অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা আর ঘুষবাণিজ্যে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বান্দরবান বন বিভাগ। সেখানে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. তৌফিকুল ইসলামের দুর্নীতি এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। তার বেপরোয়া ঘুষবাণিজ্যের পাশাপাশি বৈষম্যমূলক আচরণে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
ডিএফওর দুর্নীতির প্রধান সহযোগী হিসেবে তাকে সঙ্গ দিচ্ছেন বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম। একই সঙ্গে ডিএফও তৌফিকুলের ক্যাশিয়ার হিসেবে সংশ্লিষ্টদের কাছে তার পরিচিতি রয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার চেয়ারে বসতে বান্দরবান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তৌফিকুল ইসলামকে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিয়েছেন এই সাইফুল ইসলাম। এখন এই দুই মানিকজোড় মিলে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছে বান্দরবান বন বিভাগকে। তারা দুজন এখন বান্দরবান বন বিভাগে মূর্তিমান আতঙ্কে রূপ নিয়েছেন।
বান্দরবানে বনের গাছ অবাধে কর্তন, ভুয়া টিপি (চলাচল পাস), গাছ পাচার ও পোস্টিং বাণিজ্য বন্ধ করতে দৃশ্যত ব্যবস্থা নিচ্ছে না বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ উঠেছে, প্রধান বন সংরক্ষকের কার্যালয় ম্যানেজ করে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বহুমুখী দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ক্যাশিয়ার মো. সাইফুল ইসলামকে ব্যবহার করে কোণঠাসা করে রেখেছেন বিভিন্ন পদের জনবলকে। সখ্যতা গড়ে তুলেছেন বান্দরবানে বনের গাছচোর চক্রের সঙ্গে।
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বান্দরবানে বিভিন্ন লোভনীয় পোস্টিংয়ে ঘুষের রেট নির্ধারণ করে দিয়েছেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা। বান্দরবানে রেঞ্জ কর্মকর্তা ও স্টেশনে পোস্টিং পেতে গুনতে হয় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। রেঞ্জ সহযোগী ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা। ফরেস্ট গার্ডদের সদর রেঞ্জ ও স্টেশনে পোস্টিংয়ে নির্ধারিত ২ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। ঘুষের তালিকায় রয়েছে টিপি প্রতি ১৩ হাজার টাকা। সেখান থেকে ডিএফওর ভাগে ২৩০০ টাকা, সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) ৬০০ টাকা, রেঞ্জ অফিসার ৮০০ টাকা, অফিস সেকশন ৬০০ টাকা, ফরেস্টার ২৬০০ টাকা, ফরেস্ট গার্ড ২৫০০ টাকা। প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার সদর রেঞ্জের টিপি শাখায় টিপির ঘুষের টাকা ভাগবাটোয়ারা হয়।
এ ছাড়া স্টক চেকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনফুটে মোট ৯ টাকা। ভাগবাটোয়ারায় রেঞ্জ অফিসার ২ টাকা, ডিএফও ৬ টাকা, অফিস ১ টাকা। জোত পারমিটের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনফুটে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। এর মধ্যে ডিএফও ১৭ টাকা, রেঞ্জ অফিসার ২০ টাকা, স্টাফ ও ফরেস্টার ৫ টাকা, অফিস এবং অন্যান্য ১৩ টাকা হারে ভাগবাটোয়ারা হচ্ছে। বান্দরবান বন বিভাগে সদর রেঞ্জ, রুমা, থানচি, খেয়াচালং, বেতছড়া, সেকদু ও পাইন্দু রেঞ্জ রয়েছে।
যেই রেঞ্জে পারমিট পায় সেই রেঞ্জ কর্মকর্তা পারমিটের ঘুষের টাকা ভাগবাটোয়ারার দায়িত্বে থাকেন। পারমিটের পর ট্রাকপ্রতি কাঠ লোড করতে বন বিভাগকে ঘুষ দিতে হয় ২৫০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। বনের গাছ বৈধ টিপির আড়ালে অবৈধভাবে পাচার করতে গেলে সুয়ালক চেক স্টেশনে ট্রাকপ্রতি দিতে হয় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। বান্দরবানে দেড় শতাধিক কাঠ ব্যবসায়ী রয়েছেন।
লটারির মাধ্যমে নির্ধারিত হয় কোন ব্যবসায়ীর কাঠ বৈধ টিপির আড়ালে পাচার করা হবে। পরবর্তীতে সেই লটারির তালিকা ট্রাক লোডের আগেই পৌঁছে দেওয়া হয় বান্দরবান বন বিভাগে।
এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি নতুন এসেছেন। এসব অভিযোগ সঠিক নয়।
এসব অভিযোগের ব্যাপারে বান্দরবান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তৌফিকুল ইসলামের মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল করলে বন্ধ পাওয়া গেছে।
কেকে/এলএ