সরকারি টানা সাত দিনের ছুটি শুরু হওয়ায় মঙ্গলবার সকাল থেকেই ঈদ-উল ফিতর উপলক্ষে রাজধানী ঢাকা থেকে ঘরমুখো মানুষের স্রোত নেমেছে। ভোরের আলো ফুটতেই বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। তবে এবার যাত্রার প্রথম দিনেই বড় ধরনের ভোগান্তির খবর পাওয়া যায়নি। যাত্রীরা তুলনামূলক স্বস্তিতে বাড়ির পথে রওনা হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানিয়েছে, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে রেল, সড়ক ও নৌ এ তিন পথেই বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ট্রাফিক পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ফলে বিগত বছরের মতো দীর্ঘ যানজট বা বিশৃঙ্খলার চিত্র এখনো তেমনভাবে চোখে পড়েনি।
রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে সকাল থেকেই যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে। গত কয়েক দিনের তুলনায় এদিন যাত্রীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে স্টেশনে প্রবেশ ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। স্টেশন এলাকায় তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। টিকিটবিহীন যাত্রীদের প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রাখা হয়েছে এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ট্রেন চলাচল করছে এবং এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো বিলম্ব হয়নি। অতিরিক্ত যাত্রীচাপ সামাল দিতে বিশেষ ট্রেনও চালানো হচ্ছে। যাত্রীরা জানিয়েছেন, ট্রেন সময়মতো ছাড়ছে এবং ভিড় থাকলেও বিশৃঙ্খলা কম।
সড়কপথেও ঈদযাত্রা মোটামুটি স্বস্তিদায়ক। রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালে ভোর থেকেই যাত্রীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। লম্বা ছুটি থাকায় অনেকেই আগেভাগেই বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন, ফলে একদিনে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়নি। বাস কাউন্টারগুলোতে পর্যাপ্ত যানবাহন রাখা হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়েই বাস ছেড়ে যাচ্ছে।
গাবতলী বাস টার্মিনালে কথা হয় কুষ্টিয়াগামী এক যাত্রী শরিফের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘আগে ভাবছিলাম প্রচণ্ড ভোগান্তি হবে, কিন্তু আজকে তেমন কিছু দেখছি না। বাস ঠিক সময়েই ছাড়ছে, ভিড় থাকলেও চাপ সামলানো যাচ্ছে।’
ট্রাফিক পুলিশ জানিয়েছে, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-মাওয়া ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কোথাও যানজট সৃষ্টি হলে দ্রুত তা নিরসনে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের যাতায়াত অনেক সহজ হয়েছে, যা সড়কপথের চাপ কমাতে সহায়ক হয়েছে।
নৌপথেও ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে স্বাভাবিকভাবে। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে ভোর থেকেই বিভিন্ন রুটে লঞ্চ ছেড়ে গেছে। সকালে যাত্রীচাপ তুলনামূলক কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়তে থাকে। বিআইডব্লিউটিএ ও নৌপুলিশ জানিয়েছে, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করা এবং লাইফ জ্যাকেটসহ নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে লঞ্চগুলোতে তদারকি জোরদার করা হয়েছে।
যাত্রীদের একটি অংশ জানিয়েছেন, সড়কপথের সম্ভাব্য যানজট এড়াতে তারা নৌপথ বেছে নিয়েছেন। যদিও পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর লঞ্চে যাত্রীসংখ্যা কিছুটা কমেছে, তবুও আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য অনেকেই এখনো এই পথকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।
এদিকে, রাজধানী ছাড়ার পাশাপাশি ঢাকায়ও কেনাকাটা ও প্রস্তুতির ব্যস্ততা অব্যাহত রয়েছে। যারা শেষ মুহূর্তে বাড়ি ফিরবেন, তাদের জন্য আগামী কয়েক দিনে যাত্রীচাপ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ঈদের দুই-তিন দিন আগে চাপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের নির্ধারিত টিকিট ছাড়া ভ্রমণ না করা, ছাদে বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে না ওঠা এবং যাত্রাপথে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন মালিক ও চালকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যাত্রীর চাপ নেই গাবতলীতেও
ঈদুল ফিতর সামনে রেখে রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত গাবতলী বাস টার্মিনালে এবার দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। মঙ্গলবার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, চাহিদা অনুযায়ী যাত্রী না থাকায় পরিবহন শ্রমিকরা হাঁকডাক দিয়ে যাত্রী খুঁজছেন।
টার্মিনালজুড়ে নেই চিরচেনা ভিড় বা বিশৃঙ্খলা। কল্যাণপুর থেকে গাবতলী সড়কেও ছিল না কোনো যানজট, যা সাধারণত ঈদের সময় দেখা যায়।
শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার মো. আমিনুর রহমান জানান, দীর্ঘ ছুটির কারণে এবার যাত্রী কম। তবে আগামী দিনগুলোতে চাপ বাড়তে পারে। অন্যদিকে, যাত্রী সংকটে হতাশ পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। জামান পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘এমন পরিস্থিতি আগে দেখিনি, যাত্রী না থাকায় আমরা হতাশ।’
কাউন্টার সূত্রে জানা গেছে, তেলের সম্ভাব্য সংকট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ট্রেন ও পদ্মা সেতু ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় বাসে যাত্রী কমেছে। তবে কিছু যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। রংপুরগামী এক যাত্রী জানান, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা দিতে হয়েছে। স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের ক্ষেত্রেও পুরো রুটের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সায়েদাবাদে যাত্রী কম, কিছু রুটে বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ
ঈদ-উল ফিতরের ছুটির প্রথম দিনে রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে যাত্রীর চাপ ছিল তুলনামূলক কম। মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ কাউন্টারে ভিড় কম, অনেক বাসেই আসন ফাঁকা রয়েছে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, হবিগঞ্জ ও লাকসাম রুটে যাত্রীসংখ্যা কম লক্ষ্য করা গেছে।
তবে কয়েকটি রুটে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। খুলনাগামী বাসে নির্ধারিত ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। আবার কোথাও কোথাও যাত্রীসংকটের কারণে কম ভাড়ায় টিকিট বিক্রির কথাও জানিয়েছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, এবার আগেভাগেই অনেক যাত্রী ঢাকা ছেড়েছেন। তবে পোশাক কারখানা ছুটি হলে যাত্রীচাপ বাড়তে পারে। এদিকে, সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী এলাকায় সড়কে তীব্র যানজট দেখা গেছে।
কেকে/ এমএস