বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থার উদ্বেগের মাঝেও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশাল স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছেন প্রবাসীরা। আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের জোয়ার শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের প্রথম সাত দিনেই দেশে এসেছে ১.০৬ বিলিয়ন (১০৬ কোটি ৯০ লাখ) মার্কিন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে সপ্তাহভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রে এক অনন্য মাইলফলক।
যুদ্ধের ডামাডোল আর জ্বালানি সংকটের উদ্বেগের মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ যেন তপ্ত রোদে শীতল বৃষ্টির মতো। ঈদকে সামনে রেখে প্রবাসীদের এই ত্যাগ ও অবদান দেশের অর্থনীতিকে কেবল সচলই রাখছে না, বরং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ঈদ ঘিরে যেসব দেশে বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি আছেন, সেগুলো থেকে এখন বেশি করে রেমিট্যান্স তথা প্রবাসী আয় আসছে। শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারি মাসে ৩ দশমিক ০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, চলতি মার্চের প্রথম সপ্তাহে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১০৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার। আর গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ৭৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অর্থাৎ বছর ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের ১ তারিখ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত প্রবাসীরা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কোটি ২৭ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ৭৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এ বছরের প্রথম সপ্তাহে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ২৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্সের গতি ছিল ঊর্ধ্বমুখী। অর্থবছরের প্রথম আট মাস সাত দিনেই (জুলাই থেকে শুক্রবার (৭ মার্চ)) দেশে মোট ২ হাজার ৩৫২ কোটি ৩০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ২২.১০ শতাংশ।
ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই উল্লম্ফনের প্রধান কারণ হলো আসন্ন ঈদুল ফিতর। ঐতিহ্যগতভাবেই ঈদের আগে প্রবাসীরা তাদের পরিবারের কেনাকাটা ও উৎসবের খরচ মেটাতে বেশি পরিমাণে অর্থ পাঠান। এবার সেই প্রবাহ আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
প্রবাসী আয় বাড়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত কয়েক মাসে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। পাশাপাশি রেমিট্যান্সের ওপর সরকারের ঘোষিত আর্থিক প্রণোদনাও প্রবাসীদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করছে। এ ছাড়া দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে স্বজনদের আর্থিক চাপ কমাতে অনেক প্রবাসী আগের তুলনায় বেশি অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রেমিট্যান্সের এই ‘সুবাতাস’ দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা চিন্তার ভাঁজ রয়েছে নীতিনির্ধারকদের কপালে। সোমবার (৯ মার্চ) সকালে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে রেশনিংয়ের কথা জানিয়েছেন। এই যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় বা ছড়িয়ে পড়ে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে রেমিট্যান্সেও।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে ঘিরে প্রবাসীরা দেশে থাকা তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে প্রচুর পরিমাণে অর্থ পাঠাচ্ছেন। এতেই বাড়ছে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত চলমান থাকলে রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে।
ফেব্রুয়ারি মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ১৯.৫ শতাংশ : প্রবাসী বাংলাদেশিরা ফেব্রুয়ারি মাসে ৩ দশমিক ০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসীরা গত বছরের একই মাসে ২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৮ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্স প্রবাহে চাঙাভাব থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে উল্লেখ করেছেন ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা।
এক বছরে প্রবাসী আয় ৩২ বিলিয়ন ডলার : রেমিট্যান্স প্রবাহের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫ সালে প্রবাসী আয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রবাসীরা ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণের রেকর্ড।
বৈশ্বিক নানা সংকটের মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করতে বড় ভূমিকা রাখছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতি স্বস্তিতে আছে।
আগের বছর ২০২৪ সালে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৮ শতাংশ। বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরেও রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল অনেক বেশি। এ মাসে প্রবাসীরা ৩২৩ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন। একক মাসে আসা এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। ২০২৫ সালের মার্চে সর্বোচ্চ ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন ২৬৪ কোটি ডলার। এক বছর পর সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২৩ কোটি ডলারে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ডিসেম্বর মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৫৯ কোটি ডলার বা প্রায় ২২ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রধান অবদান রাখে রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় ও বিদেশি ঋণ। এর মধ্যে প্রবাসী আয় সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, কারণ এটি সরাসরি ডলার আনে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, হুন্ডি প্রতিরোধে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বিত উদ্যোগ, প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা অব্যাহত রাখা এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের সেবা সহজ হওয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ আগের চেয়ে বেড়েছে। এর ফলে দেশের রিজার্ভ পরিস্থিতিতে স্বস্তি ফিরেছে।
কেকে/এলএ