মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কিশোরগঞ্জে ডিজেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জ্বালানির অভাবে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষকরা জানান, বিভিন পেট্রোল পাম্প ঘুরেও সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিজেল সংকটের কারণে সেচের সময়সূচি ব্যাহত হচ্ছে, যা ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করছে। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে গেলে ডিজেলের তীব্র সংকটের কথা বলে সরকার নির্ধারিত টাকার চেয়ে লিটার প্রতি ১৫-২০ টাকা আদায় করছেন।
তারা বলছেন, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা এ সংকট দেশের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধান চাষে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ জমি প্রস্তুত, সেচ ও ফসল কাটাসহ বেশিরভাগ কৃষিকাজেই ডিজেলচালিত যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়।
রোববার (১৫ মার্চ) দুপুরে করিমগঞ্জ উপজেলার গুজাদিয়া ইউনিয়নের টামনি ইসলামপুর গ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, কৃষক আবু বক্কর মাত্র এক লিটার তেল নিয়ে তার তিন একর জমিতে পানি দিতে এসেছেন।
তিনি বলেন, ‘৬০ হাজার টাকা লোন নিয়ে বোরো আবাদ করেছি। এখন জমিতে পানির খুব দরকার, অথচ দোকানে দোকানে ঘুরেও ডিজেল পাচ্ছি না। পানির অভাবে জমির মাটি শুকিয়ে গেছে, ধানের গাছে লালচে ভাব ধরেছে। এভাবে চললে পথে বসতে হবে।’
কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সাধারণত ডিসেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত বোরো ধানের মৌসুম চলে। এই সময়ে হাওরের বিস্তীর্ণ জমিতে ধানের গাছ থেকে শীষ বের হতে শুরু করে। সেচের ওপরই নির্ভর করে ধানের ফলন। কিন্তু ডিজেল চালিত সেচ পাম্প চালাতে না পারায় অনেক জমিতে সেচ দেওয়া ব্যাহত হচ্ছে।
চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ১ লাখ ৪ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। সময়মতো সেচ নিশ্চিত করা গেলে ভালো ফলনের আশা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা। তবে, সেচ মৌসুমে ডিজেলের সংকট ও অতিরিক্ত দাম দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদনকারী হাওরাঞ্চলে বোরো উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে।
করিমগঞ্জ হাওরের কৃষক আলাল মিয়া বলেন,
‘এ বছর চার একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করছি। এখন জমিতে টানের সময়, পানির খুব দরকার। দোকানে দোকানে ঘুরেও ডিজেল পাচ্ছি না। শূন্য বোতল নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। পানির অভাবে জমির গাছের গোড়ায় মাটি শুকিয়ে গেছে, গাছে লালভাব ধরছে। খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’
ইটনা উপজেলার সদর ইউনিয়নের খালপাড়া গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রোববার স্থানীয় বাজারের সব খুচরা দোকানে ঘুরেও এক লিটার ডিজেল সংগ্রহ করতে পারিনি। আমার বোরো ধানের জমি শুকিয়ে যাচ্ছে। তাই ব্যবসায়ীদের প্রতি লিটার ১২০ টাকা পর্যন্ত দিতে চেয়েছি। তারপরও তারা সংকটের কথা বলে আমাকে ডিজেল দেয়নি। এখন ধানের জমিতে নিয়মিত পানি দিতে না পারলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে না।’
অষ্টগ্রাম উপজেলার কাস্তুল ইউনিয়নের করগাঁও মৌজার পাটাচাপড়া গ্রামের সেচপাম্প মালিক ফজলুর রহমান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে স্থানীয় দোকানগুলোতে ডিজেল পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। স্থানীয় দোকানগুলো প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ১৫ টাকা পর্যন্ত বেশি নিচ্ছে। আমার পাম্প ১০ ঘণ্টা চালাতে প্রতিদিন ১০ লিটার ডিজেল লাগে।
এ বিষয়ে স্থানীয় বাজারের কয়েকজন ডিজেল বিক্রেতা জানান, ১০ দিন আগে থেকে তারা ডিজেল পাচ্ছেন না। এ কারণে ডিজেল বিক্রি বন্ধ রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘বোরো মৌসুমে সেচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক ও সেচ পাম্প মালিকরা যাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি পান, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। কোথাও ডিজেল মজুত, অনিয়ম বা অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কেকে/এমএ