নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন মানুষ। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে রাজধানী ছাড়ছেন নগরবাসী। তবে পরিবহন সংকট আর বাড়তি ভাড়ার চাপে ঈদযাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্নের শঙ্কার মধ্যে দূরপাল্লার বাস স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে কি না— তা নিয়ে বাসমালিক ও যাত্রীদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে কোনো কোনো পরিবহন ঈদের আগেই তাদের যাত্রা বাতিল করেছে। তাছাড়া এ ব্যবস্থা ভাড়া নৈরাজ্য উসকে দিতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
তবে ঈদের সময় ফিটনেসবিহীন বাস রং করে সড়কে চলাচল থামাতে এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ করতে জিরো টলারেন্স নীতি দেখানোর কথা বলছে সরকার।
এদিকে, অপ্রতুল পরিবহন ঈদযাত্রার সবচেয়ে বড় সংকট বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কেউ কেউ বলছেন, ঈদযাত্রা উপলক্ষে সুযোগসন্ধানীরা তৎপর রয়েছে। তারা কৃত্রিম জ্বালানি সংকট তৈরি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাইবে।
গতকাল শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া রেলপথে ঈদযাত্রার প্রথম দিনেই রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। মূলত আসন্ন ঈদের ছুটিতে পথের ভোগান্তি ও শেষ মুহূর্তের অতিরিক্ত ভিড় এড়াতেই আগেভাগে বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন অনেকে।
জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসে পরিবারের সদস্যদের তুলে দিতে স্টেশনে এসেছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা আজিজুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘ঈদের আগে ভিড় এড়াতে আজই স্ত্রী ও সন্তানকে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। ট্রেনে যাতায়াত করা নিরাপদ ও আরামদায়ক। একা হলে যে কোনোভাবে যাওয়া যায়।’
সরকারের জিরো টলারেন্স, তবু পরিবহন সংকটের শঙ্কা
ঈদের সময় ফিটনেসবিহীন বাস রং করে সড়কে চলাচল থামাতে জিরো টলারেন্স নীতি দেখানোর কথা বলছে সরকার। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ এবং সড়কের পাশে অস্থায়ী বাজার উচ্ছেদেও সরকার কঠোর হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক ও মহাসড়ক প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ।
এদিকে, অপ্রতুল পরিবহন ঈদযাত্রার সবচেয়ে বড় সংকট বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
জায়গায় জায়গায় সংস্কার পূর্ণরূপে না থাকা সরকারকে কিছুটা হলেও ভাবাচ্ছে বলে সরল স্বীকারোক্তি সড়ক ও মহাসড়ক প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদের। তবে তিনি আশ্বস্ত করেন— ঈদের সময় সড়কে লক্কড়ঝক্কড় বাস চলাচল থামাতে শূন্য সহিষ্ণুতার নীতি দেখাবে সরকার।
সড়ক প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, ‘আমরা বলেছি গ্যারেজগুলোতেও অভিযান চালাতে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি যেন কোনোভাবে রং করে রাস্তায় নামতে না পারে, তা দেখা হবে। রাস্তায় ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হতে পারে— এ ব্যাপারগুলো আমরা হাইওয়ে পুলিশ, জেলা প্রশাসন এবং ডিসিদের অনলাইনের মাধ্যমে অবহিত করেছি। বিভিন্ন জায়গায় সংস্কারের কাজ চলছে, আমরা বলেছি আপাতত রাস্তা থেকে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার জন্য।’
তবে সড়ক প্রস্তুতির চেয়ে যানবাহনের অপ্রতুলতাকে বড় সংকট মনে করেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। সমাধান হিসেবে সরকারি দপ্তরগুলোর যানবাহন যাত্রী বহন করলে কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে বলে মত তাদের।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘কিছু কিছু দেশে যেমন ইন্দোনেশিয়ায় তাদের জনসংখ্যাও ঢাকার মতো। সে দেশেও উৎসবে তাদের শহর থেকে লাখ লাখ মানুষ বের হয়। তাদের যে সেনাবাহিনী-নৌবাহিনী আছে, তাদের নৌযানগুলো জনগণের জন্য একদম ফ্রি করে দেয়। আমাদের অনেক রাষ্ট্রীয় গণপরিবহন রয়েছে, এগুলো ঈদে বসে থাকবে; এগুলোও কাজে লাগানো যায়।’
বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন অন্তত দেড় কোটির বেশি মানুষ। তবে এবারের ঈদযাত্রার আনন্দ কিছুটা ফিকে হয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্নের শঙ্কার মধ্যে দূরপাল্লার বাস স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে কি না— তা নিয়ে বাসমালিক ও যাত্রীদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।
যদিও সরকার থেকে বারবার বলা হচ্ছে, জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তারপরও ফিলিং স্টেশনগুলোতে আতঙ্কজনিত তেল কেনা থামানো যাচ্ছে না।
রাজধানীর গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, দূরপাল্লার পরিচিত বাস অপারেটরদের বাইরে স্থানীয় কিছু অপারেটর পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে টিকিটের দাম বাড়িয়ে রাখছেন বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক যাত্রী।
গাবতলী বাস টার্মিনাল সংলগ্ন আহাদ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, তারা ঢাকা-রংপুর রুটে নন-এসি বাসের টিকিটের জন্য ১২৫০ টাকা নিচ্ছেন। অথচ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এই রুটের ভাড়া নির্ধারণ করেছে ৮৭০ টাকা। অতিরিক্ত ভাড়া কেন নিচ্ছেন— জানতে চাইলে আহাদ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টার মাস্টার শফিকুল ইসলাম স্বপন বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে ভাড়া সামান্য বাড়ানো হয়েছে। ফিরতি পথে এ সময় বাস ফাঁকা আসে। সে ক্ষতি পোষানোর জন্য ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।’
অন্যদিকে দূরপাল্লার যাত্রায় অগ্রিম টিকিট কাটা যাত্রীরাও পড়েছেন অনিশ্চয়তায়। বাস কাউন্টারগুলো থেকে যাত্রীদের সতর্ক করে বলা হচ্ছে, জ্বালানি সংকট দেখা দিলে নির্ধারিত দিনে বাস চলাচল নাও করতে পারে। সে ক্ষেত্রে টিকিট বাতিল করে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। এতে করে আগাম টিকিট কেটেও নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না অনেক যাত্রী।
ভুক্তভোগীদের একজন পোস্তগোলার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী আকিকুল ইসলাম। তিনি ধোলাইপাড়ের ইউনিক পরিবহনের কাউন্টার থেকে আগামী ১৬ মার্চ গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জ যাওয়ার জন্য দুই দিন আগে অগ্রিম সাতটি টিকিট কেটেছেন। তবে কাউন্টার থেকে তাকে জানানো হয়েছে, তেল সংকট থাকলে নির্ধারিত দিনে বাস না চললে টাকা ফেরত দেওয়া হবে।
গাবতলীতে কথা হয় সোহাগ পরিবহনের একজন বাসচালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার শঙ্কা ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার মধ্যেও তারা পূর্বনির্ধারিত শিডিউল অনুযায়ী সব বাস চালাচ্ছেন।
জ্বালানি সংকটে যাত্রা বাতিল করল গ্রীন লাইনের নৌযান
জ্বালানি সংকটের কারণে ঈদের আগে ঢাকা-ইলিশা-ঢাকা রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী নৌযান এমভি গ্রীন লাইন-৩-এর নির্ধারিত যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া আজ ১৪ মার্চও নৌযানটি চলাচল বন্ধ থাকবে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটের দিকে গ্রীন লাইনের ফেসবুক পেজে এই বিজ্ঞপ্তি জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, অনিবার্য জ্বালানি সংকটের কারণে আজ শুক্রবার জাহাজটির নির্ধারিত যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। একই কারণে শনিবারও জাহাজটি ছেড়ে যাবে না। জ্বালানি অপ্রাপ্যতার কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বলে জানিয়েছে গ্রীন লাইন ওয়াটার ওয়েজ লিমিটেড।
ঈদযাত্রায় ভোগান্তি-ভাড়া নৈরাজ্যের শঙ্কা
ঈদকে সামনে রেখে পরিবহনে জ্বালানি তেল সরবরাহে নির্ধারিত সিলিং পদ্ধতি যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির মতে, এ ব্যবস্থা ভাড়া নৈরাজ্য উসকে দিতে পারে এবং যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। তাই অন্তত ঈদের দিন পর্যন্ত পরিবহনে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে তারা। গত মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ দাবি জানান।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, অল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত গণপরিবহন ব্যবস্থা দেশে নেই। এতে কিছু অসাধু পরিবহন মালিক অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সুযোগ নিতে পারে।
ঈদে ভাড়া বাড়ালে কঠোর ব্যবস্থা : ঈদুল ফিতর উপলক্ষে পরিবহন খাতে ভাড়া বাড়ানোসহ কোনো ধরনের অস্থিরতা সহ্য করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি জানিয়েছেন, ১৫ মার্চ থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে এবং তেলের দাম বাড়বে না। ফলে এ অজুহাতে পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শন ও যাত্রীদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
পরিবহন মালিকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি মন্ত্রী আমাকে আশ্বস্ত করেছেন, ১৫ তারিখ থেকে পাবলিক পরিবহনে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হবে। তেলের দাম বাড়ানো হবে না, যার ফলে ভাড়া বাড়ছে না। কোনো অবস্থাতেই সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায় করা যাবে না। যদি কেউ বেশি ভাড়া নেয়, আমাকে জানান— ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব আমার।
কেকে/এলএ