বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, “দেশে সুষ্ঠ নির্বাচন হয়েছে সেটা আমরা বলিনি—আমাদের অন্য কথা আছে। তবে আমরা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছি যাতে দেশ অচল না হয়।”
তিনি বলেন, “আমরা চাই না বিএনপির পরিণতি অতীতের ফ্যাসিবাদীদের মতো হোক। তারা অন্যায় অপরাধ করেছিলেন, তাই তাদের পরিণতি এই হয়েছে।”
সোমবার (২৩ মার্চ) দুপুরে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার নিজ গ্রামে ভাটেরায় গ্রামবাসী এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “ঈদের সময় যাত্রীরা টিকেট কিনতে গিয়ে দেখেছেন অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি। যে আশা নিয়ে আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করবে সেমাই খাবে তার আনন্দ তো এখানেই মাটি হয়ে গেল।”
জনগণের সাথে ধোকাবাজি চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মন্ত্রী বলেছেন অতিরিক্ত ভাড়া ফেরত দেয়া হবে। এতো মানুষ ঢাকা ছেড়েছে। তাদের টাকা ফেরত দিতে তাদের পাবেন কিভাবে?”
বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “আপনারা যদি সঠিক ধারায় ফিরে না আসেন, মনে রাখবেন জুলাই মাত্র দেড় বছর আগে হয়েছে। সারা দেশের মানুষ জুলাই যোদ্ধা। এই মানুষগুলো আপনাদেরকে ক্ষমা করবে না। আমরা চাই না আপনাদের পরিণতি অতীতের ফ্যাসিবাদীদের মতো হোক। তারা অন্যায় অপরাধ করেছিলেন, তাই তাদের পরিণতি এই হয়েছে। সেই আমলে আপনারাও নির্যাতিত ছিলেন, মজলুম ছিলেন, আমরাও ছিলাম। তা এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন কেন? দীর্ঘদিনের জুলুম-বঞ্চনা উপভোগ করে যখন মুক্তির স্বাদ পেলেন, তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছেন না কেন?”
সরকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “নির্বাচন শেষ হয়েছে। অনিয়ম হলেও আমরা মেনে নিয়েছি। দেশটা অচল না হোক। আপনারা যদি সঠিক ধারায় ফিরে না আসেন তাহলে সারাদেশের মানুষ কিন্তু জুলাই যোদ্ধা। এই মানুষগুলো আপনাদের ক্ষমা করবে না।”
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, “নবজাতক শিশু থেকে শুরু করে সাধারণ দরিদ্র মানুষ—সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভ্যাট ও ট্যাক্স প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় তহবিল গঠনে অবদান রাখে। তাই এই অর্থের যথেচ্ছ ব্যবহার বা লুটতরাজ করার অধিকার কারো নেই।”
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অতীতে সরকারে থাকাকালীন অনেকে চাঁদাবাজি ও লুটতরাজ চালিয়েছেন—যা মানুষ আর দেখতে চায় না।”
জামায়াত আমির বলেন, ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার যেমন মালিক হন না—সরকারও তেমন জনগণের সম্পদের মালিক নয়। তারা কেবল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও পারিশ্রমিকের বিনিময়ে জনগণের জানমাল ও ইজ্জতের হেফাজতকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সরকার যদি ম্যানেজারের ভূমিকা ভুলে গিয়ে নিজেদের মালিক ভাবতে শুরু করে—তবে দেশের মানুষ তা কখনোই বরদাশত করবে না।”
বর্তমান প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “জাতীয় সংসদ ভবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্থাপনা ও অর্থ জনগণের রক্তঘামানো উপার্জনে তৈরি। তাই বিলাসিতা নয়, বরং ন্যায্য সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে জনসেবায় আত্মনিয়োগ করাই হওয়া উচিত সরকারের একমাত্র লক্ষ্য।”
ডা. শফিকুর বলেন, “ক্ষমতার মোহ বা ব্যক্তিগত বিলাসিতা নয়, বরং জনগণের আমানত রক্ষা এবং রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধনই তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য। রাজনীতিতে সততা ও স্বচ্ছতার যে দৃষ্টান্ত তারা স্থাপন করেছেন—আগামী দিনেও তা অব্যাহত থাকবে।”
নিজের জন্য কোনো ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা না নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “এই মাঠ বা সম্পদ যা-ই হোক—তা দেশের কাজে ব্যবহার করা হবে। বিদেশি মেহমান ও গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডারদের সাথে রাষ্ট্রীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট আলোচনার জন্য এটি ব্যবহৃত হবে। আমি এখানে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে থাকব না—এটি কেবল রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হবে—ইনশাআল্লাহ।”
শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সিলেট মহানগর আমির ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মো. ফখরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও সিলেট মহানগরী নায়েবে আমির হাফেজ মাওলানা আনোয়ার হোসাইন খাঁন, কেন্দ্রীয় মজলিসের শূরা সদস্য ও সাবেক জেলা আমির মো. আব্দুল মান্নান, সিলেট মহানগরী মজলিশে শুরা সদস্য আব্দুস সালাম আল মাদানী, জেলা নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুর রহমান, জেলা সেক্রেটারি মো. ইয়ামির আলী।
এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলা উপজেলা সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমেদ, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা সাবেক চেয়ারম্যান সাইফুল্লাহ আল হোসাইন, সাবেক জেলা সেক্রেটারি খন্দকার আব্দুস সোবহান ও আব্দুল হামিদ খান, উপজেলা নায়েবে আমির জাকির আহমেদ, সেক্রেটারি বেলাল আহমদ চৌধুরী, উপজেলা শূরা সদস্য রাজানুর রহিম ইফতেখার, জেলা ছাত্রশিবির সভাপতি মো. ফরিদ উদ্দিন, শহর সভাপতি কাজী দাইয়ান আহমেদসহ জামায়েত ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
শফিকুর রহমান বাড়িতে প্রবেশের আগে তিনি নিজ গ্রামের কবরস্থান জিয়ারত করেন। পরে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে দুপুরের খাবার গ্রহণ করেন।
কেকে/এজে