প্রায় সাড়ে চার মাস পর বৃষ্টি নামল চায়ের রাজ্যখ্যাত মৌলভীবাজার জেলায়। দীর্ঘদিনের খরা ও শুষ্ক আবহাওয়ার পর বৃষ্টি বয়ে আনল স্বস্তি।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) মৌলভীবাজার সদর, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, রাজনগর উপজেলাসহ জেলার সাত উপজেলায় নেমেছে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি।
বৃষ্টির সঙ্গে শুধু জনমানবই নয়, প্রাণ ফিরে পেয়েছে গাছপালাসহ প্রকৃতি। কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ বৃষ্টি পেয়ে মাঠে-ঘাটে কাজে নেমে পড়েন। এর আগে কয়েক দিন ধরে বৃষ্টির জন্য জেলার বিভিন্ন উপজেলার মসজিদে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
চা বাগান সংশ্লিষ্টরা জানান, এই বৃষ্টির ফলে চা বাগানে এতদিনের খরাজনিত তাপমাত্রার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা পাবে চা গাছগুলো।
চা বাগান সূত্র জানায়, খরার কারণে জেলার ২৫-৩০ শতাংশ বাগানের চারা গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। কাঙ্ক্ষিত নতুন কুঁড়ি বা চা-পাতার অভাবে বেশির ভাগ কারখানা চালু করা যায়নি। এতে গেল বছরের মতো এ বছরও চায়ের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় ছিল। অবশেষে বৃষ্টিতে প্রাণ ফিরেছে বাগানগুলোতে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গত জানুয়ারি থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় অনেক বাগানেই সেচ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। কোথাও পানির উৎস নেই, কোথাও জলাধার শুকিয়ে গেছে। ফলে স্প্রিঙ্কলার সেচ ব্যবস্থাও অনেক জায়গায় অচল হয়ে পড়েছিল। অবশেষে বৃষ্টিতে প্রাণ ফিরেছে জেলার চা-বাগান এলাকায়। চা শিল্পাঞ্চলের চা উৎপাদক মহলে স্বস্তি এনে দিয়েছে।
চা শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন চা মৌসুম শুরু হওয়ার পর চা শিল্প এলাকায় কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি। ফলে খরার কবলে পড়েছিল চা বাগানগুলো। এই বৃষ্টি এতদিন ধরে শুষ্ক হয়ে থাকা মাটিতে আবার ফিরে এসেছে আর্দ্রতা। ছাঁটাই করা গাছগুলো যেন নতুন করে নিশ্বাস নিতে শুরু করেছে। বাগানের শ্রমিকদের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে স্বস্তির হাসি।
জানা গেছে, দুই দফায় ৩৬ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এর মধ্যে শুক্রবার ভোর ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে ৩ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। তারপর দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয় ৩২ দশমিক ৫ মিলিমিটার। সব মিলিয়ে ৩৬ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
চা গাছের সঠিক বৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য বৃষ্টিপাত একটি অপরিহার্য উপাদান, যা চা গাছকে আর্দ্রতা সরবরাহ করে। চা গাছের বৃদ্ধি ও চা পাতা উৎপাদনের জন্য আদর্শ বৃষ্টিপাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চা গাছের সঠিক বৃদ্ধির জন্য বৃষ্টিপাতের মাসিক বণ্টন খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং চায়ের মৌসুমে তা কমপক্ষে ১০০ মিমি থাকা বাঞ্ছনীয়। মাসিক বৃষ্টিপাত ১০০ মিলিমিটার এর কম হলে চা গাছ খরায় টিকতে পারে না। খরা মোকাবিলায় বেশিরভাগ চা বাগানে স্প্রিঙ্কলার ইরিগেশনের মাধ্যমে সেচ প্রদান করা হয়ে থাকে। তবে অনেক বাগানে পানির উৎস বা জলাধার না থাকায় সেটিও সম্ভব হয় না। তাই চা বাগানে প্রাকৃতিক বৃষ্টি অনেক উপকারী।
ফিনলে টি কোম্পানির ভাড়াউড়া ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ শিবলি বলেন, ‘যতটুকু বৃষ্টিপাত হয়েছে, তাতে আমরা স্বস্তিবোধ করছি। কিছুদিন আগে এই চা-গাছের মাথা ছাঁটাই করা হয়েছিল। রুক্ষভাব দেখা গিয়েছিল চা-বাগানে। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টির কারণে আবারও জেগে উঠেছে চা-গাছগুলো। প্রথম বৃষ্টির পর চা গাছে যে কচি পাতাগুলো গজায়, সেগুলোকে বলা হয় ‘ফার্স্ট ফ্লাশ’ বা প্রথম ধাপের চা পাতা। এই পাতাগুলো সবচেয়ে কোমল ও সুগন্ধি হওয়ায় এর মানও তুলনামূলক বেশি।
চা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম বৃষ্টির পর জন্মানো এই পাতায় স্বাদ ও ঘ্রাণের বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে, যা চা প্রেমীদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়।
রাজনগর চা বাগানের ব্যবস্থাপক শিহাব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের চা শিল্পে এই মৌসুমের বৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দিন অনাবৃষ্টির পর চা বাগানে বৃষ্টি চা গাছের জন্য উপকার বয়ে আনবে। বৃষ্টির কারণে মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা যোগ হবে। এতে গাছ প্রয়োজনীয় পানি ও খাদ্যোপাদান সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে। বৃষ্টিপাতের ফলে চা বাগানে লাইট প্রুনিং বা ছাঁটাই করা চা গাছগুলোতে দ্রুত নতুন কুঁড়ি চলে আসবে। হালকা ছাঁটাই করা চা গাছগুলোতে ফিরে আসবে সজীবতা।’
হঠাৎ এই বৃষ্টির উপকারিতা সম্পর্কে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা চা গবেষক ড. শামীম আল মামুন বলেন, ‘চা গাছের বেড়ে ওঠা আর পাতা উৎপাদনের জন্য বৃষ্টি অত্যন্ত জরুরি। বছরে ২ হাজার মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত চা শিল্পের জন্য আদর্শ। আর একটি পরিণত চা গাছ শীতকালে গড়ে ১ দশমিক ৩ মিলিমিটার ও গ্রীষ্মকালে প্রায় ৬ মিলিমিটার পানি প্রয়োজন হয়।’
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. আনিসুর রহমান জানান, শুক্রবার সকাল ৫টা থেকে ৬টা পর্যন্ত ৩ দশমিক ৮ মিলিমিটার এবং দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ৩২ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘মৌলভীবাজারে মৌসুমের শুরুতে হওয়া বৃষ্টিপাত জেলার রবি ফসলের জন্য আশীর্বাদ। এই বৃষ্টিতে ধান, চাসহ সব ধরনের ফসলের উপকার হবে।’
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় অনেক স্থানে জমির মাটি শক্ত হয়ে পড়েছিল। বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের জমিতে সেচ দিতে কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছিল। শুক্রবারের এই বৃষ্টি জমির আর্দ্রতা বাড়াতে সহায়ক হবে ও ফসলের বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ব্যবসায়ী ও পথচারীরা জানান, কয়েক মাস ধরে বৃষ্টির দেখা না পাওয়ায় পরিবেশে ধুলাবালি বেড়ে গিয়েছিল। বৃষ্টির ফলে এখন বাতাস কিছুটা পরিষ্কার হয়েছে ও গরমের তীব্রতাও কমেছে।
কেকে/এসএ