পরকালের প্রথম মঞ্জিল হলো কবর। আর সেই কবর থেকেই একের পর এক চুরি হয়ে যাচ্ছে লাশের কঙ্কাল। এ যেন এমন ব্যাধি—মরেও অনিরাপদ লাশ। তাই মৃত্যুর পরও অমানুষের হানার আতঙ্কে স্বজনরা লাশ দাফনে অস্বস্তি বোধ করছেন। আবার কোনো লাশ দাফনের সপ্তাহ যেতে না যেতেই কঙ্কাল চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। অনেক সময় হাড়, মাথার চুলসহ বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
কিন্তু এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নজর নেই বললেই চলে। সম্প্রতি কবর থেকে মানুষের কঙ্কাল তুলে প্রক্রিয়াজাত করার পর বিক্রি করা চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাদের কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত।
সোমবার (১০ মার্চ) ঢাকার তেজগাঁও ও উত্তরা থেকে ৪৭টি খুলি ও মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের হাড়সহ চারজনকে গ্রেপ্তার করার পর পুলিশ জানায়, কবর থেকে তোলা কঙ্কালগুলো তারা ৫-৭ হাজার টাকায় কিনে নিতেন। পরে প্রক্রিয়াজাত করে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করতেন ১৫-২০ হাজার টাকায়। চক্রটি গাজীপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও জামালপুর এলাকা থেকে কঙ্কাল সংগ্রহ করত।
গ্রেপ্তাররা হলেন—কাজী জহুরুল ইসলাম সৌমিক (২৫), আবুল কালাম (৩৯), আসাদুল মুন্সী জসিম এরশাদ (৩২) ও ফয়সাল আহম্মেদ (২৬)। তাদের মধ্যে সৌমিক উত্তরার সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। আর ফয়সাল একই কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ইন্টার্নশিপের জন্য অপেক্ষমাণ।
মঙ্গলবার (১১ মার্চ) দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, কোনো ভুক্তভোগী পরিবার তাদের কাছে অভিযোগ জানালে ডিএনএ প্রোফাইলিং করে কঙ্কালগুলো ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
তেজগাঁও থানা পুলিশ জানায়, সোমবার দুপুরে তেজগাঁওয়ের মনিপুরীপাড়া এলাকার সড়কে চক্রের এক সদস্যের অবস্থানের খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে সৌমিককে আটক করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে একটি মানব কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তেজগাঁও কলেজের সামনে থেকে আবুল কালাম ও আসাদুল মুন্সীকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে দুটি কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।
পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের একটি বাসা থেকে চক্রের হোতা ফয়সালকে আটক করা হয়। এ সময় তার হেফাজত থেকে ৪৪টি খুলিসহ মানব কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।
উপকমিশনার মিজান বলেন, ‘তাদের অনলাইনে হোলসেলিং গ্রুপ আছে। এই গ্রুপে ৭০০ জন কর্মী কাজ করেন, আর গ্রুপ মেম্বার রয়েছে প্রায় ২০ হাজার।’
তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে তারা কঙ্কাল উত্তোলন করে ‘প্রসেস’ করে বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। তাদের মধ্যে কেউ ৫০টি, কেউ ২০-২৫টি কঙ্কাল বিক্রির কথা স্বীকার করেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, আবুল কালামের নামে অন্তত ২১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে কবর থেকে কঙ্কাল চুরির একটি মামলাও আছে। আর গ্রেপ্তার এরশাদের নামে দুটি মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ কর্মকর্তা মিজান বলেন, ‘তারা কঙ্কালগুলো মাঠপর্যায় থেকে ৫-৭ হাজার টাকায় কেনে। পরে ১৫-২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে, যার কাছে যেমন পায়। তারা যে কঙ্কাল বিক্রি করে, বিষয়টি অনেকেই জানে। কেউ কঙ্কাল কিনতে চাইলে বা অনলাইনে বুকিং দিলে তার কাছ থেকে ২-১ সপ্তাহ সময় নেওয়া হয়। এরপর কঙ্কাল ডেলিভারি দেওয়া হয়।’
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, তাদের ক্রেতাদের বেশিরভাগই মেডিকেল শিক্ষার্থী। তবে এর বাইরে আরও কিছু চক্র আছে, যারা কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করে।
উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, ‘যারা কবর থেকে হাড়গুলো তোলে, প্রসেস করে, আবার তাদের কাছ থেকে নিয়ে সুন্দর করে জোড়া লাগায়—এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে চারজনই জড়িত। শেষ পর্যন্ত তারা শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা প্রাথমিকভাবে চারটি জেলার কথা বলেছেন। সাধারণত লাশ কবরস্থ হওয়ার এক বছর পর তারা সেগুলো উত্তোলনের চেষ্টা করেন। প্রথমে কবর পর্যবেক্ষণ করেন। যেসব কবরস্থান বেশি সুরক্ষিত, সেখানে তারা এ কাজ করতে পারেন না। যেখানে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কবর থাকে, অরক্ষিত থাকে, পাহারাদার নেই, লাইটিং বা সিসি ক্যামেরা নেই এবং লোকজনের যাতায়াত কম—সেসব কবর থেকেই কঙ্কাল উত্তোলন করা হয়। পরে কেমিক্যালের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করা হয়।
গ্রেপ্তারদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানান উপকমিশনার ইবনে মিজান।
কেকে/এলএ