ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার আলোচনায় সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ফলে ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। এর মধ্যে গত এক বছর আগে থেকে সিটি নির্বাচন ঘিরে কাজ শুরু করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। যদিও কে হবেন দলটির মেয়র প্রার্থী, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে কাউন্সিলর পদে অধিকাংশ প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সূত্র বলছে— দলটির আলোচিত নেতারাই মেয়র পদে লড়াই করতে যাচ্ছেন। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে আলোচনায় আছেন— মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দীন, অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান ও এস এম খালিদুজ্জামান। এ তিনজনের মধ্যে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছেন সেলিম উদ্দীন। দলটির একাধিক দায়িত্বশীল জানিয়েছেন— সেলিম উদ্দীনের নাম চূড়ান্ত ঘোষণা না করলেও ইতোমধ্যে দল থেকে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দেওয়া হয়েছে। যার ফলে তিনি ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন এলাকায় কল্যাণমূলক কাজ শুরু করেছেন।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণে আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা-৭ থেকে নির্বাচন করা হাজী এনায়েত উল্লাহ এবং ঢাকা-৬ থেকে নির্বাচন করা ড. আবদুল মান্নান। এ দুজনের বাইরেও জামায়াতের এক শীর্ষ নেতার দক্ষিণে নির্বাচন করার সম্ভাবনা রয়েছে। মহানগর জামায়াতের এক নেতা জানান, জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেননি অথবা অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছেন— জামায়াতের এমন শীর্ষ নেতাদেরও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার ব্যাপারে দলের ভেতরে আলাপ চলছে। এদের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হওয়া ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনিরের নামও আলোচনায় রয়েছে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর জোর প্রস্তুতি দেখা গেলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান প্রস্তুতিতে পিছিয়ে রয়েছে জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে জামায়াতের নেতাকর্মীরা নিয়মিত বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে গেলেও বিএনপির পক্ষ থেকে তেমন কোনো কার্যক্রম এখনো চোখে পড়ছে না। পাশাপাশি দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ত্যাগী কর্মীদের অবমূল্যায়ন এবং চাঁদাবাজির অভিযোগসহ বিভিন্ন কারণে বিএনপির ভেতরে একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আর এ পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে চাইছে জামায়াতে ইসলামী।
এ ছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলও সিটি নির্বাচনে জামায়াতের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে। নির্বাচনে দলটি এককভাবে ৬৮টি আসনে জয় পেয়েছে। জোটগতভাবে ৭৭টি আসন নিয়ে জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য বর্তমানে সংসদের প্রধান বিরোধী জোট। রাজধানীতেও এ জোটের শরিক দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মিলিয়ে ৪৫ শতাংশের বেশি আসনে জয় পেয়েছে। ঢাকা জেলার মোট ২০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫টি রাজধানীতে অবস্থিত এবং এর প্রায় অর্ধেক ভোটই পেয়েছে জামায়াত।
বিশেষ করে ঢাকা উত্তর সিটির বৃহত্তর মিরপুর এলাকার প্রায় পুরো অংশেই জয় পেয়েছে জামায়াত প্রার্থীরা। ফলে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে দলটি এখন থেকেই জোর প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে কথা হলে ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ও প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকার খোলা কাগজকে বলেন— ‘সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রার্থী নিয়ে আমাদের যাচাই-বাছাই চলছে। রুকন ও দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে মতামত নেওয়া হয়েছে এবং মতামতের ফলাফল ইতোমধ্যে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। আমরা এখন সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষায় আছি। কেন্দ্র যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেভাবেই কাজ শুরু করব।’
একই কথা জানিয়েছেন দলটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমন। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, ‘মেয়র পদে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, কেন্দ্র যাচাই-বাছাই করছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে জানা যাবে।’
এদিকে ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও মহানগর উত্তরের তুরাগ থানা জামায়াতে ইসলামী আমির কামরুল হাসান খোলা কাগজকে বলেন, ‘আমাদের প্রার্থী ঠিক করতে রোকন এবং ওয়ার্ড সভাপতি ও সেক্রেটারির পরামর্শ নেওয়া হয়, এরপর মহানগরী ও কেন্দ্রের চিন্তার সমন্বয় হয়। এর মধ্যে দুই জায়গায় পরামর্শ নেওয়া শেষ। মহানগরী থেকে পরামর্শ কেন্দ্রের কাছে পাঠানো হয়েছে। কেন্দ্র এখনো ঢাকা দুই সিটির মেয়র প্রার্থী কে হবে, তা চূড়ান্ত করেনি। তবে বেশির ভাগ ওয়ার্ডের কমিশনার প্রার্থী চূড়ান্ত হয়ে গেছে।’
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার সিটি করপোরেশনগুলোর মেয়রদের পদচ্যুত করে। এতদিন তাদের নিয়োগ দেওয়া প্রশাসকরা মেয়রের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তবে সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিসহ দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে আগের প্রশাসকদের সরিয়ে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। নিয়োগ পাওয়া সবাই বিএনপির প্রভাবশালী নেতা।
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দ্রুততম সময়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেছিলেন।
এর মধ্যেই ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন-১ শাখা থেকে ছয় প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
কেকে/এলএ