মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
নিরাপত্তাহীনতায় গৃহকর্মীরা
শিপার মাহমুদ
প্রকাশ: বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬, ৯:১২ এএম আপডেট: ১১.০৩.২০২৬ ৯:২৩ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

দিন যত যাচ্ছে, দেশে গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা যেন ক্রমেই বাড়ছে। বিভিন্ন গবেষণা ও মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য বলছে, দেশে প্রায় ২৫ লাখ গৃহশ্রমিক কাজ করেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই নারী। শহরের বাসাবাড়িতে স্থায়ীভাবে কাজ করা গৃহকর্মীদের বড় একটি অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক—প্রায় ৮০ শতাংশই শিশু বা কিশোরী। ফলে এ খাতে শ্রমের পাশাপাশি শিশু নির্যাতনের ঝুঁকিও মারাত্মকভাবে রয়ে গেছে।


বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্যমতে, ২০১১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত গত ১৫ বছরে দেশে গৃহশ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় অন্তত ৭১৬ জন হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ গৃহকর্মী শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও অভিযোগ দায়ের করেন মাত্র ৮ শতাংশ। ফলে অধিকাংশ নির্যাতনের ঘটনা আইনি বিচারের বাইরে থেকেই যায়।


বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের শ্রম আইনে এখনো গৃহকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে তাদের জন্য নেই প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, নেই শ্রমিক হিসেবে আইনি সুরক্ষা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গৃহকর্তা ও গৃহকর্মীর মধ্যে কোনো লিখিত চুক্তি থাকে না।


একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৯৫ শতাংশ গৃহকর্মীর ক্ষেত্রেই নিয়োগের সময় কোনো চুক্তিপত্র করা হয় না। এতে করে নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও দায় নির্ধারণ বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জটিল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লিখিত চুক্তি চালুর দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।


সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার বনানী এলাকায় একটি আবাসিক ভবনের ছাদ থেকে পড়ে পিংকি নামে ১৫ বছর বয়সী এক গৃহকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। সে সুনামগঞ্জের বাসিন্দা এবং বনানীর একটি বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত। গত রোববার বিকেল তিনটার দিকে বনানী ১৩/এ সড়কের ডি ব্লকের ৭৯ নম্বর বাড়ির নিচ থেকে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে।


বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মেহেদী হাসান জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে সে ভবনের ছাদ থেকে পড়ে গেছে। তবে এটি আত্মহত্যা নাকি তাকে ফেলে দেওয়া হয়েছে—তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পিংকি যে বাসায় কাজ করত, সেই বাসার গৃহকর্তা রাকিবুল হাসান স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে সেখানে বসবাস করেন।


ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই অভিযোগ করেন, মেয়েটিকে নির্যাতন করে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা বাসার ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।


এর আগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাফিকুর রহমানের বাসায় নির্যাতনের শিকার হয় ১১ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মী। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।


জানা যায়, রাজধানীর উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত ওই বাসায় শিশুটি গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত। বাসাটির নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীর এক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে শিশুটিকে কাজে নিয়ে আসে। পরিবারের বিভিন্ন খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গত বছরের জুন মাসে তাকে সেখানে নিয়োগ দেওয়া হয়।


শিশুটির বাবা গোলাম মোস্তফা জানান, গত বছরের ২ নভেম্বর তিনি মেয়েকে দেখতে ওই বাসায় যান। এরপর দীর্ঘ সময় তাকে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। পরে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি বীথি নামে এক ব্যক্তি ফোন করে জানান, তার মেয়ে অসুস্থ। সেদিন সন্ধ্যায় মেয়েকে বাসা থেকে নিয়ে আসার পর তিনি দেখেন, মেয়ের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।


পরে তাকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে শিশুটি বাবাকে জানায়, তাকে নিয়মিত মারধর করা হতো এবং গরম খুন্তি দিয়ে শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। এ ঘটনায় গত ১ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করেন শিশুটির বাবা।


আরেক ঘটনায় শিশু গৃহকর্মীকে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়ার অভিযোগে জাহিদুল ইসলাম নামে এক চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নির্যাতনের শিকার সামিয়া আক্তার পাবনা জেলার আমিন থানার সিন্দুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা। প্রায় ১১ মাস ধরে সে সাভারের আশুলিয়া এলাকায় ওই চিকিৎসকের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছিল। অভিযুক্ত জাহিদুল ইসলাম সাভারের গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন বলে জানা গেছে।


মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এসব ঘটনা কেবল সামনে আসা কয়েকটি উদাহরণ। বাস্তবে গৃহকর্মী নির্যাতনের অনেক ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না। সামাজিক অবস্থান, দারিদ্র্য ও আইনি জটিলতার কারণে অধিকাংশ ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবার অভিযোগ করতে ভয় পায়।


বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সালমা আলী বলেন, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান হলেও বাস্তবে গৃহকর্মীরা এখনো ন্যায্য বিচার পেতে বড় বাধার মুখে পড়েন। তার ভাষায়, গৃহকর্মীদের ওপর যে পরিমাণ নির্যাতন হয়, তার একটি বড় অংশ মামলার পর্যায়ে পৌঁছায় না। আবার যেসব ক্ষেত্রে মামলা হয়, সেখানেও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা যায় না।


তিনি বলেন, অধিকাংশ গৃহকর্মী দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া পরিবার থেকে আসে। অনেকেই নিয়মিত ছোটখাটো নির্যাতনের শিকার হলেও তা প্রকাশ করেন না। কেউ কেউ পরিবারের কাছে বলতে লজ্জা পান, আবার অনেকে ভয় পান কাজ হারানোর। ফলে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিকভাবেও তারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন নির্যাতন সহ্য করতে করতে অনেক সময় এটি তাদের কাছে স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়।


সালমা আলীর মতে, শুধু নতুন আইন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বড় ধরনের নির্যাতনের ক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে নির্যাতনকারীদের বিচারের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে। বিচারব্যবস্থার জটিলতা, মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং আদালতে মামলার অতিরিক্ত চাপ এর বড় কারণ। অনেক মামলার নিষ্পত্তি হতে আট থেকে দশ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।


তিনি আরও বলেন, গৃহকর্মী সুরক্ষায় যে মনিটরিং সেল নীতিমালা রয়েছে, তা বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ নীতিমালায় সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ড ও থানাভিত্তিক পর্যায়ে মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সচেতনতা ও নজরদারি—দুটিরই বড় ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ও পর্যাপ্ত নয়।


কেকে/এলএ



আরও সংবাদ   বিষয়:  গৃহকর্মী   নিরাপত্তাহীনতা   রাজধানী  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close