মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
নয়া বন্দোবস্তের নামে চলছে পুরোনো ধারা
শিপার মাহমুদ
প্রকাশ: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ৯:২৬ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের অঙ্গীকার নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তরুণ নেতৃত্বের এ উদ্যোগ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া জাগায়। অনেকেই মনে করেছিলেন— দীর্ঘদিনের প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরে এসে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে উঠবে, যা দেশের রাজনীতিতে নতুন নির্দেশনা দেবে।

তবে সময়ের ব্যবধানে সেই প্রত্যাশা অনেকটাই ম্লান হয়ে যেতে শুরু করে। দলটির কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড জনমনে প্রশ্নের জন্ম দেয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কৌশল ও আদর্শিক অবস্থান নিয়ে দলটির অভ্যন্তরে মতবিরোধ বাড়তে থাকে। আত্মপ্রকাশের কয়েক মাসের মধ্যেই সেই মতবিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। দলটির মধ্যে দেখা দেয় ফাটল। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলটির নেতাকর্মীদের পদত্যাগের হিড়িক পড়ে। শুরু হয় বিভক্তি-ভাঙন।

জুলাইয়ের আন্দোলনের একমাত্র প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নিয়ে উঠতে থাকে একের পর এক অভিযোগ। সারা দেশে চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। যার ফলে কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়া সব কমিটি স্থগিত করা হয়।

এ বিভাজনের প্রভাব পড়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদ নির্বাচনে। তাদের বিরোধকে কাজে লাগিয়ে সুবিধা নেয় জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির। ক্যাম্পাসগুলোতে একচেটিয়া বিজয় লাভ করে সংগঠনটি-সমর্থিত প্যানেল। অন্যদিকে নির্বাচনে ভরাডুবি হয় গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন— বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমর্থিত প্যানেলের।

এদিকে এনসিপির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম— ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ (আপ বাংলাদেশ)। এই প্ল্যাটফর্ম গঠনের মধ্য দিয়ে বিভক্ত হয় জুলাই আন্দোলনের ছাত্ররাজনীতি।

এর কিছুদিন পর জুলাইয়ের আন্দোলন থেকে উঠে আসা আরেকটি শক্তির সমন্বয়ে দেশের রাজনীতিতে যুক্ত হয় নতুন প্ল্যাটফর্ম— নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)। ‘জনগণের শক্তি, আগামীর মুক্তি’ স্লোগান সামনে রেখে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে সংগঠনটি।

তবে এসব প্ল্যাটফর্মের বাইরেও নতুন করে আলোচনায় এসেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম পরিচিত মুখ এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের নেতৃত্বে গঠিত নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ ‘অল্টারনেটিভস’। এই প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এখনো তার দৃশ্যমান কিছুই দেখা যায়নি। বিশেষ করে ছাত্রনেতাদের বিভক্তি এবং পরস্পরবিরোধী অবস্থান জনগণের প্রত্যাশাকে ব্যাপকভাবে আহত করেছে। তারা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বললেও নিজেরাই পুরোনো ধারার রাজনীতির পথেই হাঁটছেন। যা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোট তাদের আদর্শকে বিতর্কের মুখে ফেলেছে। এ সময় এনসিপির বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা দলত্যাগ করেন।

জানতে চাইলে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন খোলা কাগজকে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতাদের আলাদা প্ল্যাটফর্ম— এটাকে নেগেটিভভাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং আমরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। আমি মনে করি— রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির যে অপূর্ণতা রয়েছে, নতুন এসব প্ল্যাটফর্ম তা এগিয়ে নিয়ে যাবে।

এনসিপির নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে— এ বিষয়টি নিয়ে (নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত) আমি একেবারেই সন্তুষ্ট নই। তবে রাজনীতিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে— এটা বলা যায়।

এনপিএর কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য বাকী বিল্লাহ খোলা কাগজকে বলেন, জুলাই আন্দোলনের যারা বিভিন্নভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের মধ্যে নানা মত ও চিন্তার মানুষ রয়েছে। ফলে এখানে বিভাজন হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ ছাড়া আন্দোলনের বড় একটি অংশ ছিল ছাত্র; যার ফলে আমরা যারা ছাত্র নই, কিন্তু গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানাভাবে সরব ছিলাম— তাদেরও রাজনৈতিক চিন্তা বিকাশে বিকল্প একটি প্ল্যাটফর্ম জরুরি ছিল।

এর মধ্যে আবার যখন তরুণদের রাজনৈতিক দল এনসিপি জামায়াতের মধ্যে পুরোপুরি ঢুকে গেল, তখন আসলে তাদের সঙ্গে যুক্ত থাকারও সুযোগ নেই।

জুলাই-পরবর্তী রাজনীতি নিয়ে সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের সঙ্গে এনপিএর কোনো বোঝাপড়া কিংবা একই প্ল্যাটফর্মে থাকার ব্যাপারে কোনো আলাপ হয়েছিল কি না— জানতে চাইলে বাকী বিল্লাহ বলেন, মাহফুজ আলমের সঙ্গে আমাদের এক ধরনের আলাপ-আলোচনা হয়েছিল। তবে আমাদের সঙ্গে যারা আছে, তাদের অনেকের মধ্যেই তাকে নিয়ে কিছুটা আস্থার সংকট দেখা দেয়, আপত্তিও ছিল। যদিও তাসনুভা জাবিন কিংবা তাসনিম জারাকে নিয়ে কোনো সমস্যা ছিল না।

এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ছাত্রনেতাদের আচরণ এবং উপদেষ্টা দায়িত্বে থাকাকালে মব ভায়োলেন্স ও মাজার ভাঙার বিরুদ্ধে তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি। ফলে শঙ্কা জেগেছে— আমরা যে রাজনীতিটা করতে চাই, সেটা মাহফুজ আলমদের সঙ্গে করা সম্ভব কি না।

যদিও আমি মনে করি— জুলাই আন্দোলনের সব শক্তিকে এক জায়গায় আসা উচিত। কিন্তু সবাই তো সেটা মনে করে না, করবেও না।

নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই আলাপটা যারা করছে তারা নিজেরাই পুরোনো রাজনীতির চেয়ে আরও একধাপ এগিয়ে আছে। এটা এক ধরনের রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি। নতুন বন্দোবস্তের আলাপ করা হলেও বাস্তবে সেটা অনুপস্থিত। বরং যা হচ্ছে— পপুলিস্ট পলিটিক্স। যেটা জনগণ সহজেই গ্রহণ করে। এর বাইরে আর কিছুই না।

এদিকে আগে থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল— জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যুক্ত হচ্ছেন না সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। যা বিভিন্ন সময়ে তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কয়েক মাস আগে তিনি এক ফেসবুক পোস্টেও এমনটাই তুলে ধরেন। পোস্টটিতে নাগরিক পার্টির সঙ্গে সম্পর্কের রসায়ন, আশা-নিরাশা ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। একই সঙ্গে বিকল্প ও মধ্যপন্থি তরুণ বা জুলাই শক্তির উত্থান অত্যাসন্ন বলেও উল্লেখ করেন।

‘আমার রাজনৈতিক অবস্থান’ শিরোনামে ফেসবুক পোস্টটিতে মাহফুজ আলম লিখেছেন, নাগরিক কমিটি ও এনসিপি জুলাইয়ের সম্মুখসারির নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছিল। এ দুটি সংগঠনে আমার জুলাই সহযোদ্ধারা থাকায় গত দেড় বছর আমি চাহিবামাত্র তাদের পরামর্শ, নির্দেশনা এবং নীতিগত জায়গায় সহযোগিতা করেছি।

তিনি লিখেছেন, আমার অবস্থান স্পষ্ট— নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক লড়াই, সামাজিক ফ্যাসিবাদ মোকাবিলা, রিকনসিলিয়েশন, দায়-দরদের সমাজ— এসব বিষয় আমি বারবার বলেছি। যেগুলো আমার জুলাই সহযোদ্ধারাও উক্ত দুটি সংগঠন থেকে বলেছেন।

কিন্তু তারা কি এগুলো ধারণ করতেন? এনসিপিকে একটি ‘বিগ জুলাই আমব্রেলা’ আকারে স্বতন্ত্র উপায়ে দাঁড় করানোর জন্য আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু অনেক কারণেই সেটা সম্ভব হয়নি।

মাহফুজ আলম লিখেছেন, বিদ্যমান বাস্তবতায় আমার জুলাই সহযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান, স্নেহ এবং বন্ধুত্ব মুছে যাবে না। কিন্তু আমি এ এনসিপির অংশ হচ্ছি না। আমাকে জামায়াত-এনসিপি জোট থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়নি— এটা সত্য নয়। তবে ঢাকার কোনো একটি আসনে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থী হওয়ার চেয়ে আমার দীর্ঘদিনের অবস্থান ধরে রাখা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  নয়া বন্দোবস্ত   পুরোনো ধারা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close