ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন লাখো ঘরমুখো মানুষ। সরকারি ও আধা-সরকারি অফিস-আদালতের শেষ কর্মদিবস হওয়ায় সোমবার দুপুর থেকেই ঢাকার বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। বাস, ট্রেন ও লঞ্চে বাড়ি ফেরার তাড়াহুড়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের সংখ্যাও বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। শাহবাগ, ফার্মগেট, পল্টন, মিরপুর রোড, মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে যানবাহন। এতে কর্মজীবী মানুষ ও ঈদযাত্রায় বের হওয়া যাত্রীদের পড়তে হয় চরম দুর্ভোগে।
তবে সব ভোগান্তি পেরিয়েও প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে রাজধানী ছেড়ে গ্রামের পথে ছুটছেন মানুষ। বাস ও লঞ্চ টার্মিনালে ভিড় থাকলেও রেলপথে তুলনামূলক স্বস্তির চিত্র দেখা গেছে; সময়মতো ট্রেন ছাড়ায় অনেক যাত্রী স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২১ মার্চ ঈদুল ফিতর উদযাপিত হতে পারে। সম্ভাব্য এ তারিখ ধরে ১৯ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত পাঁচ দিনের ছুটি নির্ধারণ করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
এর আগে ১৭ মার্চ শবে কদরের ছুটি এবং ১৮ মার্চ সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এবার টানা সাত দিনের ছুটি পাচ্ছেন।
সোমবার দুপুরে রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল পরিদর্শন করেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
তিনি বলেন, এবারের ঈদযাত্রায় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। আমরা চাই তারা যেন নির্বিঘ্নে ও স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পারেন। সেই লক্ষ্যেই সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তারপরও যাত্রীদের সেবার মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী ঘাট শ্রমিকদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন। এসময় তিনি তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘শ্রমিকদের কারণেই আমাদের বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আপনারা ঈদযাত্রায় ঘাট ব্যবহার করা যাত্রীদের সহযোগিতা করবেন। মানবিক ও দায়িত্বশীল আচরণ করলে যাত্রীরাও আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। কোনো যাত্রী যেন হয়রানির শিকার না হন।’
সোমবার রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী ও আবদুল্লাহপুর বাস টার্মিনাল ঘিরে দেখা গেছে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। দূরপাল্লার বাস ছাড়ার আগেই টিকিটধারী যাত্রীরা বাসস্ট্যান্ডে এসে জড়ো হন। অন্যদিকে যাত্রীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে দেখা যায় পরিবহন সংশ্লিষ্টদের। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের তুলনায় বাস ছাড়তে দেরি হয়, আবার কোথাও কোথাও অতিরিক্ত যাত্রী ওঠানোর কারণে সড়কে ধীরগতিতে চলাচল করে যানবাহন।
রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনেও ঘরমুখো মানুষের ব্যাপক ভিড় লক্ষ করা গেছে। ট্রেন ছাড়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই যাত্রীরা প্ল্যাটফর্মে এসে অপেক্ষা করছেন। অনেকের হাতে বড় বড় ব্যাগ ও লাগেজ। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কেউ যাচ্ছেন গ্রামের বাড়ি, কেউবা আত্মীয়-স্বজনের কাছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেলওয়ে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
একই অবস্থা দেখা গেছে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও। দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাতায়াতকারী যাত্রীরা লঞ্চ ধরতে ভিড় করেন। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত সদরঘাট এলাকায় মানুষের চাপ বেড়ে যায়। লঞ্চ টার্মিনালের ভেতর ও আশপাশের সড়কগুলোতেও তৈরি হয় তীব্র যানজট।
ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, ঈদ সামনে রেখে রাজধানীতে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সড়কে যানবাহনের সংখ্যা বেশি থাকছে। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চ টার্মিনাল ঘিরে যাত্রীদের চাপ বাড়ায় ওইসব এলাকার সড়কে যানজট বেশি হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা আরও জানান, অনেক মানুষ একসঙ্গে রাজধানী ছাড়তে শুরু করায় সড়কে চাপ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াও যানজটের অন্যতম কারণ। সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।
অন্যদিকে যাত্রীদের অভিযোগ, রাজধানী থেকে বাস টার্মিনাল বা রেলস্টেশনে পৌঁছাতে সময় লাগছে কয়েকগুণ বেশি। অনেকেই নির্ধারিত সময়ের বাস বা ট্রেন ধরতে না পেরে বিপাকে পড়ছেন। যানজটের কারণে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত। তবু পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এই ভোগান্তি মেনেই বাড়ির পথে ছুটছেন লাখো মানুষ।
মিরপুর থেকে গাবতলী বাস টার্মিনালে আসা এক যাত্রী বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে ২০ থেকে ২৫ মিনিটে এখানে পৌঁছানো যায়। কিন্তু আজ প্রায় দেড় ঘণ্টা লেগেছে। রাস্তায় এত যানজট যে গাড়ি প্রায় দাঁড়িয়ে ছিল।’
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন সায়েদাবাদগামী এক যাত্রী। তিনি বলেন, ‘ঈদের আগে সবাই একসঙ্গে বাড়ি ফিরতে চাইছেন। তাই রাস্তায় প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। তবে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার আনন্দের কথা ভেবে এই ভোগান্তিও মেনে নিতে হচ্ছে।’
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের আগের কয়েক দিন রাজধানী থেকে ঘরমুখো মানুষের চাপ আরও বাড়বে। ফলে সড়কে যানজটও বাড়তে পারে। এজন্য যাত্রীদের সময় হাতে নিয়ে বের হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীতে দীর্ঘ যানজট
সোমবার শাহবাগ, ধানমন্ডি, পল্টন, ফার্মগেট, মিরপুর রোড, উত্তরা, মহাখালী, বনানী, রামপুরা, বাড্ডা ও মালিবাগ এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে ট্রাফিক সিগন্যাল আটকে থাকায় যানবাহনের ধীরগতি দেখা যায়। এতে বাস ও সিএনজিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা।
পল্টন থেকে গাবতলী যাওয়ার পথে আটকে পড়া মনজুর হোসেন জানান, বিজয়নগর, কাকরাইল ও কারওয়ান বাজারের যানজট পেরিয়ে ফার্মগেটে পৌঁছাতে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। ধানমন্ডি থেকে উত্তরা যাওয়ার পথে শরিফ আহমেদ দীর্ঘ সময় একই জায়গায় আটকে থাকার কথা জানান।
গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালে দুপুর থেকেই যাত্রীচাপ বাড়তে শুরু করে। বাস না পেয়ে অনেকে রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল ও সিএনজির ওপর নির্ভর করছেন, ফলে ভাড়াও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, ঈদযাত্রার চাপ সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত ট্রাফিক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যার পর যানবাহনের চাপ কিছুটা বাড়তে থাকে, তবে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
সাভারে কয়েক পয়েন্টে যানবাহনের জটলা
সাভার প্রতিনিধি জানায়, প্রিয়জনের কাছে ফিরতে ঢাকার সাভার ছাড়ছেন ঘরমুখো মানুষ। ফলে সড়কে বেড়েছে ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ। নবীনগর-চন্দ্রা ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের কয়েকটি পয়েন্টে দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের সারি। দুপুরের পর থেকে সড়কে প্রতিটি বাসস্ট্যান্ডে অতিরিক্ত যাত্রীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তাদের বহন করতে বিপুলসংখ্যক পরিবহনকেও অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। যাত্রীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত পরিবহন পেয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটে যাচ্ছেন। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মাঠে কাজ করতে দেখা গেছে।
সিরাজগঞ্জগামী যাত্রী রায়হান বলেন, অফিস শেষ করে বাড়ি ফিরছি। এসে সঙ্গে সঙ্গেই বাস পেয়েছি। ভাড়াও সহনীয়। বলা চলে স্বস্তির যাত্রা। চন্দ্রার কথা হয় সোমা পরিবহনের চালক আলিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, গাবতলী থেকে ছেড়ে এসেছি। পথের কয়েকটি পয়েন্টে যানজট পেয়েছি। বাকি পথ ছিল পরিষ্কার।
সময়মতো ট্রেন ছাড়ায় স্বস্তিতে ঘরমুখো যাত্রীরা
ঘরমুখো মানুষের যাত্রায় এবার রেলপথে বড় ধরনের ভোগান্তির চিত্র দেখা যাচ্ছে না। অনলাইনে টিকিট সংগ্রহে কিছুটা জটিলতা থাকলেও সময়মতো ট্রেন ছাড়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা।
সোমবার সরেজমিনে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে দেখা যায়, বাড়ি ফেরার তাড়নায় মানুষের ভিড় থাকলেও স্টেশনে শৃঙ্খলা বজায় রয়েছে। প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের আগে যাত্রীদের টিকিট কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে এবং টিকিট ছাড়া কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী উপবন এক্সপ্রেসের যাত্রী রিসাত বলেন, অনলাইনে টিকিট কাটায় যাত্রা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ হয়েছে এবং স্টেশনেও তেমন বিশৃঙ্খলা নেই। শায়েস্তাগঞ্জের যাত্রী আজিজুল হকও অনলাইনে টিকিট কেটে নির্বিঘ্ন যাত্রার কথা জানান। তবে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে অনেকে অনলাইনে টিকিট পাননি। তারা স্টেশন থেকে স্ট্যান্ডিং টিকিট কিনে যাত্রা করছেন।
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ম্যানেজার মো. সাজেদুল ইসলাম জানান, সোমবার পর্যন্ত ২০ জোড়া ট্রেন ঢাকা ছেড়েছে। নীলসাগর এক্সপ্রেস কিছুটা দেরি করলেও বাকি ট্রেনগুলো সময়মতো ছেড়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, গৃহীত ব্যবস্থার ফলে যাত্রীরা স্বস্তিতে ঈদযাত্রা করতে পারবেন।
কেকে/এলএ