নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, শোকপ্রস্তাব গ্রহণ এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের তীব্র হট্টগোল, প্রতিবাদ ও ওয়াকআউট—বিভিন্ন নাটকীয়তা ও উত্তেজনার মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশন ছিল বেশ প্রাণবন্ত। প্রথম দিনই অধিবেশনের কক্ষ সরগরম হয়ে উঠতে পারে—গত কয়েক দিন ধরে এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছিল।
বেলা ১১টা ৫ মিনিটে স্পিকারের চেয়ার খালি রেখে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের পর অধিবেশনের শুরুতে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পরে সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্বের জন্য তারেক রহমান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করেন। এ প্রস্তাবে সমর্থন জানান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়া বিরোধীদলীয় উপনেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরও এ প্রস্তাব সমর্থন করেন।
এরপর সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তার সভাপতিত্বে সংসদ সদস্যদের সর্বসম্মতিতে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) স্পিকার এবং ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন।
পরে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরু হওয়ার আগেই বিরোধী দলের তীব্র প্রতিবাদ ও ওয়াকআউটের ঘটনার মধ্য দিয়ে অধিবেশনের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন
প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানসহ সব সংসদ সদস্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান অধিবেশনের সভাপতি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। এ দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়ে সম্মানিত বোধ করছেন বলেও জানান তিনি।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) এবং ডেপুটি স্পিকার হিসেবে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল নির্বাচিত হন। এরপরই মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় কায়সার কামাল ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। পরে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার পর জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে এ শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
খালেদা জিয়াসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুতে সংসদে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। অধিবেশনের দুপুরের সেশনের শুরুতেই স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের পক্ষ থেকে এই শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। বাংলাদেশি নেতাদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে সংসদ। শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে শরীফ ওসমান হাদি, আবরার ফাহাদ এবং ফেলানী খাতুনের নামও। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দুপুরের বিরতি শেষে কার্যসূচির ধারাবাহিকতায় উত্থাপন হয় শোক প্রস্তাব, যা সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়।
গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসের নাম শোকপ্রস্তাবে উত্থাপন করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। এ সময় সরকারি ও বিরোধী দল উভয় পক্ষ থেকে আরও বেশকিছু নাম শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্তির দাবি ওঠে।
নতুন প্রস্তাবিত নাম বিবেচনার কথা জানিয়ে শোকপ্রস্তাবের ওপর আলোচনা শুরু হয়। সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্তির জন্য উত্থাপিত নামগুলোর পক্ষে বক্তব্য উঠে আসে। পরে শোকপ্রস্তাবে উল্লেখিত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং আত্মার শান্তি কামনায় মোনাজাত করা হয়।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের শুরুতেই বিরোধীদের হট্টগোল, ওয়াকআউট
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ওয়াকআউট করেছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের জোটসঙ্গীরা। বৃহস্পতিবার সংবিধান অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ঘোষণা দেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। পরে রাষ্ট্রপতি অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করার পরও তারা বসে থেকে প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে প্রতিবাদ জানান। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ভাষণ দেওয়া শুরু করার পরও বিরোধীরা দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।
এরপর রাষ্ট্রপতি ভাষণ শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা ওয়াক আউট করেন।
প্রথম অধিবেশন হওয়ায় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে উদ্বোধনী অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের।
এ নিয়ে ঘোরতর আপত্তি জানিয়ে আসছিল বিরোধী দল। রাষ্ট্রপতির অভিশংসন ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
কেকে/এলএ