মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের বাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিংসহ আরোপিত সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পরও সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় অনেক গ্রাহক পেট্রোল পাম্প থেকে তেল না পেয়েই ফিরে যেতে দেখা যায়।
বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি। অনেকেই দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যেতেও দেখা গেছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ঈদ যাত্রায় ব্যাপক ভোগান্তি হতে পারে ধারণা করছেন বাস কোম্পানির কর্মকর্তা ও মালিক নেতারা।
গতকাল রোববার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ আরোপিত সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, জনগণের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করা এবং বোরো মৌসুমে কৃষকদের জ্বালানির চাহিদা বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ১৫ মার্চ থেকে দেশের সব বিতরণ পয়েন্ট থেকে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল বিতরণ অব্যাহত থাকবে।
এদিকে গতকাল দুপুর ও বিকেলে রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, তেল নেওয়ার জন্য মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, পিকআপ ও দূরপাল্লার বাস-ট্রাকের দীর্ঘ লাইন। অনেক পাম্পে প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত যানবাহনের সারি দেখা গেছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় পাম্প কর্তৃপক্ষ সবাইকে তেল দিতে পারছেন না বলেও জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি তেল নিয়ে ডিসিদের ৯ নির্দেশনা : প্রতিদিন ডিপোর মজুত যাচাই, জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতদারদের রোধ, অতিরিক্ত দাম নিলে শাস্তি নিশ্চিত করাসহ জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নয়টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা সংক্রান্ত অনলাইন মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এসব নির্দেশনা দেন। সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব ও সব জেলা প্রশাসক অনলাইনে যুক্ত ছিলেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
এদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যানবাহন চালকদের মধ্যে উদ্বেগও দেখা দিয়েছে। অনেক চালক আশঙ্কা করছেন, সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে পরিবহন খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে পণ্যবাহী ট্রাক ও দূরপাল্লার পরিবহনের চালকরা বলছেন, নিয়মিত তেল না পেলে তাদের পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হবে। এতে পণ্য পরিবহন ও যাত্রীসেবাতেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা না গেলে রাজধানীতে এ ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে। এজন্য চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
রাজধানীর ট্রাস্ট পেট্রোল পাম্পে লাগাতার এক কিলোমিটারের বেশি যানবাহনের সারি ছিল। সেনাকল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত এই পেট্রোল পাম্পটি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই তেল বিক্রি করছে। গতকালও ট্রাস্ট পেট্রলপাম্পের যানবাহনের সারি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না।
এ সময় কথা হয় একজনের সঙ্গে। তিনি বলেন, তিন চারটা পেট্রোল পাম্পে গিয়েছি, সব পাম্পেই একই অবস্থা। অনেক ঘুরে এখানে এসেছি। লাইনে ৩ ঘণ্টা অপেক্ষার পর তেল পেলাম। তাও পর্যাপ্ত না। ভীষণ কষ্ট হয়েছে। অবাক লাগছে। সরকার বলছে তেলের সংকট নেই। তাহলে কেন এই সংকট?’
শুধু এই ফিলিং স্টেশনেই নয়, অন্য ফিলিং স্টেশনেও তেল পেতে ভোগান্তির চিত্র চোখে পড়ে। ঢাকার বাইরেও একই চিত্র। ডিপো থেকে চাহিদামতো জ্বালানি তেল সরবরাহ না করায় খুলনায় তেল উত্তোলন বন্ধ করে দিয়েছেন পেট্রোল পাম্প মালিকরা। চাহিদামতো তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে আজ সোমবার থেকে রাজশাহীর সব ফিলিং স্টেশন ডিপো থেকে তেল উত্তোলন বন্ধ রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অনেক ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল নেই লিখে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পাম্প মালিকদের অভিযোগ, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম থাকায় তারা গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। তাদের দাবি, পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না থাকলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়।
রাজধানী ফিলিং স্টেশনের এক ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ডিজেলের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টন। কিন্তু তারা পাচ্ছেন মাত্র ৪ থেকে ৫ হাজার টন। একইভাবে পেট্রোল ও অকটেনের সরবরাহও প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। তিনি বলেন, আমরা চাইলেও সবাইকে তেল দিতে পারছি না। সরবরাহ কম থাকায় অনেক গ্রাহককে তেল না দিয়েই ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। এতে গ্রাহকরাও অসন্তুষ্ট হচ্ছেন এবং পাম্পে চাপও বাড়ছে।
অন্যদিকে টোটাল সিএনজি ফিলিং স্টেশনের এক কর্মচারী জানান, তাদের পাম্পে অকটেন ও ডিজেলের চাহিদা অনেক বেশি। প্রতিদিন অকটেন ও ডিজেলের প্রায় সাড়ে চার হাজার টন চাহিদা রয়েছে। শুধু ডিজেলের চাহিদাই প্রায় ৯ হাজার টনের কাছাকাছি। সব মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ১৮ হাজার টন জ্বালানি প্রয়োজন হলেও সে অনুযায়ী সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, সরবরাহ কম থাকায় অনেক সময় পাম্পে তেল দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। তখন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক যানবাহনকে তেল না দিয়েই ফিরে যেতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. নাজমুল হক বলেন, ‘আমরা বিপিসি থেকে যা তেল পাচ্ছি তা বিক্রি করছি। না পেলে বিক্রি করতে পারছি না। চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় এই সংকট শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সীমা বেঁধে দেওয়ার পর সংকট বেড়েছে। বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। অনেকে চাহিদামতো তেল না পেয়ে মব সন্ত্রাস করার চেষ্টা করছে।’
জ্বালানি সরবরাহে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ: সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানান জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অমিত। তিনি বলেন, ‘আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। আমরা তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।’
জ্বালানি তেল সংকটে রাঙামাটিতে বন্ধ স্পিডবোট: রাঙামাটিতে জ্বালানি তেলের সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে যাত্রীবাহী স্পিডবোট সার্ভিস। আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচলেও। সরেজমিনে গতকাল সকালে স্পিডবোট ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, জ্বালানি তেল (অকটেন) না পাওয়ায় স্পিডবোট সার্ভিস বন্ধ রয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন বিভিন্ন উপজেলাগামী মানুষ।
কেকে/ এমএস