ও মোর রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। ঈদ মানে অকৃত্রিম ভালবাসাবাসি! ইসলাম ধর্মাবলাম্বাীদের জন্য বছরে দুইটা দিন অত্যন্ত আনন্দের। একটি হলো পবিত্র ঈদুল ফিতর অন্যটি হলো পবিত্র ঈদুল আযহা। দুটি বর্ণের সমন্বয়ে গঠিত ঈদ শব্দটি ব্যাপক গুরুত্ব বহন করে।
দীর্ঘ একমাস রোজা রাখার পরে আসে ঈদুল ফিতরের ঈদ।ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষজন নতুন নতুন জামাকাপড় কিনে এবং ঈদের দিনে সেই নতুন জামাকাপড় পরিধান করে তারা ঈদের নামাজ আদায় করে, ঘুরতে বের হয়। সর্বস্তরের মুসলিম মানুষজন শামিল হয় ঈদ আনন্দে।
যাদের কিছু নাই, দুঃস্থ তাদেরও ঈদ আনন্দ উপভোগ করার জন্য ধনী ব্যাক্তিরা সাধ্যমতো দান করেন।যেনো গরীব দুঃখীরাও ভালো কাপড় পরিধান করতে পারেন, ভালো খাবার খেতে পারেন। ঈদকে কেন্দ্র করে সকলে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে ঘুরতে যায়। সকলের বাড়িতে পোলাও, মাংস, বিরিয়ানি, সেমাই, পায়েস, ফিরনি সহ নানা ধরনের খাবারের আয়োজন করা হয়। ঈদের মাধ্যমে সকলের মাঝে রচিত হয় ভ্রাতৃত্ববন্ধনের সেতু।
এ দিন একে অন্যের বাড়িতে ঘুরতে যান। দিনটিতে সবাই যেন উন্মুখ হয়ে থাকেন অতিথি আপ্যায়নের জন্য। ঈদের চাঁদ দেখা মাত্রই মেয়েরা ব্যাস্ত হয়ে পড়েন মেহেদী দিয়ে হাত সুন্দর করে রাঙাতে। আর বাড়ির গৃহবধূরা পুরো দিন পার করেন ভালো ভালো খাবার রান্না আর অতিথি আপ্যায়নের কাজে। ঈদের দিনে ছোটদের সালামি সংগ্রহের দৃশ্য যেন এক বাড়তি সৌন্দর্য সৃষ্টি করে।
ঈদকে কেন্দ্র করে একেকজন একেক ভাবনা ভাবেন যে, কিভাবে ঈদ উদযাপন করবেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনাটা বোধহয় একটু বেশিই থাকে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা, এসাইনমেন্ট থেকে ঈদের মাঝে এক দীর্ঘ ছুটি পান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। ঈদ নিয়ে কি ভাবছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা আমি নাঈম ইসলাম সংগ্রাম সেই বিষয়টি তুলে ধরবো দৈনিক খোলা কাগজের পাতায়......
শৈশবের সেই রঙিন ঈদ যেন কোথায় হারিয়ে গেছে!
বছর ঘুরে আবারও আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ে ঈদ—সংযম, ত্যাগ আর আত্মশুদ্ধির এক অনন্য বার্তা নিয়ে। তবে শৈশবের সেই রঙিন ঈদ যেন কোথায় হারিয়ে গেছে! তখন ঈদ মানেই ছিল অদম্য আনন্দ, নতুন জামার উচ্ছ্বাস, আর সারাদিনজুড়ে হাসি-খুশির এক অন্যরকম জগৎ। সময়ের সাথে সাথে আমরা বড় হই, ব্যস্ততা বাড়ে, আর সেই নির্মল আনন্দটুকু ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে। তবুও ঈদের মূল সুর কখনো বদলায় না।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমাদের জীবনযাত্রা বদলালেও, ইফতারের টেবিলে নতুন নতুন আয়োজন যুক্ত হলেও, ঈদের দিনের অনুভূতি ঠিকই পুরনো থাকে। তাই তো দূরে থাকলেও মন পড়ে থাকে পরিবারের কাছে, আর সুযোগ পেলেই ছুটে যাই প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে ঈদ উদযাপন করতে।
ঈদের সকাল যেন এক প্রশান্তির বার্তা নিয়ে আসে। সবার মাঝে বিরাজ করে এক অনাবিল শান্তি, স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা। এদিন ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে সবাই একে অপরের কাছে আসে, কোলাকুলি করে, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়। দান-সদকার মাধ্যমে আমরা ভাগ করে নিই আমাদের আনন্দ, ছড়িয়ে দিই মানবতার আলো।
এক মাসের সাধনা শেষে যে ঈদ আমাদের জীবনে ধরা দেয়, তা শুধু আনন্দের নয়—এটি আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, ঈমানকে দৃঢ় করে এবং আমাদের মধ্যে মানবিক গুণাবলিকে জাগ্রত করে। এই পবিত্র শিক্ষাগুলো যেন শুধু ঈদের দিনেই সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের প্রতিদিনের জীবনে প্রতিফলিত হয়—এই প্রত্যাশাই রইল।
শামীম বিন রাফিক
শিক্ষার্থী: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঈদ মানে ঘরে ফেরার আনন্দ
শিক্ষার্থীদের জীবনে ঈদ মানে একটু স্বস্তি, একটু থেমে যাওয়ার সুযোগ।
ইউনিভার্সিটির অনেক শিক্ষার্থীর জন্য ঈদ মানেই বাড়ি ফেরা। দীর্ঘদিন পর পরিবারের সবার সাথে এক টেবিলে বসে খাওয়া, ছোটবেলার স্মৃতি মনে করা—এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই ঈদের আসল আনন্দ। দূরে থাকলে বোঝা যায়, পরিবারের উপস্থিতিই জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।
সারা বছর পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের চিন্তায় ব্যস্ত থাকি আমরা। ঈদের সময় পরিবার ও প্রিয়জনদের সাথে সময় কাটিয়ে মনে হয়, জীবনের আসল শক্তি বুঝি এখানেই। এই আনন্দ ও ভালোবাসা থেকেই আবার নতুন উদ্যমে নিজের লক্ষ্য পূরণের পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পাই।
খাদিজাতুন্নেছা শান্তি
শিক্ষার্থী: হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
কোলাকুলির দৃশ্য পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর মুহূর্ত!
বাংলাদেশের প্রতিটি মুসলমানের কাছে ঈদ একমাত্র উৎসব যেটা প্রতিটি শ্রেণির মানুষ তার নিজস্ব আঙ্গিকে আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করে থাকে। সকালের সেমাইয়ের মাধ্যমে ঈদের পুরো আনন্দ গ্রহণ শুরু হয়। আমার কাছে ঈদের সবচেয়ে আনন্দের মূহূর্তটা এখানেই।
ঈদের নামাজ শেষে প্রতিটি মুসলমানের কোলাকুলির দৃশ্য পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর মুহূর্ত। শুধু যে নিজেরাই আনন্দ করে তা নয়; ভাগাভাগি করে নেয় গরিব দুঃখী সকলের সাথে যাকাতুল ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে। এছাড়াও বেশির ভাগ মানুষ রমজান মাসেই যাকাত দিয়ে থাকে এবং দান সদকা ও বেশি বেশি করে থাকে। এ ছাড়াও আত্মীয়দের মাঝে ঈদ উপলক্ষে উপহার বিনিময়ও হয়ে থাকে।
সেই ছোট বেলায় কত জামা কাপড় পেয়ে লুকিয়ে রাখতাম পুরান হয়ে যাওয়ার ভয়ে। আর ছোটদের কাছে ঈদের দিনের প্রধান আনন্দ হচ্ছে ঈদ সালামি। ঈদ সালামি এখন আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম একটা বিরাট অংশও বলা যায়। অনেকেই বলে থাকে ছোট থেকে বড় হতে হতে ঈদের আনন্দ কমতে থাকে। কিন্তু আমার কাছে তা মনে হয় না ছোট বেলায় থাকে পাওয়ার আনন্দ বড় হওয়ার পর হয় দেওয়ার বা ত্যাগ করার আনন্দ। আর ত্যাগের আনন্দই বড় আনন্দ।
মো. শান্ত ইসলাম
শিক্ষার্থী : পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
ঈদগাহ মাঠ যেনো পরিণত হয় এক মিলন মেলায়!
ঈদ আরবি ভাষার শব্দ; যার আভিধানিক অর্থ আনন্দ বা উৎসব। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে বহু শতাব্দী ধরেই ঈদ এক প্রধান ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
ছোটবেলা থেকে গ্রামে বেড়ে ওঠায় প্রায় দুইযুগ হলো গ্রামেই ঈদ উদযাপন করি। এই দিনটি আমাদের জন্য এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে গোসল সেরে নাস্তা করে নতুন জামা পরে গাঁয়ের আঁকাবাঁকা পথ ধয়ে দ্বীগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠের এক অংশে অবস্থিত ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করা। অতঃপর ঈদগাহ মাঠ যেনো পরিণত হয় এক মিলন মেলায়!
তবে সংবাদপত্র ও নিউজ চ্যানেলগুলোতে দেখা মেলে কিছু মানুষ পরিবারের মানুষদের জন্য দুমুঠো ভাতের যোগান দিতে সেদিনও ব্যর্থ। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদের উচিৎ এমন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আসন্ন ঈদকে সামনে রেখেই কামনা করি ঈদ হোক সহমর্মিতার, ঈদ হোক সহানুভূতির; ঈদ হোক বৈষম্যহীন। ঈদ মোবারক!
মো. সুমন আহমেদ
শিক্ষার্থী: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
রোজার শেষে আনন্দ, পরিবারের হাসি আর ঈদের ছোট ছোট মুহূর্ত এটাই আমার ঈদ
রোজার শেষে আনন্দ, পরিবারের হাসি আর ঈদের ছোট ছোট মুহূর্ত—এটাই আমার ঈদ। ঈদ মানে আমার কাছে অন্যরকম অনুভূতি। ৩০টা রোজা পালনের পর ঈদ তো অন্যরকমই মজা। পুরো রমজান জুড়েই একটা গান কানে বাজতে থাকে “ও মোর রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ। এরপর আসে ঈদ।
সেই ছোটবেলা থেকে এখনো আমার একটা প্রধান কাজ ঈদের দিন থাকে—ঘুম থেকে উঠে গোসল করে নতুন জামা পরে ফেলা, আর তারপর পুরো পরিবারের সবাইকে ঘুরে ঘুরে দেখানো। যেহেতু আমি আমাদের জেনারেশনের মধ্যে সবার ছোট, তাই আমার নতুন জামা পরা দেখেই একরকম আমাদের বাসায় ঈদ শুরু হয়। তারপর রেডি হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকি, আর একটু পরই বসে যাই এটা-ওটা খাওয়ার জন্য।
আমাদের ট্র্যাডিশন অনুযায়ী সকালে মিষ্টি কিছু মুখে দিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়া হয়, তাই মিষ্টি দিয়েই সকাল শুরু। তারপর খিচুড়ি বা বিরিয়ানি—এগুলোও ঈদের বড় একটা অংশ। তারপর একটু ঝাল-মশলাদার খেয়ে বেরিয়ে পড়ি সালামি (ঈদি) সংগ্রহ করতে। এটা তো বিশ্বব্যাপী পালিত একটা ট্র্যাডিশন—আর এটাতেই সবচেয়ে বেশি মজা!
নুসরাত জাহান নিহা
শিক্ষার্থী: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
ঈদ মানে শুধু নিজে আনন্দ করা নয়; অন্যের আনন্দের অংশীদার হওয়া
পবিত্র ঈদুল ফিতর আমাদের জীবনে নিয়ে আসে আত্মশুদ্ধি, সংযম আর মানবতার এক অপূর্ব বার্তা। আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী শপিং করি, ভালো খাবার খাই, প্রিয়জনদের সাথে আনন্দ ভাগ করে নিই। কিন্তু সমাজের একটি বড় অংশ—অসহায়, নিম্ন আয়ের মানুষ—আজও এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত। যেখানে আমাদের ব্যয়ের কোনো হিসাব থাকে না, সেখানে তাদের কাছে একটি নতুন পোশাক কিংবা একবেলা ভালো খাবারও বিলাসিতা।
এই বৈষম্যের বাস্তবতা শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বের প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্র, সমাজ ও আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ব্যবধান কমানো জরুরি। ঈদের শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত আনন্দে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা এবং সাম্যের এক শক্তিশালী আহ্বান। আজকের এই সময়ে, যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে, তখন সামর্থ্যবানদের আরও এগিয়ে আসা উচিত—এটাই সময়ের দাবি।
রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেও আমাদের ভাবতে হবে—কিভাবে একটি কল্যাণমূলক সমাজ গড়ে তোলা যায়, যেখানে ঈদের আনন্দ সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত হয়। শুধু দান নয়, বরং একটি টেকসই সহায়তা ব্যবস্থার দিকে আমাদের নজর দেওয়া প্রয়োজন, যাতে মানুষের সম্মান বজায় থাকে এবং তারা আত্মনির্ভর হতে পারে। এই চিন্তা থেকেই আমার হৃদয়ে গভীর এক অনুভূতির জন্ম হয়েছে। মনে হয়েছে, অন্তত আমার সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু করার চেষ্টা করি। তারই ধারাবাহিকতায়, আমার প্রতিষ্ঠিত “অবলম্বন ফাউন্ডেশন”-এর পক্ষ থেকে অর্ধশতাধিক পরিবারের মাঝে ঈদ সামগ্রী বিতরণ করেছি। সেই হাসিমুখগুলো, সেই কৃতজ্ঞ দৃষ্টি—এগুলোই আমার কাছে ঈদের প্রকৃত আনন্দ।আমার কাছে ঈদ মানে শুধু নিজে আনন্দ করা নয়; অন্যের আনন্দের অংশীদার হওয়া। এই অনুভূতি আমাকে তৃপ্তি দেয়, আমাকে মানুষ হিসেবে আরও দায়িত্বশীল হতে শেখায়।
তবে জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও কিছু সামাজিকতা রক্ষা করা এবং নিজের প্রিয় মানুষদের সময় দেওয়াও জরুরি। তাই পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ঈদের মুহূর্তগুলো উপভোগ করার চেষ্টা করবো—কারণ এই সম্পর্কগুলোই আমাদের জীবনের প্রকৃত শক্তি।
আসুন, এই ঈদে আমরা শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর অঙ্গীকার করি। তাহলেই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য পূর্ণতা পাবে।
ফাহমিদ তানজিম ফাহিম
শিক্ষার্থী: ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি)
কেকে/ এমএস