেছনে আমি দুটি কারণ দেখি; তা হলো—‘আমার সঙ্গে তো হচ্ছে না, কাজেই আমি চুপ থাকি এবং আমি একা কথা বলে কী এমন পরিবর্তন করতে পারব?’ তাই আমাদের এই জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করা উচিত। নারী দিবসে এটুকুই প্রত্যাশা রাখব—শুধু একটি দিবসই উদ্যাপন না করে প্রতিনিয়ত নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। এটা নিছক কোনো স্বপ্ন নয়, একজন নারীর মৌলিক অধিকার।
খাদিজা আফরিন মিতু
শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
কেকে/এসএ