মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬,
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধান করে সংবিধান সংশোধন কমিটি, বিরোধীদের ওয়াকআউট      তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপরে, বন্যার শঙ্কা      ৯ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা      সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা      বন্যার কবলে সাত জেলা : নিহত ৫৪, ছয় লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত      আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      
দেশজুড়ে
তিস্তার মাওলানা ভাসানী সেতু গাঁজা পাচারের নতুন করিডোর
বগুড়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: রোববার, ১৫ মার্চ, ২০২৬, ১২:১৫ পিএম

কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার সীমান্তে তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত মাওলানা ভাসানী সেতু উত্তরাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। কিন্তু উন্নয়নের এই অবকাঠামো এখন মাদক পাচারের নতুন করিডোরে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে। সরেজমিনে সেতু এলাকা ঘুরে এমনই চিত্র দেখা গেছে।

বাস নেই, চেকপোস্টও নেই

গত বছরের ২০ আগস্ট যানবাহন চলাচলের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়া হলেও এখনো নিয়মিত যাত্রীবাহী বাস চলাচল শুরু হয়নি। ফলে সেতুর দুই প্রান্তে স্থায়ী পুলিশ চেকপোস্টও বসানো হয়নি। স্থানীয়দের ভাষ্য, ভারী যানবাহনের চলাচল না থাকায় নজরদারি তুলনামূলক শিথিল। এই সুযোগে ছোট গাড়ি, মোটরসাইকেল, পিকআপ ও মাইক্রোবাসে সহজেই গাঁজা পার হচ্ছে।

সেতুর মুদি দোকানের মালিক আবু সাঈদ বলেন, “প্রতিদিন ভোর থেকে সেতু এলাকায় অচেনা মোটরসাইকেল আরোহীদের আনাগোনা দেখা যায়। তাদের অনেকের বাড়ি বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলায়।”

সেতু সংলগ্ন চায়ের দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেতুর অপর প্রান্তে রয়েছে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলা। ভোরবেলা ওই প্রান্ত থেকে মোটরসাইকেলে করে গাঁজা এপ্রান্তে আনা হয়। পরে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তা গাইবান্ধা হয়ে বগুড়া হয়ে অন্যান্য জেলায় পাঠানো হয়।

ভারত সীমান্ত থেকে যমুনা সেতু: নিরবচ্ছিন্ন রুট

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে গাঁজা এনে প্রথমে তিস্তার এই সেতু পার করা হয়। এরপর গাইবান্ধার সাঘাটা, বোনারপাড়া ও মহিমাগঞ্জ হয়ে তা প্রবেশ করে বগুড়ার সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনট এলাকায়। সেখান থেকে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর অতিক্রম করে সরাসরি যমুনা সেতু এলাকায় পৌঁছে যায়।

এই ধাপগুলো পার করা হয় মোটরসাইকেল ও সিএনজি চালিত অটোরিকশা যোগে। এরপর সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে এসব মাদক।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে আসা গাঁজা মূলত বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর জেলায় সরবরাহ করা হয়। অন্যদিকে কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে আসা গাঁজা যায় রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলায়।

স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই রুটে গত কয়েক মাসে কয়েকবার ছোট চালান আটক হলেও বড় নেটওয়ার্ক এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।”

জব্দের ঘটনা বাড়লেও মূল রুট অক্ষত

এই রুট ব্যবহার করে পাচার হওয়া গাঁজা বগুড়ার আশপাশের উপজেলাগুলোতে জব্দের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। গত এক বছরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, ডিবি পুলিশ, র‍্যাব, সেনাবাহিনী ও থানা পুলিশ মিলিয়ে প্রায় এক মেট্রিক টনের বেশি গাঁজা জব্দ করেছে।

এর মধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও ডিবি পুলিশ জব্দ করেছে ৬১৪ কেজি গাঁজা এবং গ্রেপ্তার করেছে ২০৯ জন পাচারকারী। একই সময়ে র‍্যাব এবং সদর থানা পুলিশ আরও ৫৬৯ কেজি গাঁজা জব্দ করেছে।

এছাড়া উল্লেখযোগ্য অভিযানের মধ্যে রয়েছে—বগুড়া সদর থানা ৩২ কেজি, র‍্যাব ২১ কেজি এবং সেনাবাহিনী ২৫ কেজি গাঁজা জব্দ।

গ্রামীণ সড়কে চালান ধরা পড়ায় নতুন রুটের সন্ধান

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) গত বছরের আগস্ট মাসে এই নতুন রুটে সন্ধান পায়। ডিএনসি বগুড়া জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. জিললুর রহমান জানান, নতুন রুটের সন্ধান পাওয়ার পর গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি পাওয়ায় বগুড়ার সোনাতলা ও সারিয়াকান্দি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কে একের পর এক বড় চালানের গাঁজা জব্দ হয়েছে।

তিনি বলেন, “গত ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সোনাতলা উপজেলার একটি গ্রামীণ সড়কে নেপিয়ার ঘাস বোঝাই ভ্যান থেকে ৩৫ কেজি গাঁজা জব্দ করা হয়। জড়িতদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, রংপুর-ঢাকা মহাসড়কে একাধিক চেকপোস্ট থাকায় পাচারকারীরা বিকল্প রুট হিসেবে তিস্তার এই সেতু ব্যবহার করছে। এ বিষয়ে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।”

একই উপজেলায় গত ১৮ আগস্ট আরও ১৮ কেজি গাঁজা জব্দ করা হয়। তিনটি মোটরসাইকেলে পাচার হওয়া ১৮ কেজি গাঁজা পাচারকারীরাও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। অন্যদিকে ২৬ জানুয়ারি সারিয়াকান্দি উপজেলার গ্রামীণ সড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে সেনাবাহিনী ২৫ কেজি গাঁজা আটক করেছে। একই রুটে ডিবি পুলিশও তিন দফায় ৯ কেজি গাঁজা জব্দ করেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) রংপুর জেলা কার্যালয়ের সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডিএনসি পরিদর্শক এলতাজ হোসেন গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সেতুর অদূরে উজান বোচাগাড়ি এলাকায় অটোরিকশা যোগে পাচার হওয়ার সময় ২১ কেজি গাঁজা জব্দ করেন।

তিনি জানান, এই গাঁজার চালানটি কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে মাওলানা ভাসানী তিস্তা সেতু পার হয়ে গাইবান্ধার দিকে যাচ্ছিল।

নজরদারি জোরদারের দাবি

স্থানীয়দের দাবি, সেতুর দুই প্রান্তে স্থায়ী পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চেকপোস্ট স্থাপন এবং নিয়মিত টহল জোরদার না করা হলে এই রুট মাদক পাচারের বড় করিডোরে পরিণত হতে পারে। তাদের মতে, উন্নয়নের প্রতীক এই সেতু যেন মাদক ব্যবসায়ীদের নিরাপদ পথ না হয়ে ওঠে, সেজন্য দ্রুত কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাজুল ইসলাম বলেন, “এই সেতু পার হয়ে গ্রামীণ সড়ক দিয়ে গাঁজা পাচারের খবর আমাদের কাছে রয়েছে। দুই সপ্তাহ আগে মাওলানা ভাসানী সেতু পার হয়ে আসা ২১ কেজির গাঁজার চালান থানা এলাকায় প্রবেশ করেছিল। সুন্দরগঞ্জ থানা পুলিশ খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছার আগেই সেই চালান লালমনিরহাট থেকে আসা ডিবি পুলিশ জব্দ করে। সেতুর দুই প্রান্তই সুন্দরগঞ্জ থানার আওতায়। মাদক পাচার রোধে সেতু দুই প্রান্তে ২৪ ঘণ্টা তল্লাশি চেকপোস্ট বসানো হবে।”

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  তিস্তা   মাওলানা ভাসানী   সেতু   গাঁজা   করিডোর  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close