পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে মৌলভীবাজারের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের ঢল নেমেছে। জেলার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, বধ্যভূমি ৭১, বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্রসহ প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভিড় জমিয়েছেন বিপুল সংখ্যক পর্যটক ও দর্শনার্থীরা।
সোমবার (২৩ মার্চ) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বধ্যভূমি ৭১ ও চা গবেষণা কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে সব বয়সের মানুষের উপচে পড়া ভিড়।
পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ট্যুরিস্ট পুলিশসহ প্রশাসনের সার্বিক নিরাপত্তা থাকায় বাড়তি স্বস্তি নিয়ে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গলের বধ্যভূমি ৭১, চা গবেষণা কেন্দ্র, কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক ও বড়লেখার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতে শিশু-কিশোরসহ সব বয়সের মানুষের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদের ছুটিতে জেলার পাঁচ তারকা মানের হোটেল দুসাই রিসোর্ট, গ্র্যান্ড সুলতান রিসোর্ট, থ্রি-স্টার মানের প্যারাগন, লেমন গার্ডেন রিসোর্টসহ ছোট-বড় সব হোটেল, মোটেল, কটেজ এবং রিসোর্টে পর্যটকদের প্রচুর সমাগম বেড়েছে। হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে শতভাগ বুকিং সম্পন্ন হওয়ায় শত কোটি টাকার ব্যবসার প্রত্যাশা করছেন জেলার পর্যটন ব্যবসায়ীরা।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কমলগঞ্জ ও বড়লেখা রেঞ্জ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত তিন দিনে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত থেকে সরকারের বিপুল রাজস্ব আয় হয়েছে।
এর মধ্যে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ঈদের দিন থেকে সোমবার পর্যন্ত বিদেশি পর্যটকসহ মোট ৪ হাজার ৭২৪ জন পর্যটক টিকিট কেটে প্রবেশ করেছেন। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে মোট ৫ লাখ ২৮ হাজার ৫০৯ টাকা।
সরেজমিনে বিভিন্ন পর্যটন স্পট ঘুরে দেখা গেছে, পরিবার-পরিজন ও প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের ছুটি কাটাতে নারী-পুরুষ, শিশুসহ সব বয়সী মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল জেলার পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর ভিড় চায়ের রাজ্যখ্যাত শ্রীমঙ্গল উপজেলার বধ্যভূমি ৭১, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই), বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন (সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা), সাত রঙের চায়ের স্টল নীলকণ্ঠ, বাইক্কা বিল, চা-কন্যার ভাস্কর্য, কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, বড়লেখার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি ও কালুকি হাওর, কুলাউড়ার পৃথিমপাশা নবাববাড়ি, রাজনগর উপজেলার কমলা রানীর দীঘি, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাসিমপুর পাম্প হাউস এবং শহরের দৃষ্টিনন্দন স্পট শান্তিবাগ ওয়াকওয়ে, মাতারকাপন সুইচ গেটসহ বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে। ঈদের দিন সকাল থেকে সোমবার পর্যন্ত এসব স্পট পর্যটকমুখর ছিল।
এই তিন দিনেই দেখা গেছে, শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কের রেলগেট এলাকা থেকে গ্র্যান্ড সুলতান রিসোর্টের সামনে পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দীর্ঘ যানজট। পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গলে পর্যটকদের বিপুল সমাগমে সড়কে দীর্ঘ যানজট লেগেই ছিল। দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে অনেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বিভিন্ন যানবাহন থেকে নেমে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ হেঁটে বধ্যভূমি ও বিটিআরআই চা বাগান এলাকা ঘুরে দেখেন।
ঢাকা থেকে আগত ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, পরিবার নিয়ে তিনি ভ্রমণে এসেছেন। দীর্ঘ সময় যানজটে বসে থাকার পর ভানুগাছ রোড ১০ নম্বর পয়েন্ট থেকে হেঁটে বধ্যভূমির দিকে রওনা দেন।
তিনি বলেন, “রেলক্রসিংয়ের সামনে থেকে কিছু দূর এগোতেই দীর্ঘ যানজট। অনেকক্ষণ বসে থেকে পরিবার নিয়ে হেঁটেই বধ্যভূমি ও বিটিআরআই চা বাগানে যাই।”
ইকো ট্যুরিস্ট গাইড আব্দুল আহাদ বলেন, “ঈদের ছুটিতে সব পর্যটনকেন্দ্রে প্রচুর পর্যটকের আগমন হয়। বিশেষ করে লাউয়াছড়া উদ্যানে ঈদের দিন বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যটকদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পায়। সোমবার পর্যন্ত উপচে পড়া ভিড় ছিল এ উদ্যানে।’’
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ ব্যবস্থাপনা নির্বাহী কমিটির কোষাধ্যক্ষ জনক দেববর্মা জানান, ঈদের ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। বনের পরিবেশ রক্ষা এবং পর্যটকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে বনকর্মী ও সিপিজি সদস্যরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন।
একই চিত্র দেখা গেছে বড়লেখার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতেও। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবসহ নানা বয়সী মানুষ বাস, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় যানবাহনে করে মাধবকুণ্ডে আসছেন। পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতির ফলে দোকানগুলোতে জমজমাট বেচাকেনা চলছে। জলপ্রপাতের পানিতে নানা বয়সী মানুষ সাঁতার কাটছেন, হইচই করার পাশাপাশি প্রিয়জনদের ছবি তুলছেন। কিশোর-যুবকেরা মেতেছেন জলখেলায়। এ সময় পর্যটকদের মিলনমেলায় মুখরিত হয়ে ওঠে জলপ্রপাত এলাকা।
মাধবকুণ্ডে আগত শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থীদের বাড়তি আনন্দ দিয়েছে ভেতরে থাকা ঘোড়া। ঘোড়ায় চড়ে পর্যটকেরা আনন্দ উপভোগ করছেন।
মাধবপুর থেকে ঘুরতে আসা চাকরিজীবী হাসান আহমদ জানান, মাধবকুণ্ডে আসার পথের পাশের চা বাগানের মনোরম দৃশ্য, খাসিয়া পুঞ্জি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছে।
কুমিল্লা থেকে আসা ব্যবসায়ী কামরান হোসেন বলেন, “ঈদের ছুটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে মাধবকুণ্ডে বেড়াতে এসে ভালো লেগেছে। তবে সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো হলে ভালো হতো।’’
সিলেটের এক কলেজ শিক্ষক জানান, দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত। এখানকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে উন্নয়ন করা হলে এটি দেশের অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
মাধবকুণ্ডের ব্যবসায়ী রাহেল আহমদ জানান, ঈদের ছুটিতে হাজারো পর্যটকের আনাগোনায় মুখরিত হয়েছে মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত। এতে ব্যবসাও ভালো হয়েছে।
মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতে দায়িত্বে থাকা ট্যুরিস্ট পুলিশ জানায়, পর্যটকদের নিরাপত্তায় তারা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন, যাতে সবাই নির্বিঘ্নে ঘুরে দেখতে পারেন।
জেলার পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, রমজানের আগে পর্যটনকেন্দ্রগুলো অনেকটাই ফাঁকা ছিল। তবে ঈদের ছুটি শুরু হতেই প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। ছুটির শেষ দিন পর্যন্ত লাখো পর্যটক আসতে পারেন এবং প্রায় শতকোটি টাকার ব্যবসা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
লাউয়াছড়া টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা আহমদ কামরান জানান, ঈদের দিন ১ হাজার ৫২ জন পর্যটক প্রবেশ করেছেন, টিকিট বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ২২০ টাকা। পরদিন ১ হাজার ৮৩২ জন প্রবেশ করেন, টিকিট বিক্রি হয় ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৬ টাকা। সোমবার ১ হাজার ৮৪০ জন প্রবেশ করেন, টিকিট বিক্রি হয় ২ লাখ ৪ হাজার ৬১২ টাকা। তিন দিনে মোট ৪ হাজার ৭২৪ জন পর্যটক থেকে ৫ লাখ ২৮ হাজার ৫০৯ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ জোনের ওসি মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, “ঈদে পর্যটকদের নিরাপত্তায় সব পর্যটন স্পটে ট্যুরিস্ট পুলিশের টহল জোরদার রয়েছে। সব সংস্থার সমন্বয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।’’
মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, “ঈদের ছুটিতে বিভিন্ন পর্যটন স্পট, হোটেল-রিসোর্টসহ জেলাজুড়ে দর্শনার্থীদের পদচারণা ছিল। এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ তৎপর রয়েছে।’’
কেকে/এসএ