পবিত্র ঈদ-উল ফিতরের ছুটি শুরু হয়ে গেছে। এরই মধ্যে অনেকে প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ করতে রাজধানী ছেড়েছেন। তবে গতকাল বুধবারও রাজধানী ছাড়তে দেখা গেছে মানুষকে। বিশেষ করে গতকাল গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ কারখানা ছুটি হওয়ায় মহাসড়কে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে।
দুপুরের পর থেকেই যাত্রীর চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এতে বিভিন্ন সড়কে থেমে থেমে যানবাহন চলাচল করছে, আবার কোথাও কোথাও ১০ থেকে ১২ কিলোমিটারজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এই সুযোগে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে দূরপাল্লার পরিবহনগুলো।
কারখানা ও শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরে গতকাল প্রায় দুই হাজার শিল্পকারখানা ছুটি হয়েছে। অধিকাংশ কারখানায় দুপুর ১২টা পর্যন্ত কাজ শেষে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়। ছুটি পাওয়ামাত্রই শ্রমিকেরা একযোগে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। ফলে দুপুরের পর থেকেই মহাসড়কে যাত্রীর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
জানা যায়, হঠাৎ বাড়তি চাপ সামাল দিতে না পেরে পরিবহনসংকট তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে অনেক পরিবহন নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি আদায় করছে বলে অভিযোগ করেন যাত্রীরা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই চাপ আগামীকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক আসমা আক্তার বলেন, ‘গাড়ি পাওয়া খুব কষ্ট। রংপুর যেতে ভাড়া চাচ্ছে ১ হাজার ৬০০ টাকা। অনেকেই যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের জন্য এত টাকা দেওয়া কঠিন। আসা-যাওয়াতেই বোনাসের টাকা শেষ হয়ে যায়।’
কোনাবাড়ী-নাওজোর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সওগাতুল আলম বলেন, যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে ঈদে ঘরমুখী মানুষের চাপ কিছুটা কম। কোনো কোনো গন্তব্যের যাত্রীরা টার্মিনালে এসে টিকিট পাচ্ছেন। আবার কোনো কোনো গন্তব্যের যাত্রীরা টিকিট পাচ্ছেন না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পদ্মা সেতু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীরা গাবতলী বাস টার্মিনাল কম ব্যবহার করেন। রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে বাস ছাড়ে। এ কারণে এই টার্মিনালে চাপ কিছুটা কম থাকে। তা ছাড়া এবার ছুটি বেশি। দীর্ঘ সময় ধরে মানুষ রাজধানী ছাড়ার সুযোগ পাচ্ছে। অন্যদিকে অনেকেই পরিবারের সদস্যদের আগে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। ঈদ আসন্ন হলেও মূলত এসব কারণে টার্মিনালে যাত্রীর চাপ কিছুটা কম।
এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের অংশে যানবাহনের চাপ তুলনামূলক কম দেখা গেছে। তবে নির্ধারিত সময়ে রাজধানী থেকে গাড়ি ছেড়ে না আসায় কাউন্টারগুলোতে যাত্রীদের ভিড় ও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। গতকাল সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড, কাঁচপুর ও সোনারগা অংশ সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। সড়কে গাড়ির সংখ্যা কম থাকায় যান চলাচল ছিল স্বাভাবিক ও দ্রুতগতির। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে কোনো যানজট দেখা যায়নি।
হাইওয়ে পুলিশের ভাষ্য, ঈদের লম্বা ছুটি থাকায় অনেক যাত্রী আগেই গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। সড়ক ভালো, পুলিশি তৎপরতা আছে। এ কারণে মহাসড়কে গাড়ির চাপ কম।
মেঘনা টোল প্লাজায় ১২টি বুথে গাড়ি থেকে টোল আদায় করা হচ্ছে। চালকদের নির্দিষ্ট লেনে চলাচলে উৎসাহিত করতে মাইকিং করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, মালবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ থাকাও যানজট কম থাকার একটি বড় কারণ। টোল প্লাজার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য মনির হোসেন বলেন, সকালে গাড়ির চাপ থাকলেও মহাসড়ক এখন ফাঁকা। মহাসড়কে যানজট নেই।
কাঁচপুর হাইওয়ে পুলিশের পরিদর্শক বিষ্ণু পদ শর্মা বলেন, সড়কের অবস্থা ভালো এবং হাইওয়েতে পুলিশি তৎপরতা থাকায় যানজট নেই। তবে গার্মেন্টস ছুটি শুরু হলে চাপ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে বড় রকমের যানজট লাগার আশঙ্কা নেই বলে জানান তিনি।
কাউন্টারে যাত্রীদের ভিড়, বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড ও শিমরাইল এলাকায় পরিবহন কাউন্টারগুলোতে গাড়ির জন্য যাত্রীদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। নির্ধারিত সময়ে গাড়ি না আসায় যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ঈদ সামনে রেখে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন অনেকে।
এদিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি যানবাহন চলাচল করছে। যমুনা সেতুর টোলপ্লাজা সূত্রে জানা যায়, সোমবার রাত ১২টা থেকে মঙ্গলবার রাত ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৪৬ হাজার ৯৪৩টি যানবাহন যমুনা সেতু পারাপার হয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের থেকে দ্বিগুণের বেশি। এতে টোল আদায় হয়েছে ৩ কোটি ৩৯ লাখ ৪ হাজার ৬৫০ টাকা।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মহাসড়কে এখন স্বাভাবিক সময়ের থেকে দ্বিগুণের বেশি যানবাহন চলাচল করছে। আজ এই চাপ আরও বাড়তে পারে। তবে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মহাসড়কের কোথাও যানজট হয়নি।
যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন জানান, ঈদযাত্রায় যমুনা সেতুর দুই পাশ দিয়ে ৯টি করে মোট ১৮ বুথ দিয়ে টোল আদায় করা হচ্ছে। এর মধ্যে দুই প্রান্তেই ২টি করে বুথ মোটরসাইকেলের টোল আদায় করা হচ্ছে।
কেকে/ এমএস