দেশজুড়ে ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে ছিনতাই। রাস্তাঘাট বা অলিগলি, রাত হলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে জনমনে।
ছিনতাইকারীর ছোবল থেকে নিরাপদ নন কেউ। গত তিন দিনে অসহায় ভিক্ষুক, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পুলিশ সদস্য ছিনতাইয়ের শিকার হন। ঈদকে সামনে রেখে এ অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।
গত সোমবার সকালে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কেএম মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠ এলাকায় ৬৫ বছর বয়সি রাবেয়া বেগম ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হন। জীবিকার তাগিদে ভিক্ষাবৃত্তি করা এই বৃদ্ধার ওপর নৃশংস হামলার ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ এখনও দেখা যায়নি।
এ ঘটনা সম্পর্কে পাথরঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মংচেনলা মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে বলেন, ঘটনার পর ওই বৃদ্ধাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে মামলা করাও সম্ভব হয়নি। ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করতে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করা হয়েছে, তবে সেখান থেকে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাস্তবে শুধু রাবেয়া বেগমের ঘটনাই নয়, প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য মানুষ ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে, অনেক ঘটনাই পুলিশের খাতায় ওঠে না। ফলে অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে, আর নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে ছিনতাইচক্র।
পুলিশ সূত্র জানায়, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে ছিনতাইকারীরা। ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নগরজুড়ে বেড়েছে কেনাকাটার ভিড়, আর সেই সুযোগেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, অপরাধ দমনে নিয়মিত টহলের ঘাটতি, দ্রুত জামিনে বের হয়ে আসা অপরাধী, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারির অভাব এবং নগর এলাকায় পর্যাপ্ত প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় ছিনতাই নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ছিনতাই প্রতিরোধের বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি-মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধে ছিনতাইকারীদের তালিকা ধরে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগরের যেসব এলাকায় ছিনতাই বেশি ঘটে, সেসব এলাকার গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে গোয়েন্দা পুলিশ ও থানা পুলিশ নিয়মিত টহল দিচ্ছে।
গত শনিবার রাত প্রায় ১১টার দিকে তারাবির নামাজ শেষে হাঁটতে বের হলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন। দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র ঠেকিয়ে তার কাছ থেকে দুটি আইফোন, মানিব্যাগ ও একটি দামি ঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। হামলায় তিনি আহতও হন। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঘটনার পর মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করা হলে পুলিশের অভিযানে দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ছিনতাই হওয়া দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
যদি রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য কিংবা অসহায় মানুষ নিরাপদ না থাকেন, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায় এমন প্রশ্নে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা কিছুটা কমে গেছে। ফলে অপরাধীরা সুযোগ নিচ্ছে। গত কয়েক মাসে হাজার হাজার পেশাদার ছিনতাইকারী জামিনে বের হয়ে পুনরায় অপরাধ জগতে সক্রিয় হয়েছে। মাদকের টাকা জোগাতে অনেক অপরাধী দ্রুত ও সহজ আয়ের পথ হিসেবে ছিনতাইকে বেছে নিচ্ছে।
তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি কিছু পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে অপরাধপ্রবণ এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সিসি ক্যামেরার নজরদারি বৃদ্ধি, সংঘবদ্ধ ছিনতাইচক্র শনাক্ত করে বিশেষ অভিযান এবং দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা। তা না হলে ছিনতাই প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না।
পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারিতে ছিনতাই বেড়েছে, আবার ফেব্রুয়ারিতে কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ১৩২টি, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ১৬৩টি এবং ফেব্রুয়ারিতে হয়েছে ১৩৭টি। তবে এসব পরিসংখ্যানের বাইরেও কত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য রাখা হয় না। কারণ পরিসংখ্যানটি শুধু মামলা দায়ের হওয়া ঘটনার ভিত্তিতেই তালিকাভুক্ত হয়।
কেকে/ এমএস