উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বাড়তে থাকা ঋণের চাপ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতার মতো বড় তিনটি চ্যালেঞ্জের মধ্যেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে বিদ্যমান এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও নতুন সরকারের জন্য অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পথে ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে গবেষণা সংস্থা সিপিডি।
মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সংস্থাটির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সুপারিশসমূহ’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতি একাধিক কাঠামোগত ও নীতিগত চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণের গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর, বাজেট বাস্তবায়নে রয়েছে নানা দুর্বলতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বজায় আছে।
এর পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এবং আর্থিক খাতের নানা জটিলতা অর্থনীতির গতি শ্লথ করে দিচ্ছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়াকেও তিনি উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেন।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রক্রিয়াও সামনে একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সুপরিকল্পিত নীতি গ্রহণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতসহ বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে গেলে তা মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। তাই এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
সিপিডির সুপারিশ অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি এই চারটি খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটি বলেছে, অতীতে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় অতিরিক্ত আশাবাদী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে আগামী বাজেটে বাস্তবসম্মত রাজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি। পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান কর কাঠামো পুনর্বিবেচনা, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় জরুরি তহবিল গঠন এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কাটাতে সরবরাহমুখী নীতি গ্রহণেরও পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ হারে রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা বাস্তবে সম্ভব নয়।
তিনি জানান, বর্তমানে রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক খাতের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বিপরীতে ব্যাংক বহির্ভূত ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে আর্থিক খাতে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহও কমে যাচ্ছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে, কারণ বাংলাদেশের জ্বালানির বড় অংশ ওই অঞ্চল থেকে আমদানি করা হয়।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নেও ধীর গতি দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ২০ দশমিক ৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আর চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে, বিপরীতে জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর কমানোর সুপারিশ করেছে সিপিডি। সৌর প্যানেল, বায়ু টারবাইন এবং ব্যাটারি স্টোরেজের মতো পণ্যের ওপর বিদ্যমান শুল্ক ও কর কমালে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়বে বলে মনে করছে সংস্থাটি। এ কারণে এসব পণ্যের ওপর কাস্টমস ডিউটি সর্বোচ্চ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সিপিডি। প্রস্তাব অনুযায়ী সিগারেট, বিড়ি, জর্দা ও গুলের ওপর স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ এবং ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া জর্দা ও গুলের ওপর প্রতি গ্রামে ৬ টাকা নির্দিষ্ট আবগারি শুল্ক আরোপেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং খাল পুনঃখননের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ শীর্ষক একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। এ ছাড়া আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ ধরনের পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে।
ড. ফাহমিদা বলেন, এসব পণ্য থেকে সরকারের বছরে প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব আসে। চুক্তি কার্যকর হলে সরকার এই রাজস্ব আয় হারাতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়া ডব্লিউটিও নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এর ফলে ডব্লিউটিওর আওতাভুক্ত অন্যান্য সদস্য দেশকেও একই সুবিধা দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কেনার শর্ত থাকায় সরকারের ব্যয়ও বাড়তে পারে। এ কারণে চুক্তিটির রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের ওপর প্রভাব সরকারকে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা দরকার।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে করা বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে বছরে সরকারের প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে চুক্তির কারণে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতাভুক্ত অন্যান্য দেশকেও একই ধরনের সুবিধা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ওই চুক্তির বিষয়বস্তু উন্মুক্ত করা প্রয়োজন, কারণ এতে বেশ কিছু আর্থিক ঝুঁকির বিষয় রয়েছে।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের বড় অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বেসরকারি খাতকে যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে উৎসাহিত করতে হয়, তাহলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে। না হলে তারা কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই পণ্য আমদানি করবে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। এ ছাড়া তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, কোথা থেকে পণ্য কেনা যাবে বা যাবে না- এ ধরনের বিষয়ও এতে জড়িত, যা দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও প্রভাব ফেলতে পারে।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার পর এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ চাইলে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে।
কেকে/ এমএস