কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে এবার অনুষ্ঠিত হবে ১৯৯তম পবিত্র ঈদুল ফিতরের জামাত। প্রতি বছর এ ঈদগাহ মাঠে আশপাশের জেলা ছাড়াও দেশ-বিদেশ থেকে মুসল্লিরা অংশ নেন ঈদের জামাতে।
ঈদ জামাতকে ঘিরে এবার আগত মুসল্লিদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে চার স্তরের নিরাপত্তা। নিরাপত্তায় কাজ করবে ১১০০ পুলিশ সদস্য। একইসঙ্গে থাকবে র্যাবের ৬ টিম, ৫ প্লাটুন বিজিবি, ৪ প্লাটুন সেনাবাহিনী ও ৫ প্লাটুন আনসার।
সকাল ১০ টায় অনুষ্ঠিত এ ঈদের জামাতে ইমামতি করবেন কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। বিকল্প ইমাম হিসেবে থাকবেন হয়বতনগর এইউ কামিল মাদ্রাসার প্রভাষক মাওলানা জুবায়ের ইবনে আব্দুল হাই।
শুক্রবার (২০ মার্চ) এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও ঈদগাহ মাঠ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা ও পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন।
এদিকে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও র্যাবের কর্মকর্তারা দফায় দফায় পরিদর্শন করেছেন শোলাকিয়া ময়দান। ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে শোলাকিয়া ময়দানকে। ঈদের দিন শোলাকিয়ায় বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করা হবে।
স্থানীয় প্রশাসনসহ সূত্রে জানা গেছে, শোলাকিয়ায় এবার সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যসহ মোট ১১০০ জন পুলিশ, র্যাবের ৬ টিম (প্রতি টিমে ৬ জন করে), ৫ প্লাটুন বিজিবি, ৪ প্লাটুন সেনাবাহিনী ও ৫ প্লাটুন আনসার সদস্য কাজ করবে। এছাড়াও নিরাপত্তায় মাঠে ৪টি ওয়াচটাওয়ার করা হয়েছে। এরমধ্যে ২টি পুলিশ ও ২টি র্যাব ব্যবহার করবে। মাঠসহ আশপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ৬৪টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। মুসল্লিদের যাতায়াত সুবিধার্থে ঈদের দিন কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ ও ভৈরব-কিশোরগঞ্জ রুটে ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস’ নামে দুটি বিশেষ ট্রেন চলাচল করবে।
ঈদের দিন মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে থাকবে ১৩টি আর্চওয়ে। থাকবে ড্রোন ক্যামেরাও। ঢাকা থেকে আসবে বোম ডিসপোজাল টিম। ঈদের দিন এখানে ফায়ার সার্ভিস কাজ করবে। ছয়টি অ্যাম্বুলেন্সসহ মেডিকেল টিম থাকবে। ১০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। ঈদগাহ পরিচালনা কমিটি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তার স্বার্থে ঈদের দিন মুসল্লিদেরকে শুধুমাত্র জায়নামাজ নিয়ে মাঠে আসার অনুরোধ করেছেন।
এছাড়া ২৮টি প্রবেশ পথে হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টর নিয়ে নিরাপত্তা কর্মীরা আগত মুসল্লিদের দেহ তল্লাশি করে ঈদগাহের ঢোকার ব্যবস্থা করবে। ঈদের আগের দিন থেকে শহরে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রাখা হবে। এর পাশাপাশি পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা ও র্যাব সদস্যরা বিশেষ নজরদারি করবেন।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে এ মাঠে অনুষ্ঠিত ঈদুল ফিতরের জামাতের আগে প্রবেশ পথের নিরাপত্তা চৌকিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় দুজন পুলিশ কনস্টেবল, এক গৃহবধূ এবং এক জঙ্গি নিহত হয়। আহত হয় আরও বেশ কজন পুলিশ কনস্টেবল ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লি। তবুও এ ঈদগাহ ময়দানের ধারাবাহিক জামাত আয়োজনে ছন্দপতন ঘটেনি। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে গত দুই বছরে ঈদগাহ ময়দানে ঈদের কোনো জামাত অনুষ্ঠিত হয়নি।
জনশ্রুতি রয়েছে, দীর্ঘদিন আগে এ মাঠে অনুষ্ঠিত এক ঈদুল ফিতরের জামাতে কাতার গণনা ১ লাখ ২৫ হাজার মুসল্লির উপস্থিতি মেলে। তখন থেকে এ ঈদগাহ ময়দানটিকে ‘সোয়া লাখিয়া ঈদগাহ ময়দান’ হিসেবে লোকজন ডাকতে শুরু করেন। পরবর্তীতে উচ্চারণ বিবর্তনে-এ ঈদগাহ ময়দানের নাম ‘শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান’ হিসেবেই সমধিক পরিচিত হয়ে ওঠে। আর তখন থেকেই এ ময়দানে ঈদুল ফিতরের জামাতে অংশ নিতে দেশ-বিদেশের লাখ-লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ছুটে আসতে থাকে। বিশেষ করে এ মাঠের ঈদুল ফিতরের জামাতে অংশ নিতে দেশ-বিদেশের তিন লাখেরও বেশি ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ছুটে আসেন।
কিশোরগঞ্জের হয়বত নগর সাহেব বাড়ির পূর্ব পুরুষ শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ, তার নিজস্ব তালুকে নরসুন্দা নদীর তীরে ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে ৭ একর জমির ওপর ‘শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান’ প্রতিষ্ঠা করেন। এমনকি তার ইমামতিতে এ ঈদগাহ ময়দানে প্রথম ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
কেকে/এজে