ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম এখনো না বাড়লেও ডিলার পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে। ফলে ভোক্তাদের খোলা সয়াবিন ও পাম তেল কিনতে হচ্ছে আগের তুলনায় বেশি দামে। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, উত্তরা ও মহাখালীসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, ৫ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের গায়ে নির্ধারিত মূল্য (এমআরপি) ৯৫৫ টাকা। আগে তারা ডিলারের কাছ থেকে এই তেল কিনতেন প্রায় ৯৩০ টাকায় এবং বিক্রি করতেন ৯৪০ টাকায়। এতে তাদের প্রায় ১০ টাকা লাভ থাকত। তবে গত তিন থেকে চার দিন ধরে ডিলারদের কাছ থেকে একই বোতল কিনতে হচ্ছে প্রায় ৯৫০ টাকায়। ফলে খুচরা বিক্রেতারা ৯৫৫ টাকায় বিক্রি করলেও লাভ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ টাকায়।
বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় খোলা তেলের বাজারেও চাপ বেড়েছে। পাইকারি বাজারে গত চার দিনের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম কেজিপ্রতি প্রায় পাঁচ টাকা বেড়েছে। কারওয়ান বাজারে প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ১৯৮ থেকে ২০০ টাকায়, যা চার দিন আগে ছিল ১৯৩ থেকে ১৯৫ টাকা। একই সময়ে খোলা পাম তেলের দাম বেড়ে কেজিপ্রতি ১৭০ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগে ছিল ১৬৫ টাকা।
খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কিছু কোম্পানি সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে; যাতে দাম বাড়ানো যায়। ফলে ডিলার পর্যায়ে বোতলজাত তেলের দাম বাড়ছে এবং খোলা তেলের বাজারেও তার প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি অনেক ক্রেতা যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন, যা বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
কারওয়ান বাজরের এক ব্যবসায়ী জানান, তীর ব্র্যান্ডের তেলের সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তিনি জানান, গত শনিবার তিনি মাত্র ৫০ কার্টন তেল পেয়েছেন, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে ২০০ থেকে ২৫০ কার্টন পর্যন্ত পেতেন।
তবে আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউ কেউ বলছেন, ডিজেল সংকটের কারণে তেলবাহী পরিবহন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার প্রভাবও কিছুটা পড়েছে বলে দাবি তাদের।
এ বিষয়ে টি কে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আথহার তাসলিম গণমাধ্যমকে জানান, পণ্যবাহী ট্রাকগুলো পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে ভোজ্যতেল সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। যার ফলে কিছু এলাকায় সরবরাহ কমে গেছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, কয়েক দিন ধরে বোতলজাত তেলের সংকট চলছে। এর প্রভাব খোলা তেলের বাজারেও পড়েছে, ফলে দাম কিছুটা বেড়েছে।
অন্যদিকে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ব্যবসায়ীরা প্রায়ই বিভিন্ন অজুহাতে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করেন। তার মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি পরিবহনে সমস্যা হলেও ভোগ্যপণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লাগার কথা। কিন্তু তার আগেই দাম বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এদিকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আব্দুল জলিল জানিয়েছেন, প্রতিদিন বাজারে তদারকি চলছে। দাম বৃদ্ধির বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ তাদের কাছে আসেনি। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে অধিদপ্তরের কয়েকটি টিম বাজারে পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, দেশে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং দাম বাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই।
গত সোমবার সচিবালয়ে ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনা বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সরকারি তথ্য ও বাজার সংশ্লিষ্টদের মতামতের ভিত্তিতে বলা যায়, দেশে ভোজ্যতেলের সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটার কারণেই সাময়িকভাবে কিছু এলাকায় সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে এবং কোথাও কোথাও দাম ওঠানামা করছে।
বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি বাণিজ্য সচিবকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর শেওড়াপাড়া এলাকার বাজারও পরিদর্শন করেন। সেখানে স্বপ্ন ও বেস্ট বাইয়ের মতো বড় দোকানে পর্যাপ্ত ভোজ্যতেল মজুত এবং নির্ধারিত দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
মন্ত্রী বলেন, তিনি বাজারে গিয়েছিলেন একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে, ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, ক্রেতাদের মধ্যে অযথা প্রতিযোগিতামূলক কেনাকাটা কৃত্রিমভাবে বাজারে দাম বাড়াতে পারে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দেয়।
তিনি জানান, বাজার তদারকি আরও জোরদার করতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসনগুলোকে স্থানীয় বাজার পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, অযথা আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ এতে অন্য ভোক্তারা বঞ্চিত হন এবং বাজারে কৃত্রিম সংকটের ধারণা তৈরি হয়। মন্ত্রী আবারও জোর দিয়ে বলেন, ভোজ্যতেলের দাম একটুও বাড়বে না।
কেকে/ এমএস