কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক এখন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মঞ্জুরুল আলমের নিজস্ব সম্পদে পরিণত হয়েছে। তিনি নিজে এখন এই পার্কের যেন জমিদার আর যারা আছেন সবাই তার প্রজা। সরকারি বরাদ্দ আসলে তার নিজের মতো ভুয়া বিল দেখিয়ে সরকারি টাকা আত্নসাৎ করার পাঁয়তারা করে আসছে বলে জানা গেছে। দায়িত্বরত কর্মকর্তা কাউকে পরওয়া না করে নিজের মতো ঠিকাদারের সাথে আঁতত করে পার্কের কাজ করেন- এমন অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে পশুপাখিদের নিম্নমানের খাবার দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরোদ্ধে। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আলমের কথা ছাড়া এই পার্কের একটি পাতাও যেন নড়ে না, এমনভাবে রেখেছেন তিনি।
কক্সবাজার চকরিয়ায় অবস্থিত ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক এখন দুর্নীতির অভয়ারণ্যতে পরিণত হয়েছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা লোপাটের অভিযোগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়ার পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন মূল অভিযুক্ত কর্মকর্তা মো. মঞ্জুরুল আলম। তাকে দৃশ্যমান কোনো শাস্তির বদলে রহস্যজনকভাবে ফরেস্টার থেকে ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দিয়েছে বন অধিদপ্তর।
গত ১০ জুলাই দুদকের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম পার্কে অভিযান চালিয়ে দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পায়। দুদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাঘের বেষ্টনি, ফুড স্টোরেজ ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ মাত্র ২০-৩০ শতাংশ সম্পন্ন হলেও নথিপত্রে শতভাগ কাজ দেখিয়ে বিল ছাড়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। অভিযানের সময় মো. মঞ্জুরুল আলমের কার্যালয় থেকে গুরুত্বপূর্ণ মেজারমেন্ট বুক ও ভাউচার পাওয়া যায়নি। সাধারণত কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত বা বিভাগীয় মামলা চলমান থাকলে তাকে সাময়িক বরখাস্ত বা মাঠপর্যায় থেকে প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু মো. মঞ্জুরুল আলমের ক্ষেত্রে ঘটেছে তার উল্টো। বন অধিদপ্তরের একটি প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদে তাকে শাস্তির মুখোমুখি না করে সম্প্রতি ‘ডেপুটি রেঞ্জার’ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্প ও প্রাণীদের রক্ষণাবেক্ষণ ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ব্যাপক অনিয়ম ও হরিলুটের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ শেষ না করেই ভুয়া বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য বরাদ্দকৃত ৬টি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ২০ জুন পর্যন্ত শুরুই কিছুটা কাজ করা হয়েছে, অথচ গত বছরের ৩০ জুনের সময়সীমা দেখিয়ে পুরো বিলের চেক ইস্যু করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মূল কাজ শেষ হওয়ার আগেই নিয়মবহির্ভূতভাবে 'অতিরিক্ত কাজের' কার্যাদেশ দিয়ে বরাদ্দ বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে তৎকালীন দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে।এদিকে ৪ কোটি টাকার কাজে ব্যাপক অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) সরেজমিনে তদন্ত পরিচালনা করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পরবর্তী অরাজকতায় পার্কের প্রায় ৫ কোটি টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে বাউন্ডারি ওয়াল ধসে পড়া এবং মূল্যবান পাখি ও সরঞ্জাম লুট হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। অন্যদিকে নিয়মিত তদারকির অভাব এবং চিকিৎসায় গাফিলতির কারণে গত কয়েকমাসে বাঘ, হাতি শাবক এবং বিরল প্রজাতির নীলগাইসহ বেশ কিছু প্রাণীর মৃত্যু নিয়ে স্থানীয় মহলে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। বর্তমানে পার্কটির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে সঠিক তদারকি না থাকলে এই বরাদ্দকৃত অর্থও অপচয় হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদীরা
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাফারি পার্কের দ্বিতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। কাজ শুরু না করেই প্রকল্পের অনুকূলে বিলের চেক ইস্যু এবং অতিরিক্ত কাজের (ভেরিয়েশন) কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে প্রকল্প পরিচালক আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াসিন নেওয়াজের বিরুদ্ধে। প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়িত কাজে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে দুদক।
সরকারি প্রাক্কলন ও সিডিউল উপেক্ষা করে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে পার্কের ৬টি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ৪ কোটি টাকার কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ শেষ না করেই পুরো বিলের চেক ইস্যু করার অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়। বর্তমানে পার্কটিতে বিশ্বমানের পরিচালনা পদ্ধতি বা ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং সিস্টেম’ গড়ে না ওঠায় রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। প্রাণীদের অকাল মৃত্যু ও অবহেলা পার্কে নিয়মিত বিরতিতে প্রাণীদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, যা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বোর্ড গঠন করা হলেও সঠিক তদারকি ও পরিচর্যার অভাবে বাঘ, সিংহ, হাতি ও হরিণসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর অকাল মৃত্যু ঘটছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ২৪টি ময়ূর মারা যায়। এছাড়া ২০২৫ সালের মে মাসে একটি হাতি শাবক এবং বিরল প্রজাতির নীলগাই মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্বরত চিকিৎসকদের অবহেলা এবং বন্যপ্রাণীদের প্রতি অবজ্ঞার কারণেই মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।পার্কটি তার আগের মান ধরে রাখতে পারছে না বলে অভিযোগ দর্শনার্থীদের।
পর্যটকদের মতে, যান্ত্রিক কোলাহল থেকে দূরে থাকলেও পার্কের বর্তমান ব্যবস্থাপনা ও আকর্ষণ অনেকাংশেই কমেছে।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে মো. মঞ্জুরুল আলম বলেন, ‘আমি স্থানীয় সাংবাদিক ছাড়া বাইরের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলি না। আমি সাংবাদিকদের টাকা দেই না। তাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। পার্কে বন্যপ্রাণীর জন্য নিম্নমানের খাবার সরবরাহ হচ্ছে, এটা সঠিক নয়। পার্কে কিছু উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চলমান আছে, যেগুলো চলতি অর্থবছরে শেষ হবে।’
চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি
কেকে/এমএ